নাগা জহুরির মুখে হাজির হাসি। বলে—এ হচ্ছে নাগভিটে। বাস্তু সাপ-টাপ থাকতে পারে। তাই দেখছে সব।
—শুঁকে কী বোঝে সব?
—বাস্তু সাপ যেখানে থাকে সেখানকার মাটিতে সুন্দর গন্ধ পাওয়া যায়। যে সে অবশ্য বোঝে না। গুণিন ঠিক পায়। আর এমনি বিষের সাপ যেখানে থাকে সেখানে পচাটে গন্ধ।
—বাস্তু সাপ আছে নাকি? দেখিনি তো কখনও।
নাগা জহুরি মাথা নাড়ল। একটু বিমর্ষভাব দেখিয়ে বলল—ছিল। বড় পবিত্র প্রাণী। একটা জোড়া ছিল। কখনও এঁটো জলটল কিছু ছিটে লেগেছিল বোধ হয়, তাই জোড়া ভেঙে চলে গেছে।
বহেরু চেয়ে থাকে। বড় একটা শ্বাস ফেলে বলে—কবে গেল?
তুলসির জলের ওপর কামাখ্যার কালীর ছবি ধরে থেকে নাগা জহুরি বলে— বছরখানেক হবে।
—গেলে হয়টা কী?
—সংসারে নানা অশান্তি লাগে।
বহেরু নীরবে মাথা নাড়ল। বুঝেছে। একটা শ্বাস ফেলে বলল—তোমরা সব দুপুরে এখানেই খেওখন। বুঝলে! এখন চা খাও।
বলে বিন্দুকে ডাকাডাকি করতে থাকে বহেরু। হেলেদুলে বিন্দু আসে, মুখে একটু হাসির আভা ছড়ানো! টস্ টস্ করছে লোভি ঠোঁট। একটা চোখ হানল নাগা জহুরিকে। বহেরু একবার চোর-চোখে দেখে নিল, নাগা জহুরির কলজেটা কেমন। দেখল, খুব মজবুত নয়। বাচ্চা ছেলে, রোঁয়া ওঠেনি। একটু ভ্যাবলা বনে গেছে মেয়েটাকে দেখে। বহেরু এসব খুব উপভোগ করে। মেয়েটা তারই ঔরসের। তেজি আছে। বহেরু অন্যদিকে চেয়ে বলে—চা করে নিয়ে আয়।
বিন্দু মাথা নেড়ে চলে গেল। সেই দিক পানে চেয়ে আছে নাগা জহুরি। বহেরু সুযোগটা ছাড়ল না। বলল—এখানে থাকবে নাকি?
নাগা জহুরি মুখ ফিরিয়ে বলে—থাকবে মানে?
—জমিটমি দেব। ঘর করে দেব। বলে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলে—বিয়েশাদিও করতে পারো, এখানেই। বলে আবছা ইঙ্গিতটা হজম করতে দিল জহুরিকে। বিড়ি ধরিয়ে মিটমিট করে চেয়ে চেয়ে দেখছিল জহুরির মুখে কেমন ভাব খেলা করে।
তা অনেক ভাব খেলল। বিন্দু হারামজাদি জানে বটে রঙ্গরস। একেবারে কাম্নী ডোম। বহেরুর মনটা হে-হে করে হাসছিল। পাণ্ডুয়ার বামনবীরটা আসতে চাইছে না। চিড়িয়াখানাটা জমছে না তেমন। সাঁওতালটাও টেঁসে যাবেই। এ লোকটা যদি থাকতে রাজি হয় তো বেশ হবে। কিন্তু বেশি ঝোলাঝুলি করলে টানের সুতো ছিঁড়ে যায়। তাই প্রস্তাবটা দিয়েই বহেরু কিছুক্ষণ পরে অন্য কথা পাড়ে। লোকটা বাঁ হাতের তেলোয় এক ডেলা শিকড়। সেটা দেখিয়ে বলে—ওটা কী বস্তু?
