—পারব না। বলে রেগে উঠে গেল সোমেন। একটু বাদে ফিরে এসে দেখল বউদি রান্নাঘরে উবু বয়ে বসে আছে, দু-হাঁটুর ভিতরে গোঁজা মাথা, চোখের জল মুছছে। বড় মায়া হল। নিঃশব্দে টুবাইকে কোলে নিয়ে চারু ডাক্তারের ডিসপেন্সারিতে গেল সোমেন।।
এই রকম হয়েছে তার আজকাল। হঠাৎ রাগ উঠে পড়ে, হঠাৎ বড় মায়া হয়। বাসায় সবসময়ে এক শোকের মতো স্তব্ধতা। দাদা অফিসে যায় না। বড় একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখে ওষুধ দিয়েছে। চেঁচামেচিটা একটু কম করে। কিন্তু ভ্যাবলা ভাবটা যায়নি এখনও। তেমন গুরুতর কিছু নয় বোধ হয়। কিন্তু মা আর বউদি অনেকটা রোগা হয়ে গেছে। সারাদিন তাদের মুখ শুকনো। এই গুমোট, কথাশূন্য, মন-খারাপ বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। এখনও রোগ, শোক, দুঃখ-টুঃখ ঠিক নিতে পারে না সোমেন। পালিয়ে বেড়ায়। কিন্তু যাওয়ার তেমন কোনও জায়গা নেই। বন্ধুরা অধিকাংশই চাকরি করে। আড্ডা দেয় সন্ধের পর। কিন্তু সারাদিনটা সোমেন করে কী! এক-আধদিন বন্ধুদের অফিসে গিয়ে হানা দেয়। বেশি যেতে লজ্জা করে। অহংকারে লাগে।
ম্যাক্স এখনও কলকাতায় আছে। মাসখানেকের মধ্যে দেশে ফিরে যাবে। কয়েকদিন বেনারসে কাটিয়ে এল। মুখচোখ খুব উদাস। আরও একটু রোগা হয়ে গেছে। পেটে ফাংগাস হয়েছে। সোমেনকে একদিন বুঝিয়ে বলল—আই হ্যাভ এ গার্ডেন ইন মাই স্টমাক। পেটের মধ্যে শ্যাওলা পড়েছে। লাল রিংঅলা দুটো সিগারেট দিল একদিন, বলল—পিওর টোবাকো নয়। একটু গাঁজা আছে কিন্তু।
সোমেনের তাতে কিছু যায় আসে না। গাঁজা খেলেই কী! দুটো সিগারেট একঘণ্টায় শেষ করে দিল সোমেন। দেখে একটু হাসল ম্যাক্স। কিছু বলল না। অনেকক্ষণ হালকা ওজনশূন্য শরীর আর ভাসন্ত মাথার এক অদ্ভুত নেশা রইল সোমেনের। মনটা টল টল করে। আরও দুটো সিগারেট চেয়ে রেখে দিল সোমেন, বদলে পাঁচ প্যাকেট দিশি সিগারেট কিনে দিল ম্যাক্সকে। গঙ্গার ধার ধরে দুজনে বিস্তর হাঁটল।
—ম্যাক্স।
—উঁ।
—তুমি অণিমাকে ভালবাসো?
ম্যাক্সের মাথায় পাখির বাসার মতো চুলের ঝোপড়া। গঙ্গার দিক থেকে মুখ ফেরাল ম্যাক্স। অমনি দুরন্ত বাতাসের ঝাপটায় চুলের রাশি এসে পড়ল গালে। কপালে। একটু পিঙ্গল দাড়ি গোঁফের ভিতরে আচ্ছন্ন মুখ। চোখের ফসফরাস আজও জ্বলে ওঠে। কিন্তু ওকে বিপজ্জনক মানুষ বলে মনে হয় না।
ম্যাক্স একটু হাসল, বলল —বাঙালি মেয়েরা বিদেশিকে ভয় পায়।
—তুমি প্রোপোজ করেছিলে?
ম্যাক্স মাথা নাড়ল। বলল—হুঁ—হুঁ। কিন্তু ও রাজি হয়নি, আমিও সেজন্য দুঃখিত নই। অণিমা ভাল মেয়ে, কিন্তু বড় মর্যালিস্ট।
—তোমার ওকে ভাল লাগে না?
