মেয়েটা মৃদু হাসল। সৌরভময় শ্বাস ফেলে বলে—মোটা তো কী! কেমন ফরসা তোমার রং, কেমন ঠান্ডা মাথা। চাকরিও ভাল।
—কেমন লাগছে আমাকে? ভাল?
মেয়েটা চোখ তুলে তাকাল, শুভদৃষ্টির সময়কার মতো চোখ। কী লজ্জা ও শিহরনে ভরা বিদ্যুৎ! কথা বলল না।
রণেন বলে—আমি আর একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করব।
—তার মানে কি দুটো জীবন?
রণেন মাথা নাড়ল—শুধু বউ হলে আনতাম। কিন্তু বাচ্চাগুলো রয়েছে যে। বড় মায়া।
মেয়েটি বুঝেছে। মাথা নাড়ল। তৎক্ষণাৎ একটা নাম দিল রণেন—লীনা। এই নামের একটা মেয়েকে বালকবয়সে ভালবেসে ছিল রণেন, যার সঙ্গে কোনওদিন কথাবার্তা হয়নি। লীনা করুণ চোখে চেয়ে মাথা নয়াল। বলল—তাই হবে।।
হবে! বাঃ! চমৎকার! সব সমস্যার কেমন সমাধান হয়ে গেল। সবাই থাকবে। বাচ্চারা, বীণা, আলাদা ফ্ল্যাটে লীনাও! বাঃ।
ভারী খুশি হয়ে ওঠে রণেন।
দুঘণ্টার বৃষ্টি কলকাতাকে লণ্ডভণ্ড করে গিয়ে গেল। ট্রাম বন্ধ, বাসে লাদাই ভিড়, ট্যাক্সির মিটার সব লাল কাপড়ে ঢাকা। বৃষ্টির পর কলকাতা থেমে যায়, কিংবা খুব আস্তে চলে। রথের মেলার মতো মানুষ জমে আছে সর্বত্র। থিকথিক করছে জীবাণুর মতো মানুষ।
রণেন অফিসের হলঘরে তার ভেজা জামা আর গেঞ্জি ফ্যানের তলায় চেয়ারের পিঠে মেলে দিয়েছে। বসে আছে চুপচাপ। অফিসে এখনও কিছু লোকজন আছে। জনা ছয়েক লোক একধারে ফিস খেলছে। অন্যধারে ব্রিজের আড্ডা বসেছে। শুধু মুখোমুখি ঘোষ বসে নীরবে অঙ্ক কষছে। রণেন চোখ বুজে ছিল। ভাবছিল সবাইকে ডেকে বলে দেবে, মরবার পর যেন তাকে না পুড়িয়ে কবর দেওয়া হয়: পোড়ানোটা বড় বীভৎস ব্যাপার। আবার পরক্ষণেই মনে হল,কবর! ওরেব্বাস, সেও তো মাটি চাপা হয়ে দমবন্ধ হবে। হাঁসফাঁস করতে হবে কেবলই।
ভেবেই সে হঠাৎ জোরে বলল—না না।
বলেই চমকে ওঠে। ঘোষ একবার মুখ তুলেই চোখ নামিয়ে নিল। কিছু জিজ্ঞেস করল না।রণেন লজ্জা পেল বটে, কিন্তু ঘোষ বড় বিবেচক মানুষ বলে লজ্জাটাকে সামলে গেল।
সাতটা বেজে গেছে। ফিসের আড্ডা থেকে দুজন বেরিয়ে গেল। একজন চেঁচিয়ে বলল—ঘোষদা, এই বৃষ্টিতে কি ভাল জমে বলুন তো?
ঘোষ উত্তর দিল না। ব্রিজের আড্ডা থেকে একজন চেঁচিয়ে বলল—ভূতের গল্প, খিচুড়ি আর মেয়েছেলে।
—দূর। ঘোষদাকে বলতে দিন।
ঘোষ উত্তর দিল না। একটু হাসল কেবল, অঙ্ক কষতে লাগল।
আর একজন বলে—ইলিশ।
—কত করে কেজি জানিস? ওই লাহিড়ি জানে, জিজ্ঞেস কর।
কে একজন চেঁচিয়ে ডাকে—লাহিড়ি, ও লাহিড়ি।
রণেন তাকাল। অ্যাকাউন্টসের বিপুল সেন। ভ্রূ কুঁচকে রণেন বলে—কী?
—ইলিশ মাছ কত করে যাচ্ছে?
—কী জানি!
—আমাদের মধ্যে তো এক আপনাকেই দেখছি যিনি ইলিশটিলিশ খান। আমরা তো আঁশটাও চোখে দেখি না। ইন্সপেক্টর না হলে সুখ কী!
