সোমেন অবাক হয়ে বলে—তুমি এই ঘুম থেকে উঠলে নাকি?
রণেন ভ্রূ কুঁচকে বলে হ্যাঁ। কেন, খুব বেলা হয়ে গেছে নাকি! বলে টেবিলের ওপর ঘড়িটা দেখে নিয়ে বলে—তাই তো! কেউ ডেকে দেয়নি, অনেক বেলা হয়ে গেছে। ওরা কোথায় গেল?
—বউদি বাচ্চাদের আনতে গেছে। মা পুজো করছে।
রণেন একটু বিরক্তির সঙ্গে চেয়ে থাকে সোমেনের দিকে। তারপর মুখটা বিকৃত করে বলে—বাচ্চাদের ইস্কুলে পাঠাতে বারণ করেছি, তবু পাঠিয়েছে?
সোমেন ঠিক বুঝতে না পেরে বলে—বারণ করেছিলে কেন?
রণেন একটু উত্তেজিতভাবে বলে—রাস্তাঘাটে আজকাল বাচ্চাদের বেরোতে আছে! কলকাতায় কীরকম অ্যাকসিডেন্ট দেখিস না। বলে রণেন পাশে পড়ে থাকা খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে বলে—দ্যাখ, সব দাগিয়ে রেখেছি। কাছে আয়।
সোমেন কাছে গিয়ে দেখে খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় দুর্ঘটনার খবরগুলিতে লাল পেন্সিলের দাগ।
রণেন মুখ তুলে বলে—দেখেছিস?
সোমেন মাথা নাড়ল।
রণেন উত্তেজিতভাবে বলে—কীরকম ভাবে মানুষ মরে যাচ্ছে! আর তোর বউদি কোন সাহসে বাচ্চাদের ঘরের বার করে? যদি কিছু হয়?
সোমেন মৃদু স্বরে বলে—কিছু হবে না। ওরা তো বাস-এ যায়।।
রণেন মাথা নেড়ে সেই ঈষৎ উঁচু গলায় বলে—বাস অ্যাকসিডেন্ট করে না? কে গ্যারান্টি দিয়েছে? বলতে বলতে উঠে ঘরময় পায়চারি করে রণেন। বিড়বিড় করে বলে—আমি ঘুমোচ্ছিলাম, সেই ফাঁকে বাচ্চাদের বের করেছে। কোনওদিন সর্বনাশ ঘটে যাবে। একটাও ফিরবে না।
বলতে বলতে যেন দৃশ্যটা চোখের সামনে দেখে একটা ঝাঁকি খায় রণেন। দাঁড়িয়ে পড়ে। আবার পায়চারি করে।
সোমেন বোকার মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর চা-এর কথা মনে পড়তেই বলে—দাঁড়াও, মাকে তোমার চা-এর কথা বলে আসি।
জপের সময় কথা বলেন না ননীবালা। সোমেন পিছনে থেকে বার দুই ডাকল, ননীবালা হাতের ইশারায় ডাকতে বারণ করলেন।
সোমেন একটু ইতস্তত করে। দাদার জন্য সে বহুকাল কিছু করেনি। দাদাকে সে লক্ষই করে না আজকাল। আজ তাই একটু কিছু করতে ইচ্ছে হল।
চা চিনি দুধের ঠিকানা জানে না সোমেন। কেটলিটা রান্নাঘরের ট্যাপ-এর কাছে খুঁজে পেল। গ্যাস উনুন কখনও জ্বালেনি। একটু ভয়-ভয় করছিল, তবু কল ঘুরিয়ে গ্যাস ছেড়ে দেশলাই জ্বেলে দিল।
কেটলি বসিয়ে অনেক কৌটোটৌটো নেড়ে চা-পাতা আর চিনি খুঁজে পেল, দুধের ডেকচিটা মিটসেফ থেকে বের করছিল, এ সময়ে রণেন এসে দাঁড়ায়, বলে—কী করছিস?
