—গাঁট্টা খাবি। ছ্যাবলা কোথাকার!
—সংবাদ কী শুনি বৃন্দেদূতী।
পূর্বা মুখ ভ্যাঙাল। বলল—জানি না। অনিল রায় তোকে ডেকেছেন।
—কেন?
—বললেন, সোমেনের নাকি চাকরি দরকার! আমার ডিপার্টমেন্টে একটা পোস্ট খালি আছে, ওকে দেখা করতে বলো।
সোমেন ভ্রূ কুঁচকে বলে—আমার চাকরি দরকার সে কথা ওকে বলল কে?
পূর্বা উদাস গলায় বলে—কে জানে! তোমার তো হিতৈষী আর হিতৈষিণীর অভাব নেই। আমাদের জন্যই কেউ ভাবে না।
সোমেন খুব নাক উঁচু গলায় বলে—কি চাকরি জানিস?
—না। তবে প্রফেসারি নয় এটুকু বলতে পারি।
—এম এ পরীক্ষা দিইনি বলে ঠেস দেওয়া হচ্ছে?
—আহা, কী এমন বালিশটা যে ঠেস দেবো?
সোমেন হাসল। বলল—চা খাবি?
—তোর বাসায়? না বাবা, রাস্তায় দেখা হয়ে গিয়ে ভাল হল। একদিন তোর বাড়ি গিয়েছিলাম, অনেক দিন আগে, তুই ছিলি না। তোর মা সেদিন আমার জাত গোত্র জিজ্ঞেস করে অস্থির করে তুলেছিল। পালিয়ে বাঁচি। আজও ভয়ে ভয়ে যাচ্ছিলাম, নেহাত চাকরির খবর না দিলে নয়।
—আমার চাকরির খবরে তোর অত ইন্টারেস্ট কেন? সোমেন মিচকে হেসে বলে।
—আহা! বেকার বসে আছিস না!
—থাকলেই কী?
হাঁটতে হাঁটতে দুজনে বাসস্টপে চলে এল। রবিবার। বাস ফাঁকা যাচ্ছে। সোমেন একটা আটের বি থামতে দেখে বলল—ওঠ!
অবাক হয়ে পূর্বা বলে—কোথায় যাবি?
—হাওড়া। তারপর ট্রেন ধরব।
—ওমা। কেন?
—তোকে নিয়ে আজ পালিয়ে যাচ্ছি।
॥ তেতাল্লিশ ॥
আটের বি বাসটা ছেড়ে গেল। পূর্বা উঠল না। একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়ে হেসে বলল— পালাব কেন? বাড়িতে বলেকয়ে এলেই তো হয়। কেউ আটকাবে না।
সোমেন ভ্রূ কুঁচকে একটু তাকায় পূর্বার দিকে। গম্ভীর হয়ে বলে—চান্সটা মিস করলি৷
—বয়ে গেল।
দুজনে আস্তে আস্তে হেঁটে ব্রিজের ওপর উঠতে থাকে। কোথায় যাওয়া নয়, কেবলমাত্র হাঁটা। বৃষ্টির পর রোদ বড় তেজি। ভ্যাপসা গরম। ব্রিজের ঢালু বেয়ে ওপরে উঠতে একটু হাওয়া লাগল। রেলিঙের ধার ঘেঁষে দুজনে দাঁড়ায়। সোমেন বলে—লোকে আমাদের কী ভাবছে বলতো!
—যা খুশি ভাবুক গে। কত হাজার হাজার জোড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে কলকাতায়, লোকের ভাবতে বয়ে গেছে।
—তোর বাবা যদি এখন বাসে যেতে যেতে আমাদের দেখে ফেলে? সোমেন একটু কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে।
পূর্বা চোখ বড় বড় করে বলে—দেখেনি নাকি? কতবার কত ছেলের সঙ্গে দেখেছে। প্রথম প্রথম মার ওপর রাগারাগি করত। এখন ভাবেই না।
একটা ইলেকট্রিক ট্রেন তলা দিয়ে চলে গেল শিস টেনে। রেললাইনের ধারে বস্তি। আপ-লাইনের ওপর কাঁথা কাপড় শুকোচ্ছে রোদে, বাচ্চা-কাচ্চারা খেলছে, রোগা রোগা কালো চেহারর কজন মেয়েছেলে বসে আছে লাইনের ওপর, খুব নিশ্চিন্ত। ট্রেন এলে একটু সরে বসবে, ট্রেন চলে গেলে আবার লাইনের ওপর হামা টানবে দুধের শিশু, কাঁথা কাপড় শুকোবে।
দৃশ্যটা দেখিয়ে পূর্বা বলে—ভেবেছিস, কী সাহস! আমার হাত-পা শিরশির করছে।
—ওদের কিছু হয় না। রেললাইন ওদের উঠোন।
পূর্বা চুপ করে দৃশ্যটা দেখে একটু। ঠিক মুখের ওপর রোদ পড়ছে। হাতের মুঠোয় এক কণা রূমাল দিয়ে মুখটা মুছে বলল—অণিমার বিয়েতে কি দেওয়া যায় বলত। আমরা সবাই একসঙ্গে দেবো, শ্যামল বলেছে পারহেড কুড়ি টাকা। বড্ড বেশি না?