রণেন মুখটা ফিরিয়ে নেয়। ব্যক্তিত্ব না থাকলে এরকম হয়। যে-সে যা খুশি বলে সারতে পারে।
কে একজন বলল—ইলিশ খেয়ে পয়সা নষ্ট করবে কেন! লাহিড়ি লকারে রাখছে। টালিগঞ্জে বাড়ি হাঁকড়াচ্ছে, সব খবর রাখি।
হলঘরের দরজাটা খোলা। কে একজন ছাতা মুড়ে, গা থেকে বর্ষাতি খুলতে খুলতে দরজা দিয়ে ঢুকে এল। দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে চারধারে চাইছে।
রণেন চিনতে পারল৷ সোমেন। বুকটা কেঁপে উঠল হঠাৎ। সোমেন অফিসে কেন? কোনও খারাপ খবর নেই তো! বাবা, মা, বীণা, বুবাই, টুবাই, খুকি, শীলা, অজিত—কত প্রিয়জনের নাম ঘাই মারে বুকের মধ্যে।
রণেন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
সোমেন তাকে দেখে এগিয়ে আসে।
॥ বিয়াল্লিশ ॥
মা আর বউদি দুজনে ঠেলে পাঠিয়েছে সোমেনকে দাদার ফিরতে দেরি হচ্ছে কেন তা দেখে আসতে। বৃষ্টি বাদলায় মানুষের দেরি হয়, কিন্তু কে বুঝবে সে কথা। সোমেন তাই খুব বিরক্তির সঙ্গে এসেছে।
মনটা ভাল নেই। গতকাল অণিমা এসেছিল বাসায়। সাদাখোলের শাড়ি পরা, চেহারাটা অনেক ভাল হয়েছে আজকাল। অনেক ধীরস্থির আগের চেয়ে। একটা চমৎকার হ্যান্ডমেড কাগজের কার্ডে ছাপা বিয়ের চিঠি দিয়ে বলল—যেও না সোমেন। সব নিমন্ত্রণে যেতে নেই।
এরকম কথা কখনও শোনেনি সোমেন। কেউ নেমন্তন্ন করতে এসে বারণ করে যায় নাকি!
ঘরে বসে কথা বলার সুবিধে নেই। তাই অণিমার সঙ্গে বেরিয়ে এল সোমেন। কোনও দিন নিজেদের গাড়িতে চড়ে কোথাও অণিমাকে যেতে দেখেনি সোমেন। অণিমার রুচিবোধ বড় প্রবল। গাড়ি আছে—এটা কাউকে দেখাতে চায়নি কখনও। কাল কিন্তু গাড়ি করে এসেছিল। সাদা অ্যামবাসাডার। অণিমার সঙ্গে পিছনের সিটে উঠে বসল। সামনে ড্রাইভার।
কথা হচ্ছিল না। একটা লালরঙা নাইলনের খাপে-ভরা নিমন্ত্রণের চিঠিগুলি সোমেন আর অণিমার মাঝখানে পড়েছিল। অণিমা দরজার কাছে অনেকটা সরে বসেছে। আলগা দূরের মানুষ, প্রায় পরস্ত্রী। সোমেন বলে—আমাকে গড়িয়াহাটায় নামিয়ে দিয়ো অণিমা।।
অণিমা উত্তর দিল না। অনেকক্ষণ বাদে বলল—পরীক্ষাটা দেবে না?
সোমেন হাসল, বলল—তুমি বড় বেরসিক। পরীক্ষাটা কোনও ফ্যাক্টর নয়। দিলেও যা, না দিলেও তাই। একজন গ্র্যাজুয়েট বেকার আছি, তখন না হয় এম-এ পাস বেকার হবো।।
—তা কেন? প্রফেসারির জন্য অ্যাপ্লাই করতে পারবে।
সোমেন হাসল। গড়িয়াহাটা ব্রিজের ঢালু বেয়ে গাড়িটা গড়িয়ে নামছে তখন। অণিমা বাইরের দিকেই চেয়েছিল। যেন অন্যমনস্ক। আসলে তা নয়। চেহারা ভাল হলেও অণিমার মুখে একটা খড়ি-ওঠা বিষন্নতার গুঁড়ো মাখানো। সোমেনের বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ড নেচে ওঠে। একই সঙ্গে একটা জয়ের আনন্দ ও হারানোর দুঃখ তাকে মুহূর্তের জন্য পাগল করে দেয়। একটু ঝুঁকে সে প্রশ্ন করে—বিয়ের পর কোথায় অণিমা?
