অনিল রায় স্তম্ভিত হয়ে হাতের খাপসুদ্ধ রিভলভারটার দিকে চেয়ে থাকেন একটু। একটু ম্লান হেসে মাথা নেড়ে বলেন—তাই তো। দাঁড়াও, ক্যামেরাটাও এখানেই আছে। এ অবস্থায় নত্বসত্ব জ্ঞান থাকে না, বুঝলে।
খুঁজে পেতে খাপসুদ্ধ ক্যামেরাটা বার করেন অনিল রায়। দুর্ধর্ষ জাপানি মিনোল্টা ক্যামেরা। ঝকঝক করছে। ফ্ল্যাশ গান লাগানো, ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে অনিল রায় তাক করছেন। হাত টলছে, শরীর টলছে।
সোমেনেরও বুক টলে হঠাৎ। শেষ বেলায় সবুজ ক্ষেতের ওপর দিয়ে সূর্যাস্তের রং মেখে একটা একা পাখি যেন বহু দূর পাড়ি দিয়ে ফিরে যাচ্ছে ঘরে। আধো অন্ধকার জমে ওঠা খড়কুটোর বাসা। ওম্, নিরাপত্তা, বিশ্রাম। পাখি ফেরে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা আসাহি পেন্টাক্স ক্যামেরার নিপ্রাণ চোখ। অলক্ষ্যে ডেকে ওঠে একটা অন্ধ কুকুর।
অনিল রায় স্থলিত গলায় বলেন—তোমার মুখটা কোথায়? অ্যাঁ! খুঁজে পাচ্ছি না।
সোমেন ম্লান একটু হাসে।
অনিল রায় বলেন—ওঃ, এই তো।…তোমার দুটো মুখ, অ্যাঁ! দুটো!…ডাবল ফেসেড বাস্টার্ড! না না, তোমাকে নয়। নিজেকেই বলছি। এ ডাবল ফেসেড বাস্টার্ড।
দুঃখিত চিত্তে সোমেন ওঠে, অনিল রায় ঝুঁকে পড়ে যেতে যেতে সামলে নেন। ক্যামেরায় চোখ। বলেন—হ্যাঁ। ঠিক আছে। বাঃ!
সোমেন ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে। বড় সদর দরজাটা খোলা। চৌকাঠে পা দিয়ে শুনতে পেল, একা ফাঁকা ঘরে অনিল রায়ের গলার স্বর—হ্যাঁ, তোমাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। তুমি ফাঁকা, তুমি শূন্য, এ বায়রনিক ভ্যাকুয়াম। ঘাড় ঘুরিও না। ঠিক আছে।
একটা অস্পষ্ট আলোর ঝিলিক ঘরের মধ্যে চমকে উঠল। টের পেল সোমেন। ফাঁকা ঘরে অনিল রায় তার ছবি তুললেন। সোমেন সিড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এল। রাত হয়ে যাচ্ছে। সময় নেই। মুহুর্মুহু ডাকে এক অন্ধ কুকুর। আসাহি পেন্টাক্স ক্যামেরার একটিমাত্র চোখ চেয়ে আছে প্রতীক্ষায়।
সোমেন যাবে।
॥ পঁয়তাল্লিশ ॥
খুব ভোরবেলা। এখনও আকাশে ঝিলমিল করছে নক্ষত্র। পুবের দিকে আকাশটা একটু ফিকে ফিরোজা। ভূতুড়ে সব গাছের ছায়া। ভোর ভোর বেলায় এখন একটু জুড়িয়ে যাওয়া মিঠে ভাব চারদিকে। বহেরুর খামার ছেড়ে ব্রজগোপাল টর্চের আলো ফেললেন আলের ওপর। এ রাস্তাটা ভাল নয়, তবু অনেক তাড়াতাড়ি হয় ইস্টিশন। কলকাতামুখো প্রথম গাড়িটা এতক্ষণে বর্ধমান ছেড়েছে। ঘুর পথে বড় রাস্তায় গেলে ধরা যাবে না।
পিছনে বহেরু দাঁড়িয়ে। উঁচু বাঁধের মতো ঢিবি, খামারের শেষ সীমানা। তার ওপর আলিসান ছায়ামূর্তি। আজকাল বড় সন্দেহের বাতিক। কাল থেকে ব্রজগোপালকে পাখি পড়া করে বলছে—চলে যাবেন না ঠাকুর, আসবেন কিন্তু।
