হাওয়াই শার্টের বোতাম এঁটে রণেন ব্যাগটা তুলে নিল। বলল—ঘোষদা, যাই।
ঘোষ মুখ তুলে বলে—এটি কে? ভাই?
—হ্যাঁ।
ঘোষ মাথা নাড়ল। বলল—যান। বাড়ির সবাই ভাবছে। বলে একটু ব্যাঙ্গের হাসি হাসল যেন। আবার মাথা নেড়ে বলে—আমাদেরই ভাবাভাবির কেউ নেই। বাঁচা গেছে।
বৃষ্টির কলকাতায় জীবাণুর মতো থিকথিক করছ মানুষ, এখনও এই রাত আটটায়। বৃষ্টি কমে গেছে, তবু ঝিরঝির চলছে এখনও। গাড়িবারান্দার তলায় তলায় ভিড় জমে আছে। মানুষের পিণ্ড।
রণেন চারদিকে চেয়ে বলে—কী করে যাবি?
—দাঁড়াও একটা ট্যাক্সি যদি ধরতে পারি।
রণেন মাথা নেড়ে বলল—পাবি না।
—তা হলে? মা আর বউদি ভাববে।
রণেন উদাস গলায় বলে—ভাবুক। আয় কিছু খাই। খিদে পেয়েছে।
—খাবে?
দাদার সঙ্গে রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়ার কোনও অভিজ্ঞতা সোমেনের নেই। তার বড় লজ্জা করছিল। রণেনের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। গদাই লস্করের মতো হেঁটে বৃষ্টি ছাঁট উপেক্ষা করে সে ঢুকে গেল একটা রেস্টুরেন্টে। পিছু পিছু সোমেন। কিন্তু সেখানেও ভিড়। টেবিল খালি নেই। চারদিকে হতাশভাবে চেয়ে রণেন সোমেনের দিকে চেয়ে যেন নালিশ করল—খিদে পেয়েছে।
—বাড়িতে গিয়ে খেয়ো।
অধৈর্যের সঙ্গে রণেন বলে—সে তো অনেক দেরি। বলে সোমেনের দিকে রাগ আর নালিশভরা একরকম চোখে চেয়ে থাকে।
এ-কদিনেই দাদার ভিতরে একটা ওলটপালট হয়ে গেছে। সেটা সোমেন এই টের পেল। স্বাভাবিক রণেন এভাবে কথা বলে না তাকায় না। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে সোমেন বলে— শেয়ারের ট্যাক্সি মেট্রোর উলটোদিকে দাঁড়ায়। চলো, যদি পেয়ে যাই।
রণেন কিছু বলল না। কিন্তু সোমেনের সঙ্গে হাঁটতে লাগল।।
দুদিন বৃষ্টির পর কলকাতা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল। এখানে-সেখানে কিছু জল দাঁড়িয়ে আছে। তবু রোদ উঠেছে। আকাশ গভীর নীল। দুদিন সাংঘাতিক বৃষ্টি হয়ে গেল। সবাই ঘরবন্দি। এই দুদিন সোমেন কেবলই শুনেছে দাদার ঘর থেকে দাদা মাঝে মাঝেই চেঁচিয়ে বলছে—দরজা খুলে দাও। জানালা খোলা রাখো।
—বৃষ্টির ছাঁটে ঘর ভিজে যাচ্ছে। বউদি রাগ করে বলে।
দাদা তখন ভীষণ হতাশভাবে বলে—ওঃ হোঃ হোঃ। ইস কী অন্ধকার। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
মা প্রায় সারাক্ষণ ওই ঘরে। এ ঘরে একা সোমেন। বুকের মধ্যে দুশ্চিন্তা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। দাদার কী হয়েছে? মাঝে মাঝে ও ঘরে গিয়ে উঁকি মেরে দেখে আসে। দাদা নির্জীব হয়ে শুয়ে আছে কিংবা মাথা হাঁটুর ফাঁকে রেখে বসে। ছেলে-মেয়েদের মুখ করুণ, শুষ্ক। তার মধ্যেই মাঝে মাঝে বাবার কাণ্ড দেখে হেসে ফেলে। বেশির ভাগ সময়েই বাইরের ঘরে খেলা করে। বউদি ভাল করে খায় না। রাতেও বোধ হয় ঘুম নেই। শরীর এ-কদিনেই শুকিয়ে গেছে। একটা বিপদের আশঙ্কায় থমথম করে ঘরের আবহাওয়া। ঘরে তাই সোমেনের মন টেকে না।
