বউদি ফিরতেই সোমেন আড়ালে ডেকে টাকাটা চাইল৷ ক্ষণকাল বউদি তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেকক্ষণ রোদে দাঁড়িয়েছিল বীণা। মুখটায় তাই তামাটে রক্তাভা, কপালে ঘাম, ঠোঁটে বিশুষ্ক ভাব। একটু অস্বস্তির সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল—হঠাৎ এত টাকার আবার কী দরকার পড়ল?
—একটা প্রেস্টিজের ব্যাপার। খুব আটকে গেছি। দেবে?
বউদি মুখটা নত করে বলে—তোমার দাদা যদি নর্মাল থাকত তবে কি ভাবতাম ভাই? ও বেরোলেই টাকা। মাইনের টাকা আর কদিন! কিন্তু সে সব তো বন্ধ। আমার লুকনো-চুরনো কিছু থাকতে পারে, কিন্তু বেশি নেই আর, খরচ তো হচ্ছে। দেখি।
মনটা খারাপ হয়ে গেল আবার।
সোমেন একটু ভেবে বলল—আচ্ছা থাক। দেখি, যদি অন্য কোথাও পাই।
বউদি ঘরে চলে যেতে যেতেই হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে বলল—মার কাছে চাও না। মার তো ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে টাকা পড়ে আছে।
তাই তো! মনে পড়ে গেল সোমেনের। জমির টাকাটা পড়ে আছে এখনও। দাদার অসুখের জন্য পিছিয়ে যাচ্ছে তারিখ। এ ক’টা টাকা মাও দিয়ে দিতে পারে। মায়ের ঘরের দিকে ফিরেও থেমে গেল সোমেন। মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা বাধা। চাইলেই যে মা দেবে তা নয়, অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করবে, সন্দেহজনক সব প্রশ্ন করবে। তারপর সোমেন রেগে গেলে লক্ষ্মী মেয়ের মতো সুড়সুড় করে চেক কেটে দেবে সেটা সোমেন জানে। কিন্তু বাধা অন্য জায়গায়। টাকাটার ইতিহাস মনে করলে আর চাইতে ইচ্ছে করে না। বাবার কত কষ্টের টাকা! কত বছরের অপেক্ষার পর পাওয়া। টালিগঞ্জের জমিটুকু ঘিরে কত সুখের স্বপ্ন মায়ের।
সোমেন টাকা চাইল না। বেরিয়ে পড়ল সন্ধেবেলায়। দেড়শো টাকার সমস্যাটা তেমন কঠিন হওয়া উচিত নয়। টাকাটা বাইরে কোথাও থেকে ঠিক পেয়ে যাবে সোমেন।
অনিল রায় স্থলিত গলায় গান গাইছিলেন। অথবা গান গাওয়া এ নয়। গলা সাধাই হবে হয়তো। চাকর দরজা খুলে দিতেই শব্দটা কানে এল। শ্লেষ্ম কিংবা কান্নায় আবিষ্ট গলা, সঙ্গে তানপুরার আওয়াজ, সুর মিলছে না। তিনশো টাকা ভাড়ার চমৎকার সরকারি ফ্ল্যাট, প্রচুর জায়গা। খোলামেলা। প্রথম ঘরটায় একটা গোদরেজের সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপর ডাঁই করা বই, আলমারি ঠাসা কেবল বই। দ্বিতীয় ঘরটা শোওয়ার। সেখানে একটা বেতের চৌকিতে তুচ্ছ বিছানা। মেঝেয় কার্পেটের ওপর তানপুরা হাতে বসে আছেন অনিল রায়, পিঠে কাঁধে প্রচুর লোম, কানের লম্বা লোমগুলো ছেটে ফেলেন অনিল রায়। পাশে মদের বোতল, গেলাস, সোডা, কিছু চিজ লাগানো নোনতা বিস্কুট।
সোমেনকে দেখে তানপুরা শোয়ালেন, গেলাস তুলে নিয়ে বললেন—খাও, ঢেলে নিয়ে খাও। ষষ্ঠী, আর একটা গেলাস দিয়ে যা।
—না স্যার, মা টের পেলে বকাবকি করবে।
অনিল রায় উত্তর দিলেন না। ষষ্ঠী বিনা শব্দে এসে গেলাস রেখে গেল। বাড়িটা অসম্ভব স্তব্ধ। কানে তালা লেগে যায়। নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ পাওয়া যায়।
অনিল রায় বসে বসেই টলছিলেন। বললেন, তা হলে কফি?