জহুরি অদূরে উবু হয়ে বসে পড়ে। পরনের ফেরত দেওয়া কাপড়ের কোনাটা তুলে মুখ মুছে নেয়। বলে—এ হচ্ছে বিদ্যাসুন্দর গাছের শিকড়। দুর্লভ বস্তু কিছু নয়। জঙ্গল-পঙ্গলে একটু খুঁজলেই পাওয়া যায়।
—দেখি। বলে হাত বাড়াল বহেরু।
লোকটা নির্দ্বিধায় দিয়ে দিল, বলল—শুঁকে দেখুন।
দেখল বহেরু। ভারী মিষ্টি ধূপের গন্ধের মতো মৃদু গন্ধ।
জহুরি বলে বেশ গন্ধটা না। কিন্তু সাপ ও গন্ধ সইতে পারে না। গন্ধ পেলেই গর্ত থেকে বেরিয়ে পালায়। তখন আমরা ধরি।
—তা হলে এ জিনিস সঙ্গে থাকলে সাপে ঠুকবে না বলো।
জহুরি মাথা নেড়ে বলে—তার ঠিক নেই। কথায় বলে সাপের লেখা বাঘের দেখা। শিকড় ছিটোলে পালায় জানি। তা বলে সঙ্গে রাখলে কামড়াবে না তা নয়। তবে ও বস্তুর আরও গুণ আছে। গায়ে রাখলে বাত, অম্বল আর হাঁপানির বড় উপকার।
বহেরু একটা শ্বাস ফেলে বলে—এ দিয়ে কী হবে! তুমি থাকলে বরং বল ভরসার কথা।
লোকটা উত্তর দিল না। চেয়ে রইল।
সারাদিন কেরামতি দেখাল অনেক। বুড়ো আঙুলের নখে কখনও সিঁদুর কখনও কালি লাগিয়ে নখদর্পণ দেখাল। ফণা তোলা দাঁতাল সাপের মুখের কাছে মুঠো করে হাত এগিয়ে দিয়ে দেখাল সাপটি কেমন মিইয়ে যায়। একটা পয়সাও নিল না। তার স্যাঙাতরা অবশ্য গোটা কুড়ি সাপ ধরে নিয়ে গেল। এইটুকু জায়গায় এত সাপ ছিল কে জানত!
ব্রজগোপাল সবটাই লক্ষ করেছেন। রাতের বেলা বসে সাপ ধরার বৃত্তান্তটা লিখে রাখছিলেন ডায়েরিতে। লিখতে লিখতে একটা শ্বাস পড়ল। কার জন্য লিখছেন? কাকে দিয়ে যাবেন এইসব কুড়িয়ে পাওয়া মণিমুক্তা? ছেলেরা বিজ্ঞানের যুগে বাস করে। এ সব দেখলে হাসবে।
এ সময়ে বহেরু এসে বসল পায়ের কাছে মাটিতে। মুখখানা তুলে দুঃখের স্বরে বলে—জহুরি চলে গেল কর্তা। রাখা গেল না।
ব্রজগোপাল বললেন—হুঁ।
—রাখতে পারলে হত। বুকটা বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগে।
ফের ব্রজগোপাল বলেন—হুঁ।
বহেরু বুক কাঁপিয়ে একটা শ্বাস ছেড়ে বলে—মানুষজন সব যেন দূরে দূরে হেঁটে চলে যাচ্ছে বহেরু গাঁ থেকে। কবে আসবে সব! কাতারে কাতারে!
॥ একচল্লিশ ॥
আকাশে ছমছম করছে মেঘ। গম্ভীর মেঘধ্বনি। ঘন কালো ছায়ায় দুপুরেই ডুবে গেল কলকাতা। যেন বা প্রলয় হবে। ঠান্ডা একটা বাতাস এল, তাতে ভেজা মাটির গন্ধ।
রাস্তা পার হবে বলে রণেন দাঁড়িয়েছিল ফুটপাথে। বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের সরু ফুটপাথ, দাঁড়ানোর পক্ষে সুবিধের নয়। ক্রমান্বয়ে চলমান মানুষ গা ঘেঁষে ধাক্কা দিয়ে চলে যাচ্ছে। রাস্তায় গায়ে গায়ে গাড়ি, ট্রাম, ঠেলা সব দাঁড়িয়ে। জ্যাম। চিনেদের জুতোর দোকান থেকে চামড়ার কটু গন্ধ আসছে। একঝলক হাওয়া রাস্তার ধুলো কুড়িয়ে নিয়ে ছুঁড়ে মারল মুখেচোখে। জীবাণুতে ভরতি কলকাতার বিষাক্ত ধুলো।
রণেন আকাশের দিকে মুখ তুলে দেখল। বাড়ির চূড়ায় চূড়ায় বিঁধে আছে সরু একফালি আকাশ। কিংবা আকাশের গলি। তার মধ্যে মুশ্কো কালো শরীর বাড়িয়ে দিয়েছে প্রলয়ংকর মেঘখানা। রণেন ঘাম মুছল রুমানে। হাতের ভারী ব্যাগটা হাত বদল করল একবার। শরীরটা ভাল নেই। মেঘ করলে মাথার মধ্যে কেমন যেন করে।
