অণিমা ভারী চশমার ভিতরে তার ছোট হয়ে আসা চোখে তাকাল সোমেনের দিকে। বলল—সিন্ধ্রি।
—অনেক দূর।
—দূর! বলে একটু ভাবে অণিমা। পরে হেসে বলে—তেমন দূর নয়। তবে দূরত্বটা রাখাই ভাল।
ব্যগ্র, লোভী সোমেন বলল—কেন অণিমা?
—গড়িয়াহাটা এসে গেল, সোমেন নামবে না?
—আর একটু যাই।
অণিমা শ্বাস ফেলে বলে—চলো।
গাড়ি চলে। খুব মৃদু ইন্টিমেট সুগন্ধীর একটা বাসি গন্ধ গাড়ির ভিতরে। স্নো-পাউডার কখনও মাখত না অনিমা। এখন কি মাখে? মৃদু সুবাস তার চারদিকে। মহীয়সীর মতো দেখাচ্ছে সাদা খোলের শাড়িতে। চওড়া পেটা জরির পাড়। এত দুর্লভ কখনও অণিমাকে দেখাত না। ঠাট্টা-ইয়ারকি একদম কি ভুলে গেল অনিমা?
—অনিমা, তোমার কাছে টাকা আছে?
অনিমা অবাক হয়ে বলে—কেন?
—ধার দেবে? একটা জিনিস কিনব?
সোমেন কোনওদিন ধার চায় না। অনিমা ব্যাগ খুলে দেখেটেখে বলে—কত বলল তো!
—জানি না। জিনিসটা শো-কেশে দেখলাম একটা দোকানে, ফেলে এসেছি পিছনে। গাড়িটা ঘোরাতে বলো।
গাড়ি ঘুরল। গড়িয়াহাটার দিকে ফিরে আসতে একটা দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করাল সোমেন। শো-কেসে একটা চওড়া লালপেড়ে বিষ্ণুপুরী শাড়ি। সোমেন নেমে গিয়ে দাম জিজ্ঞেস করল। দেড়শো টাকা।
গাড়ির কাছে ফিরে এসে বলল—দেড়শো টাকা দেবে?
কী একটা সন্দেহ করে অনিমা। একটু ইতস্তত করে টাকা বের করে দিয়ে বলল—মাঝে মাঝে পাগলামির ভূত চাপে, না?
সোমেন তার ভুবনজয়ী মিষ্টি হাসি হেসে বলল—পাগলই তো।
শাড়িটা কিনে এনে প্যাকেটটা গাড়ির সিটে রেখে উঠে বসল গাড়িতে। বলল—তোমাকে সাদা খোলের শাড়িতে বড় মহীয়সী মনে হয়।
—তাই নাকি?
বিয়ের দিন ওই কারণেই তোমাকে না দেখা ভাল। ওইদিন তো তোমাকে রঙিন বেনারসি পরাবে, ফুলের সাজ, চন্দন—এ সব তোমাকে মানায় না।
অনিমা সত্যিকারের হাসি হাসল একটু। বলল—সেটা দৃষ্টিভঙ্গির তফাত বলে। তোমার সঙ্গে যদি হতো তা হলে কী করতে? শুভদৃষ্টির সময়ে তাকাতে না সোমেন?
এ কথাটায় ঠাট্টা ছিল হয়তো। তারা হাসলও। কিন্তু হাসি কারও ঠোঁটের গভীরে গেল না।
দেশপ্রিয় পার্কের কাছে সোমেন নেমে গেল। অনিমা পিছন থেকে বলল—এই শাড়ির বাক্স পড়ে রইল যে!
সোমেন দরজাটা দড়াম করে ঠেলে দিয়ে বলল—তোমার জন্য। বিয়েতে তো যাওয়া। বারণ, তাই আজ দিয়ে রাখলাম।
—যাঃ। এই সোমেন, শোনো, শোননা…
সোমেন শোনেনি। চলে এসেছে।
কাল থেকে সারাক্ষণ মনটা তাই খারাপ। কেমন যেন। পিপাসা পায়, বুক খালি-খালি লাগে। আবার একটা ভূতুড়ে আনন্দে রক্তে আগুন ধরে যায়। মনের এই অবস্থায় একা বসে ভাবতে ভাল লাগে, আর কিছু ভাল লাগে না। কালকেও বিকেলে পড়াতে গিয়েছিল গাব্বুকে। অণিমা বাড়িতে ছিল না। গাব্বর কাছে একটা সাঁটা খাম রেখে গেছে। বাড়িতে ফিরে সেটা খুলে দেখেছে সোমেন। প্যাডের একটা কাগজের ঠিক মাঝখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা—নিলাম। মনে থাকবে। ভুলে যেয়ো। অ।
বাড়িতে একটা টেনশন চলছে আজকাল। সারাদিন সোমেন থাকে না। দুপুরে একটু থাকে, আর রাতে। প্রায় রাতেই মা আজকাল ঘুমনোর আগে দাদার কথা বলে। দাদার শরীর ভাল নেই। বউদির সঙ্গে গোলমাল হয়ে থাকবে, মনটাও তাই বোধ হয় ভাল থাকে না। বউদি মানুষটা খারাপ নয়, দাদা তো ভালই। কিন্তু দুজন ভালর জাত আলাদা। মা কিন্তু বরাবর দাদার পক্ষে। সোমেনকে রাত জাগিয়ে রেখে মা এক কাঁড়ি কথার হাঁড়ি খুলে বসে। সোমেন বিরক্ত হয়। সংসারের এত সব কথার মধ্যে বরাবর ডুবে মরে মন। তখন মনে হয়, অনিমা কিংবা রিখিয়ার কথা কত অবাস্তব! সংসারটা এত রোমাঞ্চহীন!