চলে যাওয়ার কি তা তা ব্রজগোপাল বোঝেন না। চলে তিনি যাবেন কোথায়? কিন্তু বহেরুর ওই এক ভয় ঢুকেছে আজকাল। কর্তা বুঝি বউ-ছেলে সংসারের টানে এতটা ভাঁটেন বুঝি আবার উজিয়ে যান। পাগুলে কথা সব। গেলেই কি আটকাতে পারে বহেরু? পারে না, তর কাঙাল ভিখিরির মতো কেবলই হাত কচলে ওই কথা পাড়ে। ব্রজগোপাল বিরক্ত হন। তোর সঙ্গে আমার গূঢ় সম্পর্কটা কী, না কি দাসখত লিখে দেওয়া আছে! আবার ফেলতেও পারেন না বহেরকে। কদিন আগেই এ সংসারে ও ছিল কর্তাব্যক্তি, হাঁক ডাকে চারদিক কাঁপত। কিন্তু বয়সে পায় মানুষকে, ভাগ্যে পায়, গাছগাছালির পোকামাকড়ের মতো কর্মফলেরা এসে কুট কুট করে খায়। সেই ক্ষয়ে ধরেছে বহেরুকে। আমান মানুষটা তখনও খাড়া হয়ে দাঁড়ালে দশাসই, কিন্তু তার আগুনটা নিভে গেছে। ছেলেরা শকুনের মতো নজর রাখছে। কদিন বাদে গন্ধ বিশ্বেসে বহেরুতে তফাত থাকবে না।
টর্চ বাতিটা একবার ঘুরিয়ে ফেললেন ব্রজগোপাল। বহেরু এখনও দাঁড়িয়ে। একা। একটু কী যেন বুকে বেঁধে। ওবেলাই ফিরে আসবেন তবু মনে হয় এই যে যাচ্ছেন, আর হয়তো ফিরবেন না।
পরশু চিঠিটা এসেছে। জমি রেজিস্ট্রি হয়ে গেল। ভিত পুজোও সারা। তবু কাজ আটকে আছে। ননীবালা লিখেছেন—তুমি একবার এস। রণোর বড় শরীর খারাপ। মাথাটার একটু গণ্ডগোল হয়েছে বুঝি। আমার মন ভাল নেই।
এমন কিছু একটা আন্দাজ করেই এসেছিলেন ব্রজগোপাল সেবার। মাঝখানে বহুকাল যাওয়া হয়নি। জোর একটা বর্ষা গেল। চারধারে চাষের উৎসব লেগে গিয়েছিল। সে উৎসব ছেড়ে কোথায় যাবেন?
ফ্যাকাশে আয়নার মতো জল জমা ক্ষেত পড়ে আছে চিত হয়ে। তাতে চিকচিকে অঙ্কুর। পায়ের নীচে আঠালো জমি, কাদা, জল। দুর্গম রাস্তা। ব্রজগোপাল টর্চের আলো ফেলে হাঁটেন। উঁচুতে তোলা কাপড়, পায়ে রবারের জুতো, বগলে ছাতা। চারদিকে ঘাস, ফসল জমির একটা নিবিড় উপস্থিতি। কাছেই হাতের নাগালে তারাভরা আকাশ। অন্ধকারে বাতাসের স্পর্শ মায়ের হাতখানার মতো। গভীর মায়া মাখানো এই বিশালতা। মনের মধ্যে একটা প্রণাম তৈরি হয়ে যায় আপনা থেকেই। বুড়ো বামুনের গায়ের গন্ধ যেন চারদিকে ছড়ানো। আয়ুর বেলা ফুরিয়ে এল। টের পান, অলক্ষ্যে বৈতরণীর কুলকুলু শব্দ ক্রমে কাছে এগিয়ে আসছে। যত এগিয়ে আসে শব্দ তত মায়া বাড়ে। তবু সেই আবছায়া নদীর শব্দ আসে, আসে। আর ততই মনে হয়, লতানে গাছ যেমন আঁকুশি দিয়ে যা পারে আঁকড়ে ধরে, তেমনি এই শরীর পৃথিবীর মাটি বাতাসে আবহের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছে আঁকুশি। বাপ- পিতামোর কাছ থেকে পাওয়া প্রাণ, এই ব্যক্ত জীবন, এ ছেড়ে কার যেতে ইচ্ছে করে?