—লাগে। সো হোআট? বলে আবার একটু হাসে ম্যাক্স, বলে—আই হ্যাভ স্লেপট উইথ ওভার টু হ্যান্ড্রেড গার্লস। নো অ্যাটাচমেন্ট। আই অ্যাম অলমোস্ট এ সেইন্ট।
এই রোগা সাহেবটা দুশো মেয়ের সঙ্গে শুয়েছে? ভারী অবাক হয়ে তাকায় সোমেন, বলে—লায়ার!
—ওঃ নো। বলে ম্যাক্স হাসে, বলে—আমার একটা নোটবই আছে। প্রত্যেকটা মেয়ের নাম আর ডেট তাতে লিখে রেখেছি। ইট ওয়াজ এ হবি। অবশ্য এসব বেশিরভাগই ঘটেছিল অস্ট্রেলিয়ায়।
ফুচকাওলার সামনে দাঁড়িয়ে গেল তারা। গঙ্গার বাতাসে জলের ছলাৎছল ভেজা শব্দ আসে। বাজে জাহাজের ভোঁ, ডাক দিয়ে যায় দশদিকে ছড়ানো মহাবিশ্বের অপার বিস্তারে। গাঁজার নেশা আর ফুচকার ঝাল-টক স্বাদ ভেদ করে মর্মমূলে একটা গুপ্ত পেরেকের যন্ত্রণা নড়েচড়ে ওঠে।
—আর, ইন্ডিয়ায়? সোমেন প্রশ্ন করে।
—এ ফিউ। বেশির ভাগই প্রস্টিটিউটস। মেয়ে মাত্র কয়েকজন।
হঠাৎ বিষম খায় সোমেন। কয়েকজন! কে সেই কয়েকজন? বুকটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। ম্যাক্সের একটা হাত ধরে বলে—কারা? আমাদের চেনা মেয়ে?
ম্যাক্স শালপাতার ঠোঙা উলটে ফুচকার জল খাচ্ছিল। প্রচণ্ড ঝাল। নীলচে চোখ ভরে জল এসেছে, ঝালের চোটে কাশল খানিক। মুখ ছুঁচলো করে শিসাতে শিসাতে বলে-ওঃ লিভ দ্যাট। মেয়েছেলের ব্যাপারে আমি খুব ক্লান্ত। এখন একটু মজা পাই নেশায়, অন্য কিছুতে নয়। গার্লস উইল বি, গার্লস। দে অলওয়েজ টিজ ইউ।।
ম্যাক্সের হাতটা আরও শক্ত করে ধরল সোমেন। বলল—বলো ম্যাক্স। আমি জানতে চাই।
—কেন?
—সোমেন হাসল, বলল-মেয়েগুলোকে চিনে রাখব?
—কেন?
—চিনে রাখা ভাল, যদি ওদের কারও সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যায়।
ম্যাক্স সোমেনের হাতটা ছাড়িয়ে দিল। মুখটা কিছু গম্ভীর, বিষন্ন। বলল—তুমি বড় অর্থডক্স সোমেন।
এই বলে ম্যাক্স আবার ফুচকা নেয়। দ্রুত খেতে থাকে। ঝালের জন্য জিভে রাখতে পারে না, গিলে ফেলে কোঁত করে। বলে—তোমাকে বলি, আমি এখন রক্ষণশীল মানুষদেরই বেশি পছন্দ করি।
সোমেন হাতের শালপাতা ফেলে দিয়ে রুমালে হাত মুছতে মুছতে বলে—পূর্বা নয়তো!
—ওঃ নো।
—অপালা?
—গুডনেস, নো।
একটু ইতস্তত করে সোমেন। বড় ভয় করে। বুক কাঁপে। অবশেষে দাঁতে দাঁত চেপে বলে—অণিমা?
আকাশের দিকে মুখ তুলে ম্যাক্স ফুচকাটা মুখের মধ্যে ফেলে দেয়। গলা ঝাড়ে। উত্তর দেয় না। সোমেন চেয়ে থাকে। নেশাটা কেটে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। হাতে পায়ে ঝিমঝিমিনি ভাব। একটু দুর্বল লাগে।।
ম্যাক্স তারদিকে তাকায়। গম্ভীর চোখে। সোমেন সেই চোখ দুটোর দিকে চেয়ে থাকে।
তারপর আস্তে আস্তে, দুর্বলভাবে ঘাসের ওপর বসে পড়ে সোমেন, ফুচকাঅলার পায়ের কাছে। এবং বসে বসে যেন রসাতলে নেমে যাচ্ছিল সে।
