ম্যাক্স উঠে বসে কেতরে প্যান্টের পকেট থেকে একটা নাইনলের ফোল্ডার বের করে আনে। হাতের তেলায় ঢালে কয়েকটা ট্যাবলেট। আতঙ্কিত সোমেন চেয়ে থাকে।
ম্যাক্স আবার ফোল্ডার রেখে দিয়ে বলে—বয়ে বেড়াচ্ছি। স্মৃতিচিহ্ন। মেয়েটাকে শেষবার দিল্লির হাউজ খাস-এ একটা বাড়িতে গাড়িবারান্দার তলায় ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে চলে আসছিলাম। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, ভোরের আবছা আলোয় কম্বল জড়িয়ে শুয়ে আছে। উওম্যান, মেয়েছেলে। সমস্ত অবয়বে কোনও ঘাটতি নেই। মেয়েমানুষের সব অঙ্গই অটুট। তবু ও ঠিক মেয়েমানুষ নয়। যুদ্ধের সময়ে সোলজারদের একরকম রবারের পুতুল দেওয়া হয়, উইথ ফেমিনিন অর্গানস। ও অনেকটা সে রকম। তবু ও পুতুলও নয়। ও চেঁচায়, গাল দেয়, ইচ্ছা অনিচ্ছা প্রকাশ করে। তাই পুরুষেরা ওকে ওই রকমভাবে ফেলে ফেলে যায়। অন্য কেউ এসে ফের তুলে নেয়। কেবল সেই পুরুষ সঙ্গীটি, যে ইম্পোটেন্ট তার সঙ্গেই ও বাঁধা আছে। মৃত্যুচুক্তি। সুইসাইডাল প্যাক্ট। যেখানেই থাকুক, ঠিক তার কাছে ছুটে যায়। কোথায় তার মধ্যে জগজ্জননী! কোথায় প্রসন্নতা! এরপরও অনেকবার অনেক বেশ্যাকে ওই মন্ত্র বলেছি, দু-একজন ভারতীয় মহিলাকেও। তারা হেসেছে। না, তারাও জানে না ওই মন্ত্র। কখনও শোনেনি। বরং আমি ভারতবর্ষে ঘুরে দেখেছি উইমেনস লিবারেশন আন্দোলন চলছে। ইয়োরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় মেয়েছেলে বলতে আর কেউই প্রায় নেই, যারা আছে অল আর মেন উইথ ফিমেল অর্গানস। মহিলার অঙ্গলক্ষ্মণযুক্ত পুরুষ, তাদের লিবারেশন ঘটে গেছে। তাই পুরুষেরা আর মেয়েছেলে খুঁজে পায় না। পায় যৌন অঙ্গ, আর পার্টনার। সেই হাওয়া আসছে এ দেশেও। পৃথিবী থেকে মেয়েমানুষ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সোমেন। একদিন একটা বাঙালি মেয়েকে টেনিস খেলতে দেখে আমি সোজা গিয়ে তাকে বললাম—তুমি টেনিস খেল কেন? এ তো তোমাদের খেলা নয়। মেয়েটা অবাক। বলে—কী করে বুঝলে যে এ আমাদের খেলা নয়! আমি তাকে বোঝাতে পারলাম না। কিন্তু আমার কেবলই মনে হয়, কোথায় যেন ভুল হচ্ছে। ভীষণ ভুল হচ্ছে। মেয়েরা দুনিয়া জুড়ে কী একটা ভুল করছে, তাই এই অবস্থা। একদিন অণিমা বলেছিল—ম্যাক্স, তুমি সমাজপতিদের মতো কথা বললো কেন? মেয়েদের লিবারেশন তোমার ভাল না লাগতে পারে, কিন্তু জেনো মেয়েরা যে বেহায়া হয়ে উঠছে তা পুরুষেরা তাদের ওইরকম চায় বলেই। এখনও মেয়েরা পুরুষদেরই ক্রীতদাসী। তারা যেমন চায় তেমনই হয়ে ওঠে মেয়েরা। তোমরা যদি জগজ্জননী চাও তো মেয়েরা একদিন তাই হবে। একথা শুনে আমি অণিমার প্রেমে পড়েছিলাম। ও যে আমাকে রিফিউজ করেছে তাতেও আমি খুশি। শি ওয়াজ অর্থডক্স। আর, রক্ষণশীল মানুষ আমি খুব পছন্দ করি সোমেন।