—তা একটু খেতে পারি।
কিন্তু কফির কথা ষষ্ঠীকে বলতে ভুলে গেলেন অনিল রায়। কার্পেটের ওপর এক ধারে একটা পাশবালিশ পড়ে আছে, সেইটাতে ঠেসান দিয়ে বসে বললেন—গান কাকে বলে জানো? অ্যাটমসফেরিক ডান্স অব দি ভয়েস, বুঝলে?
—না স্যার।
—বাংলায় কী বলে! বাংলা নিয়ে আমার বড় মুশকিল। ও ভাষাটা বড় আদুরে বাবু ভাষা। এক্সপ্রেশন হয় না। বলা যায়, কণ্ঠস্বরের আবহনৃত্য। সুরের পাখিরা বেরিয়ে এসে চারদিকে নেচে নেচে বেড়ায়।
সোমেন একটু হাসল।
অনিল রায় হাতের পিঠে ঠোঁট মুছে নিয়ে বলেন—একটু নেশা করে গাইতে বসলে ঠিক টের পাই, পাখিগুলো চারদিকে উড়ে উড়ে নাচছে, নামছে, আনন্দে চিৎকার করছে। তারপর পাখিগুলো ঠোকরাতে শুরু করে। ঠুকরে ঠুকরে খায়। আমাকে খায়। খেয়েটেয়ে কিছুক্ষণ পরে বোধ হয় ভাল লাগে না, আধ-খাওয়া করে ফেলে রেখে যায়। তখন ভারী মুশকিল। আধ-খাওয়া হয়ে পড়ে থাকি, বড় ভয় করে তখন। ষষ্ঠীচরণ ঘুমোয়, আর বাড়িটা খাঁ-খাঁ করতে থাকে। নিজেকে মনে হয় কেবলমাত্র মাতাল, বলে অনিল রায় গেলাস শেষ করেন। আবার সোডার আর মদের মিশ্রণ তৈরি করে নিয়ে বলেন—শালা মাতাল। বাস্টার্ড।
টাকার কথাটা আর ভোলা যাবেনা, সোমেন বুঝল। মাতালদের একটা অন্য চোখে দেখে সোমেন। যেমন সবাই দেখে। মাতাল অবস্থায় কারও কাছ থেকে কিছু চাইতে বা নিতে সংকোচ হয়। মনে হয়, লোকটাকে ঠকাচ্ছি, ওর তো মনে থাকবে না।
অনিল রায় একটু ঝুঁকে বললেন—দেরি করে এলে। চাকরিটায় অন্য লোক নেওয়া হয়ে গেছে। অবশ্য তেমন কিছু নয়, একটা ক্ল্যারিক্যাল জব।
সংবাদ শুনে সোমেন দুঃখিত হল না। ছোটখাটো চাকরির জন্য তার মাথাব্যথা নেই। সে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে চায়, অনেক বেশি খরচ করতে চায়। এ চাকরি না হলেই কী? বলল—ঠিক আছে।
অনিল রায় গেলাস তুলে চোখের সামনে ধরে আছেন। গেলাসের স্বচ্ছ কাচে একটু হলুদ মদ। তার ভিতর দিয়ে সোমেনকে দেখলেন একটু। বললেন দাঁড়াও, দাঁড়াও। তোমার প্রোফাইলটা তো অদ্ভুত। বায়রনের মতো। দাঁড়াও, তোমার একটা ছবি তুলে রাখি।
বলে টলতে টলতে উঠলেন অনিল রায়। বিছানার বালিশের খাঁজ থেকে একটা চামড়ার খাপ টেনে বের করলেন। সোমেন চমকে উঠে বলে—স্যার, ওটা রিভলবার।