—একটু চমকে উঠেছিল সোমেন, হেসে বলল—তুমি ঘরে গিয়ে বসো, আমি চা করে আনছি।।
—তুই করবি! রণেন অবাক হয়ে বলে—গ্যাস ফেটে কত লোক মরে যায় জানিস? বলে মুখ ফিরিয়ে নিল। হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে আপনমনে বলল—সিকিউরিটি! সিকিউরিটি! মানুষ তার বেশি আর কিছু চায় না।
এই বলে ঘরে চলে গেল রণেন। ঘরে বসে ভাববে। একা একা কত কথা আর বলবে।
চা-পাতা বেশি পড়ে গেছে, লিকারটা হয়েছে ঘন কাথের মতো। ননীবালা উঠে এসে দেখে বললেন—এই কি পুরুষমানুষের কাজ! বউমা তো চৌপর দিন চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘরসংসার ভেসে যায় তো যাক।
চা নিয়ে রণেনের ঘরে ঢুকে সোমেন দেখে দাদা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে। খুব সজাগ ভাব, যেন দূরের কোনও শব্দ শুনবার চেষ্টা করছে কিংবা অস্পষ্ট কোনও গন্ধ শুঁকছে বাতাসে।
চা দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে—ইচ্ছে করছে না। নিয়ে যা।
সোমেন হেসে বলে—তোমার জন্য কত কষ্ট করে করে আনলাম, নাও।
ভ্রূ কুঁচকে আবার রণেন সোমেনের দিকে চায়, বলে—বাসায় কেউ নেই?
—কাকে চাইছ?
—মা।
এমনভাবে মা কথাটা উচ্চারণ করল যেমনভাবে টুবাই ঘুম থেকে উঠে করে। রান্নাঘর থেকে ননীবালার স্বর শোনা যাচ্ছিল, একা-একা বউমাকে বকছিল। সেই স্বরটাই বোধ হয় উৎকর্ণ হয়ে শুনল রণেন। প্রাণে জল এসেছে এমন হঠাৎ-পাওয়ার মতো বলল—ওই তো মা!
—মাকে পাঠিয়ে দেব? সোমেন জিজ্ঞেস করে।
রণেন চায়ের কাপ তুলে চুমুক দেয়। ভ্রূ কোঁচকানো। বলে—মার কত বয়স হয়ে গেল! আর কতদিন বাঁচবে? অ্যাঁ! যদি মরে যায় তা হলে থাকব কি করে মা ছাড়া!
সোমেন বিছানার ওপর বসে দাদার দিকে চেয়ে থাকে। দাদাকে এক প্রকাণ্ড শিশুর মতো লাগে। বলে—ওসব ভাববা কেন?
—ভাবব না? বলিস কী! চা খেয়ে কাপটা নামিয়ে রেখে বলে—সবাই থাকবে আমি চলে যাব, সেটাই ভাল। কারও মরা আমি সহ্য করতে পারব না সোমেন।।
—দাদা।
—যদি মার মরার সময় হয় তো তার আগে মরে যাব।
দাদা একটা সিগারেট ধরায়। নিজের হাতের তালুর দিকে নিবিষ্টভাবে চেয়ে থেকে বলে—মা ম্রিয়স্ব, মা জহি, শক্যতে চেৎ মৃত্যুমবলোপয়।
শ্লোকটা সোমেন বাবার কাছে কতবার শুনেছে। মেরো না, মোরো না, পারো তো মৃত্যুকে অবলুপ্ত করো। পরের দুর্দশা দেখে, মৃত্যু দেখে নিজের দুর্দশা ও মৃত্যুর কথা মানুষের মনে পড়ে। সেটাই দুর্বলতা। যার হৃদয় সবল সে তা ভাবে না, বরং ওই সব অবস্থায় যেন আর কেউ বিক্ষিপ্ত না হয়, তারই উপায় চিন্তা করে। ওই হচ্ছে সবল হৃদয়ের দৃষ্টান্ত, বুদ্ধদেবের যেমন হয়েছিল। বাবা বলতেন। বাবার কথা আজকাল সোমেনেরও বড় মনে হয়। সেদিন যখন ম্যাক্স তার জগজ্জননীর গল্প বলছিল তখনও অস্পষ্টভাবে কেবলই বাবার কথা ভেবেছিল সোমেন। ওই সব মন্ত্র-তন্ত্র ওই সব প্রাচীন ভারতীয় মনোভাবের সঙ্গে যেন বাবার নাড়ির যোগ। বংশধারা বেয়ে প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যধারা যেন বা ব্রজগোপাল পর্যন্ত আসতে পেরেছিল বহু কষ্টে। তারপর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। স্তব্ধ হয়ে গেছে। ভারতবর্ষ আর নেই। যে দেশটা পড়ে আছে সে দেশকে লাথি মেরে রসাতলে পাঠিয়ে দিতে ইচ্ছে করে কেবল। মনে হয়, লক্ষ্মণদা আমেরিকায় কত মজায় আছে। এরকম পালিয়ে যেতে পারলে বেশ হত। কে চায় ভিখিরি ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব, কে চায় এ দেশের আজন্মমৃত্যু বন্দিদশা?
