গঙ্গার ধার ঘেঁষে ঘাসজমির ওপর চুপচাপ কিছুক্ষণ পড়ে রইল দুজন। নেশা কাটছে।
অনেকক্ষণ বাদে সোমেন মাথা তুলে বলে-ও আমাকে ভালবাসত।
ম্যাক্স পাশ ফিরে একটু দেখল সোমেনকে। চোখে কৌতুক ঝিলিক দেয় বলল—তাই নাকি? তারপর আবার উদাসী চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে—তুমি ভাগ্যবান।।
—তুমি ওকে কী করছ সাহেব?
ম্যাক্স চিত হয়ে শুয়ে আছে, মাথার নীচে দুই হাতের তেলো, আকাশে চোখ। উদাস গলায় বলে—নাথিং।
—লায়ার।
ম্যাক্স হাসল। মিষ্টি, বিষন্ন হাসি। বলল—তোমার খুব নেশা হয়েছে।
—আলবত হবে! বলে উঠে বসে সোমেন। আর একটা লাফ রিংঅলা সিগারেট বের করে ধরাতে যাচ্ছিল, ম্যাক্স হাত বাড়িয়ে ঠোঁট থেকে কেড়ে নিল, বলল—আর নয়। তা হলে মুশকিলে পড়বে।
সোমেন হামাগুড়ি দিয়ে সাহেবের কাছে আসে। বলে—সত্যি কথা বলে।
ম্যাক্স একটু অবাক হয়ে চেয়ে রইল। বলল—আমার লুকনোর কিছু নেই সোমেন। আমি নক্সালাইটদের সঙ্গে দু-তিনমাস আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলাম অ্যান্ড আই হ্যাড ট্রাবল উইথ দি পলিস। কিছুদিন আমাকে জেলেও রাখা হয়েছিল। আমার সময় ছিল না যে কিছু করি।।
তবু সোমেনের মনে হচ্ছিল, ম্যাক্স মিথ্যে কথা বলছে। বললেই বা কী! অণিমার জন্য সোমেনের আর কী আসে যায়! সে তো ভালবাসত না অণিমাকে? এই তো কদিন পরে অণিমা এক সম্পূর্ণ অচেনা মানুষের সঙ্গে বাস করবে, তখনই বা কী করার থাকবে সোমেনের?
তবু সোমেন ম্যাক্সের গলার কাছে জামাটা আলগা হাতে মুঠো করে ধরে বলে—সত্যি কথা বলো ম্যাক্স। আমি জানতে চাই।
ম্যাক্স জিভ দিয়ে চুক চুক একটা শব্দ করল। মাথা নেড়ে বলল—ইউ আর এ চাইল্ড। আমি বিদেশি বলেই তুমি আমাকে সন্দেহ করো সোমেন। তুমি ভাবো, যৌনতার ব্যাপারে আমাদের কোনও বাছবিচার নেই। সেটা সত্যিও বটে।
বলতে বলতে উঠে কনুইয়ের ওপর ভর রেখে একটু কাত হয়ে সোমেনের মুখের দিকে তাকায় ম্যাক্স। বলে—এর আগের বার বেনারসে স্যানক্রিট শেখার জন্য আমি এক পণ্ডিতের কাছে যেতাম। সে লোকটা বুড়ো, কিন্তু খুব স্বাস্থ্যবান, সুপুরুষ। সে লোকটা আমাকে একটা শ্লোক শিখিয়েছিল। তোমাদের যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণে আছে, স্বামী-স্ত্রীর যৌন মিলনের আগে স্বামী-স্ত্রীর নাভিতে হাত রেখে বলবে প্রসীদ জগজ্জননী। হে জগতের মা, তুমি প্রসন্ন হও। আমাকে তোমার ভিতরে গ্রহণ করো। আমি যেন তোমার ভিতর দিয়ে পুত্ররূপে আবার জীবন লাভ করি। ওইভাবে আমার সত্তা অনন্ত ও অখণ্ড হোক। ওই হচ্ছে গর্ভধারণের মন্ত্র, প্রসীদ জগজ্জননী। তুমি জানো?