আজ বিকেল থেকে আকাশ কুঁসছে। বৃষ্টি এল। সোমেন বেরোতে পারেনি। সন্ধেবেলা প্রথমে মা, তারপর বউদি এসে ধরল। দাদা কেন ফিরছে না! সোমেন একটা কবিতার খসড়া তৈরি করছিল, এ সময়ে এই ঝামেলা। অত বড় লোকটা, দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন, সে যাবে কোথায়, তার হবেটাই বা কী! কিন্তু কেউ বুঝল না। বৃষ্টির ধারাটা কমতেই তাই সোমেনকে বেরোতে হয়েছে। বউদি ট্যাক্সির ভাড়া দিয়েছিল। কিন্তু ট্যাক্সি পাওয়া যায়নি। গড়িয়াহাটা থেকে ট্রাম ধরে এসেছে। মনে বিরক্তি রাগ।
কিন্তু এখন অফিসের দরজা পার হয়ে যখন দাদাকে দেখতে পেল সোমেন তখনই বড় চমকে উঠল। খালি গায়ে দাদা দাঁড়িয়ে, পরনে শুধু আধভেজা ফুলপ্যান্ট, আড়া-আড়ি বুকের ওপর ময়লা পৈতে। মোটা গোল গণেশ মুখ। ভুঁড়িটা ঠেলে বেরিয়ে আছে। শরীরটা ঢিলেঢালা, চামড়ার ভাঁজ। মুখেচোখে একটা ভ্যাবলা বোবা ভাব। বড় বড় চোখে সোমেনের দিকে চেয়ে আছে। চাউনিতে একটা নির্বোধ ভয়। দাদার এমন চেহারা কখনও দেখেনি সোমেন। সোমেন কাছে যেতেই বলল—কী হয়েছে? অ্যাঁ! কী হয়েছে?
সোমেন ভ্রূ তুলে বলে কী হবে!
—কার অসুখ? না কি অ্যাকসিডেন্ট?
সোমেন বুঝতে পারল না দাদা কী বলতে চাইছে। একটু অবাক হল। বলল—কী বলছে দাদা! আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।
—নিয়ে যাবি?
—মা বউদি সব ভাবছে দেরি দেখে।
এতক্ষণে যেন বা একটু স্বাভাবিক হল চোখ। দু-পা ফাঁক করে গম্বুজের মতো দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ অবসন্নের মতো বসে পড়ে বলল—ও।
—চলল। প্রায় আটটা বাজে।
রণেন মাথা নাড়ল। তারপর ভেজা জামা গেঞ্জি তুলে পরতে লাগল। হাত অল্প অল্প কাঁপছে। দৃশ্যটা দেখে সোমেনের সমস্ত হৃদয় বহুকাল বাদে দাদার দিকে ধাবিত হল একবার। কী হয়েছে দাদার? বহুদিন হয় এই লোকটাকে সে লক্ষই করেনি। লক্ষ করেনি, তার কারণ, রণেন কখনও লক্ষ করায়নি। বরাবর দাদা একটু গম্ভীর মানুষ, একটু চুপচাপ। নীরবে সে সংসারের দায়িত্ব বহন করে। সোমেন একটু বড় হওয়ার পর থেকেই দেখেছে, এই লোকটা সংসারের অভিভাবক। দু-ভাইতে কথা হয় খুব কম। কিন্তু আজও নিজের কোটটা প্যান্টটা, সাধ-আহ্লাদের নানা জিনিস সোমেনকে নিঃশব্দে দিয়ে দেয়। দাদা কখনও কাউকে খারাপ জিনিস দেয় না। বাজার থেকে কখনও সস্তা জিনিস আনে না। সোমেনের ফিরতে রাত হলে চৌরাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই দাদা। শান্ত, উদার, স্নেহশীল। দাদাকে কেন এতকাল লক্ষ করেনি সোমেন? দাদার কী হয়েছে?