সোমেনের বুকের মধ্যে সেই কাঁপুনিটা ওঠে। একটা ব্যথা, একটা আনন্দ। মুখটা পূর্বার চোখের আড়াল করার জন্যই ঘুরিয়ে নিয়ে বলল—বেশি আর কী?
পূর্বা রাগের গলায় বলে—বেশ বেশি।
কথাটা কাউকে বলার নয়। চিরকাল এক বুক অন্ধকারে চাপা থাকবে অনিমার ভালবাসার কথা। সোমেন আর অণিমা ছাড়া আর কেউ জানবে না। কিন্তু সেটা সহ্য করা যায় কি? অণিমা যে তাকে ভালবাসত এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে তার নিজের জয়। কাউকে না বলে থাকে কী করে সোমেন? বুকের ভার একা বওয়া যায় না। বলবে না বলে বার বার মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল সোমেন। তবু মনটা তরল হয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে একটু হেসে বলল—অণিমাটা না একটা পাগল? জানিস?
পূর্বা মুখ তুলে বলল—কেন?
‘বোলো না, বোলো না পূর্বা সবাইকে বলে দেবে।’ এই বলে নিজেকে মনে মনে ধমকাল সোমেন। কিন্তু সামলাতে পারল না। ভাবল, অণিমা তো বলতে বারণ করেনি!
মুখে সে পূর্বাকে বলল—কাউকে বলবি না? গা ছুঁয়ে বল।
পূর্বা তার হাত ছুঁয়ে বলল—প্রমিস।
—একদিন না…
বলে ফেলল সোমেন। অনর্গল বুক থেকে কথা বেরিয়ে গেল। আটকানো গেল না। পূর্বা অবাক হয়ে চেয়েছিল। কিন্তু পূর্বাকে নয়, গোটা পৃথিবীকেই যেন জানানোর দরকার ছিল।
বলে ফেলেই হঠাৎ যেন নিবে গেল সোমেন। গভীর এক ক্লান্তি মনের ভিতরে। বলা উচিত হল না, বলা উচিত হল না। সবাই জেনে যাবে। অণিমার কানেও উঠবে কোনওদিন। ভাববে, সোমেন কেমন পুরুষ? হায় ঈশ্বর, ওকে আমি কেন ভালবেসে ছিলাম!
সোমেনের বড় ভয় করল! অণিমার বিয়ে হয়ে যাক, ভিন্ন পুরুষের ঘর করুক, তবু চিরকাল মনে মনে সোমেনকে ভালবাসুক—এই কি চায় না সোমেন? যদি সে কোনওদিন জানতে পারে যে অনিমার সেই গোপন ভালবাসা ফুরিয়েছে, তা হলে কি গভীরভাবে হতাশ হবে সোমেন?
পূর্বাকে বাসে তুলে দিয়ে ফিরে এল সোমেন। সারাটা দুপুর কেবল ভাবল। সে এত দুর্বল কেন? কেন বলে দিল পূর্বাকে। নিজেকে বড় ছোট মানুষ বলে মনে হয়।
নিজের ওপর বিরক্তিটাই ইদানীং বড় প্রবল। বড় রেগে থাকে সোমেন। বাড়ির লোকেরা কথা বলতে সাহসই পায় না। বউদি এসে একদিন বলল—টুবাইটার ট্রিপল অ্যান্ডজেন-এর শেষ ডোজটা বাকি আছে, চারু ডাক্তারের দোকান থেকে দিইয়ে আনবে সোমেন?