সোমেন মাথা নাড়ল। জানে না।
ম্যাক্স আবার তেমনি চিত হয়ে শোয়। উদায় হয়ে যায় বুঝিবা। গঙ্গার বানডাকা বাতাস বয়ে যায় বুকের ওপর দিয়ে। অনন্ত আকাশ ঝুঁকে আছে মুখের ওপরে উদাসীন ভাবে। সেখানে ফিরোজা রং ধীরে মুছে দিচ্ছে গোধূলির বেলা। নক্ষত্রের জগৎ ভেসে উঠতে থাকে। ম্যাক্স বলে—আমরা সৃষ্টিকর্তা নই সোমেন। আমাদের ভিতর দিয়ে যে পুত্র কন্যারা আসে আমরা তাদের সৃষ্টি করি না। আমরা কেবল প্রজননের উপলক্ষ। যৌনতা আমাদের যে আনন্দ দেয় তা একটা প্রলোভন মাত্র, ওই প্রলোভনে আমরা নারীর সঙ্গে মিলিত হই, কিন্তু আসলে ওই ভাবে প্রলুব্ধ করে প্রকৃতি আমাদের দিয়ে তার কাজ করিয়ে নেয়। উই রিপ্রোডিউস। এ হচ্ছে বায়োলজি। আমি বায়োলজি জানি। কিন্তু যৌনতার কোনও দর্শন আমার ছিল না। দুশো মেয়ের সঙ্গে শুয়েছি, কিন্তু তারা আমাকে শেখায়নি। একটা ছোট্ট শ্লোকে আমি তা শিখে গেছি।
সোমেন অধৈর্যের সঙ্গে বলে—তুমি এত জানো কেন ম্যাক্স?
ম্যাক্স তেমনি উদাসীনভাবে শুয়ে রইল। চোখ বোজা। বলল—তোমাদের জানবার জন্য আমি মাইলের পর মাইল ঘুরে বেড়িয়েছি, গ্রামে-গঞ্জে হাটে-বাজারে পড়ে থেকেছি, ভিখিরিদের সঙ্গে থেকেছি। খুঁজেছি, যতভাবে খোঁজা যায়। বেনারসে একবার একটা রেস্টুরেন্টে বসে খাচ্ছি। দুপুরবেলা। আমার টেবিলে একটা ছেলে আর মেয়ে এসে বসল। হিপি টাইপ। ছেলেটির চুল দাড়ি আছে, বিশাল চেহারা। মেয়েটার ভারী কম বয়স। একটু রোগা, সারা গায়ে ময়লা। সে একটা লম্বা ঝুলের ফ্রক পরেছিল। তার ফ্রকের নীচে কাঁচুলি ছিল না, স্তনের বোঁটা ফুটে আছে জামার ওপর। আমেরিকান। তারা ব্যাগ থেকে জ্যাম-এর কৌটো বের করে রুটিতে মাখিয়ে খাচ্ছিল। আমার সঙ্গে কয়েকটা কলা ছিল, আমি তাদের দিলাম। তারা আমার রুটিতে তাদের জ্যাম মাখিয়ে দিল। ওইভাবে পরিচয়। আমাদের কোনও পিছুটান নেই, তাই তক্ষুনি দল বেঁধে ফেললাম। সেই রাতে আমি আমার ধর্মশালা ছেড়ে ওদের ধর্মশালায় গিয়ে উঠলাম। একটু বেশি রাতে মেয়েটা আমার বিছানায় চলে এল। আমি তখন খুব উত্তেজিত ছিলাম, কারণ ওই মন্ত্র তখন আমার ভিতরে ঘুরছে। একটি মেয়ের ওপর ওই মন্ত্রটার প্রভাব লক্ষ করা আমার দরকার ছিল। তখন নিশুতিরাত। মেয়েটি নগ্ন হয়ে শুয়ে আছে, আমি বসে তার নাভিতে হাত রেখে বললাম—প্রসীদ জগজ্জননী। সে জিজ্ঞেস করল এর অর্থ কী! বুঝিয়ে বললাম। মেয়েটা অনেকক্ষণ কথা বলতে পারেনি। যৌন মিলনের আগে এ রকম ভারী কথা শুনে সে কেমন হয়ে গেল। নিশুত রাত, এক বিছানায় আমরা দুটি