সোমেন এ কয়দিন খুব সিগারেট খেল। ভাবল। কেমন যেন মনে হয় এবার সংসারে একটা পরিবর্তন আসবে, ছক পালটাবে। সেই আগের মতো নিশ্চিন্ত জীবন আর থাকবে না।
গভীর রাতে একদিন ঘুম ভেঙে শুনল কলের গান বাজছে। খুব আস্তে বাজছে, আর সেই সঙ্গে বাইরের ঘরে কার যেন নড়াচড়ার শব্দ, গভীর শ্বাস আর ‘আঃ উঃ শব্দ’।
দরজা খুলে সোমেন অবাক হয়ে দেখে, অদ্ভুত দৃশ্য। আলো জ্বালা হয়নি, তবু জানালা সব খোলা বলে বাইরের আলো এসে পড়েছে। রেডিয়োগ্রামের চৌকো ব্যান্ডে আলো জ্বলছে, স্থির হয়ে আছে সবুজ ম্যাজিক আই। আর রেডিয়োর সেই আলো চৌখুপির কাছে একটা মাথা অনড় হয়ে আছে। প্রথমটায় আবছায়ায় বুঝতে পারেনি সোমেন। তারপর দেখে, দাদা একটা আন্ডারওয়ার মাত্র পরে মেঝের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে বসে আছে। রেডিয়োর স্পিকারটা নিচুতে। স্পিকারের সঙ্গে কান লাগিয়ে শুনছে রবিঠাকুরের গলায় গাওয়া গানের রেকর্ড—‘অন্ধজনে দেহো আলো, মৃতজনে দেহে প্রাণ…’
সোমেন আস্তে করে ডাকল—দাদা!
রণেন মুখটা ঘুরিয়ে তাকে দেখল, তর্জনী ঠোঁটের কাছে তুলে বলল—চুপ।
আবার গান শুনতে লাগল। রেকর্ড ফুরিয়ে গেলে আবার ফিরে চালিয়ে দিল। সোমেনের দিকে ফিরেও তাকাল না। বোধ হয় ভুলে গেল যে কেউ তাকে দেখছে। দীর্ঘকাল সে যেন গান শোনেনি। আকণ্ঠ পান করে নিচ্ছে। যেন চৈত্রের মাঠ শুষে নেয় বৈশাখের বৃষ্টি। এখন ওর আর কেউ নেই, ওই গানটুকু, ওই কাঁপা কাঁপা রিক্ত কণ্ঠস্বর ছাড়া।
বহুকাল কাঁদে না সোমেন। কোনওকালে তার চোখে জল আসে না সহজে। এখন হঠাৎ হাতের পিঠে চোখ মুছল। গলা, কণ্ঠা অবরোধ করে কান্না উঠে আসে। সোমেন ঘরে এসে অন্ধকার হাতড়ে সিগারেট ধরায়। বসে থাকে। ঘুম হয় না।
দুদিন বৃষ্টির পর রোদ উঠতেই সে বেরিয়ে পড়ল সকালে। খাওয়ার জায়গা অনেক আছে। কিন্তু ঠিক কোথায় যে যেতে ইচ্ছে করছে তা বুঝতে পারছিল না। বুকের মধ্যে টনটন করে গুপ্ত ব্যথা। একা থাকতে ইচ্ছে করে। মেঘভাঙা রোদে ভ্যাপসা গরম। বাতাস নেই। এদিক-ওদিক কিছুক্ষণ হেঁটে সোমেন যখন আবার বাড়ির রাস্তায় ঢুকতে যাচ্ছিল তখনই দেখে পূর্বা আগে আগে যাচ্ছে।
সোমেন ডাকল—এই।
পূর্বা চমকে ফিরে তাকিয়েই হেসে ফেলল—ইস, এমন ভয় পাইয়ে দিস না!
—ভয়ের কী?
—রাস্তায় কেউ আচমকা ডাকলে ভয় করে না? তোর কাছেই যাচ্ছিলাম।
—সে বুঝেছি, নইলে এ পাড়ায় তোর আর কে লাভার আছে!