সোমেন তর্ক করল না। কেবল শুনল। মাথাটা টালমাটাল। হাওয়ায় শুয়ে থাকতে বড় ভাল লাগছিল। ঠান্ডা বাতাসে একটু জলীয় গন্ধ। বয়ার গায়ে জলের শব্দ। মাঝগাঙ থেকে মাল্লাদের সুর ভেসে আসে কখনও। দেয়ালের মতো উঁচু একটা জাহাজ দক্ষিণ থেকে উত্তরে চলে যায়।
॥ চুয়াল্লিশ ॥
কাল অণিমার বিয়ে। শাড়ির দামটা এখনও অণিমাকে দেওয়া হয়নি। ভাবলেই লজ্জা করে সোমেনের। পাগলামিটা না করলেও চলত। দেড়শোটা টাকা হুট করে খরচ করা কি তার উচিত? হাতে টাকা নেই বহুদিন। মাসের প্রথমে অণিমাদেরই বাসা থেকে খামে করা একশো টাকা পেয়ে যায় সে, তারপর সারা মাস অনাবৃষ্টি। কী ভীষণ খরচ করতে ইচ্ছে করে সোমেনের, হাত পা নিশপিশ করে খরচ করার জন্য। টাকা থাকলে কত কী করত সে। দাদা, বউদি, মা আর ভাইপো-ভাইঝিদের জন্য রাজ্যের জিনিস কিনত। দিত বাবাকেও, এক আধ প্যাকেট গোল্ডফ্লেক কিনতে ইচ্ছে করে, কিছু বই মাঝে মাঝে ট্রামবাসের ভিড় ছেড়ে ট্যাক্সি করতে। সামান্য ইচ্ছে। কত লোকের কত বেশি টাকা আছে। কিনে শেষ করতে পারে না। কালো টাকা। যাদের নেই তারা আক্রোশে আক্ষেপে গভর্নমেন্টকে গালাগাল দেয় ট্রামে বাসে আড্ডায়। প্রতি বছর বাজেটের খবর বেরোলে হতাশায় দেখে, আবার সিগারেটের দাম বাড়ল, জামাকাপড় মহার্ঘ হয়ে গেল, সিলিং ফ্যান আর কেনা যাবে না। পূর্ব এসপ্ল্যানেডে অবরোধ জোরদার হয়, মিছিল বাড়ে, ছায়াময়ী হতাশার মেঘ গুমোট করে রাখে সারা দেশকে। লাথি মারতে ইচ্ছে করে সোমেনের। লাথিতে লাথিতে ভেঙে ফ্যালে কলকাতা, বাংলাদেশ, ভারতবর্ষ।
বউদির খোঁজে একবার দাদার ঘরে উঁকি দিল সোমেন। বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। খেয়াল ছিল না, এ সময়ে বউদি টুবাইকে ইস্কুল-বাস থেকে নামিয়ে আনবার জন্য রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বড় দুজন আরও পরে ফেরে। ফাঁকা ঘরে একা দাদা বসে আছে বিছানায়। উঁকি দিতেই চোখে চোখ পড়ে গেল। দাদার চোখ দুটো কিছু অস্বাভাবিক, ঘোলা এবং উজ্জ্বল লালচে আভাযুক্ত। তাকিয়ে বলল—কে রে? সোমেন?
—সোমেন পরদা সরিয়ে একটু হেসে বলে—কেমন আছো দাদা?
রণেন যেন অবাক হয় প্রশ্ন শুনে। বলে—কেমন থাকব! ভালই আছি। আমার হয়েছেটা কী যে, জিজ্ঞেস করছিস কেমন আছি?
ভুলটা বুঝতে পারে সোমেন। প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি। বলল—শরীর খারাপ শুনেছিলাম।
রণেন মাথা নেড়ে বলে—না। বেশ আছি। এরা সব কোথায় গেল? আমাকে এখনও সকালের চা দেয়নি।