নরনারী, ন্যাংটো। তবু আমরা মিলিত হতে পারছিলাম না। আমি বার বার জিজ্ঞেস করছিলাম—ডু ইউ ফিল লাইক জগজ্জননী? তুমি কি প্রসন্ন হয়েছ? সে বার বার মাথা নেড়ে বলে—ওঃ নো। আই ফিল রেস্টলেস। অবশেষে আমি তাকে বললাম- তা হলে তোমার সঙ্গীর কাছে যাও। ও তোমাকে তৃপ্ত করুক। মেয়েটা আমাকে আঁকড়ে ধরে বলল—ও লোকটা ইম্পোটেন্ট। আমি ওর কাছে যাব না। অবাক হয়ে বলি—ইম্পোটেন্ট হয়ে থাকলে ওর কাছে আছ কেন? আমেরিকানরা সহজে কাঁদে না। মেয়েটাও কাঁদল না, কিন্তু ওর গলার স্বরে শুকনো কান্না ছিল। বলল—হোয়েন আই ফিল লো অ্যান্ড ডাউন, যখন আমি ভয়ংকর ভাবে ভেঙে পড়ি, তখন ও আমাকে একটা ট্যাবলেট দিয়ে বলে—সোয়ালো ওয়ান, অ্যান্ড ইউ ফিল ডিভাইন। সেই ট্যাবলেট খেলে আমি সত্যিই স্বর্গে পৌঁছে যাই। বুঝলাম, ও ড্রাগ খায়। এল-এস-ডি, ককেইন বা ওইরকম কিছু। আইওয়া ইউনিভার্সিটির ছাত্রী ছিল, একদিন হঠাৎ ওর মনে হয়েছিল, বেঁচে থাকাটা বড় একঘেয়ে। মাত্র আঠারো কি উনিশ বছর বয়সে সব রকম যৌন মিলনের আনন্দ সে পেয়েছে, ভাল পোশাক, ভাল গাড়ি, গান, শিল্প, সাহিত্য-সবরকমের আনন্দ উপভোগ করেছে। নেচেছে, সাঁতার কেটেছে, প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখেছে, দেশ ভ্রমণ করেছে। মৃত্যুশোক পায়নি, প্রেমে ব্যর্থ হয়নি, তবু জীবনটা বড় একঘেয়ে। একদিন মনে হল, জীবনে কিছু নেই। মাথার ওপর পুরনো আকাশ, নদীর ওপর শীতের একঘেয়ে কুয়াশা জমে থাকে, তুষারপাতে ঢেকে যায় সবকিছু, আবার বসন্ত আসে, আসে গ্রীষ্মকাল। একই রকম ভাবে। হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চলে অবিরল, স্থির হয়ে থাকে মাথা উঁচু বাড়িঘর। নিত্য নতুন সঙ্গী জোটে, কিন্তু সেই একই রকম লাগে। কিছুতেই বুঝতে পারে না পৃথিবীতে সে জন্মগ্রহণ করেছে কেন! রাত জেগে কখনও-সখ- নও পুঁথির পাতায় খুঁজে হাজারো জবাব পেয়েছে, গেছে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে। অবশেষে একদিন এই ছেলেটির কাছ থেকে পেয়ে গেল জবাব। একটা সাদা ইনোসেন্ট ট্যাবলেট। খাও, স্বর্গে পৌঁছে যাবে। কিন্তু মুশকিল এই যে, একবার ট্যাবলেটের স্বর্গে পৌঁছলে আর পৃথিবীকে কিছুতেই অন্য অবস্থায় সহ্য করা যায় না। সেই নেশা কেটে যায় তখনই মনে হয়, পৃথিবীতে বেঁচে থাকার মধ্যে কোনও সুখ নেই; সে বড় দুঃখী। ফালতু মানুষ। নানা দুঃখের হাওয়া এসে বুকে ধাক্কা দেয়। মনে হয় জীবন এক এমন নৌকো যা মৃত্যুনদী ভেদ করে চলেছে। চারদিকে মৃত্যুর বাতাস, মৃত্যুর গন্ধ। বেঁচে থাকা এক প্রগম্ভতা মাত্র। তাই আবার ট্যাবলেট খাও, পৌছে যাও তুরীয় আনন্দে, কুঁদ হয়ে থাকো। সিগারেট, কফি বা মদ কোনও নেশাই এর ধারেকাছে আসতে পারে না। এ নেশা যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদ। নেশা কেটে গেলেই দিন দিন পৃথিবী আরও বীভৎস হতে থাকে। মেয়েটা তাই ওর সঙ্গীকে ছাড়তে পারে না। তারা মৃত্যুর চুক্তিতে আবদ্ধ। পৃথিবী জুড়ে মানুষ নানাভাবে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার অস্তিত্ব, তার প্রয়োজনীয়তা, তার জন্মের কারণ। সে চার্চে যায়, শুঁড়িখানায় যায়, মেয়েমানুষের কাছে যায়, সে পৃথিবী লোপাট করে টাকা কুড়িয়ে আনে। সে অসুরের মতো খাটে, নাচে, সাঁতার কাটে। বিপ্লব করে, যুদ্ধে যায়, চাঁদের মাটি কুড়িয়ে আনে। তবু তার নিজের ভিতরে অনড় হয়ে থাকে কুয়াশায় ঢাকা একটু রহস্য—সে কে? সে কেন? এই রাতে ছোট্ট কম্বলের বিছানায় আমরা দুই অনাবৃত নারী-পুরুষ বসে রইলাম। আমাদের মাঝখানে ওই কুয়াশা, ওই রহস্য। আমি তাকে বার বার জিজ্ঞেস করলাম—তুমি কি বুঝতে পারছ তোমার মধ্যেই সৃষ্টির নিহিত রহস্য? তোমার ভিতর দিয়েই আসে প্রাণ? তুমি জগতের জননী? সে মাথা নেড়ে ততবার বলে—না, আই ডোন্ট ফিল লাইক মাদার মেরি। আই ফিল রেস্টলেস। আমি হতাশ হয়ে অবশেষে তাকে জিজ্ঞেস করলাম—তুমি মেয়েমানুষ, এটা অনুভব করো কি? ওইভাবেই রাত কেটে গেল। একটা রাত, হয়তো বা একটা যৌন ব্যর্থতার রাত। পরদিন আমি মেয়েটাকে নিয়ে ধর্মশালা থেকে চলে এলাম, ওর সঙ্গী বাধা দিল না। তাকিয়ে একটু দেখল কেবল। আর একটা বিশ্রি গালাগাল দিল। মেয়েটাকে নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। ধর্মশালায়, হোটেলে, রাস্তায়। আমাদের যৌন মিলন হয়নি যে তা নয়। না হলে মেয়েটাকে নিয়ে আমার এক্সপেরিমেন্ট সম্ভব হত না। বড় রেস্টলেস ছিল মেয়েটি। বেনারসে থাকবার সময়ে সে প্রায়ই আমাকে ফাঁকি দিয়ে তার পুরুষ সঙ্গীর কাছে চলে যেত, ট্যাবলেট খেয়ে আসত। কিন্তু থাকত আমার সঙ্গেই। প্রতি রাতেই আমি তার নাভিতে হাত রেখে বলতাম—প্রসীদ জগজ্জননী। সে মাথা নাড়ত। না। সে কিছু অনুভব করছে না। ড্রাগের নেশাডুদের যে সব দোষ থাকে সবই তার ছিল। মাঝে মাঝে সে আমাকে প্রচণ্ড গালাগাল করত, চিৎকার করত। আবার ট্যাবলেট খেলে তার মুখে চোখে অদ্ভুত তৃপ্তি আর আনন্দ ফুটে উঠত। সে আমাকে প্রায়ই বলত—ম্যাক্স, তুমিও খাবে ট্যাবলেট? খাও, ইউ ফিল ডিভাইন। সে আমাকে ট্যাবলেট দিত।
