নীল একটা ঝলক চাবুকের মতো খেলে গেল চারধারে। তারপরই কানের কাছ বরাবর সর্বনাশের শব্দ হয়। রণেনের বুকের মধ্যে ধড়ফড় করে হৃৎযন্ত্র নড়ে ওঠে। শরীর অবশ লাগে। ঘাম হয়। প্রেসারটা বেড়েছে। কদিন আগে ডাক্তার ডেকেছিল বীণা। ডাক্তার প্রেসার দেখল, বুক দেখল, পেচ্ছাব পরীক্ষা করাল। কটা দিন বাড়িতে আটকে রেখেছিল বীণা। সে এক অসহ্য যন্ত্রণা। ঘরের মধ্যে আজকাল রণেন থাকতেই পারে না। রাতে যখন সদরদরজা বন্ধ হয়, তখনই রণেন ভারী ভয় পেয়ে যায়। কেবলই মনে হয়, রাতে ঘুমোলে যদি ভূমিকম্প হয় কি, আগুন লাগে, তা হলে বেরোবো কি করে তাড়াতাড়ি? বীণা যখন শোয়ার ঘরের দরজা দেয় রাত্তিরে, তখনও একটা বোবা ভয় তাকে ভালুকের মতো এসে ধরে। ঘরের ভিতর থেকে যেন বা সে আর কোনওদিন বেরোতে পারবে না। ভিতরকার চৌখুপির বাতাস বড় কম। বুক ভরে কবার দম নিলেই তা ফুরিয়ে যায়। তারপর আসবে দমবন্ধ করা এক অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট। মৃত্যু? হ্যাঁ। তাই।
সে ককিয়ে উঠে বলে—দরজা খুলে দাও।
বীণা দাঁতে ঠোঁট চেপে বলে—কেন?
—আমার অস্থির লাগে। দরজা জানালা সব খুলে দাও।
বীণার একটু ঠান্ডার বাই আছে। এই ঘোর গ্রীষ্মেও নাকি শেষ রাত্রে হিম পড়ে। বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগে যদি! বীণার নিজেরও ইসিনোফেলিয়া শতকরা নয়। ভাগ। ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস। বীণা দরজা খুলে দেয়, কিন্তু জানালা সব খুলতে রাজি হয় না। কেবল ড্রেসিং টেবিলের ধারের জানালার একটা পাট খুলে রাখে। বিছানার ধারের জানালা খোলে না। ঘরে সবজে একটা ঘুম-আলো জ্বলে। সেই ঘোর সবুজ রঙের মধ্যে শুয়ে থেকে রণেন সেই এক-পাট খোলা জানালার দিকে চেয়ে থাকে। ওই একটু এক চিলতে ফাঁক—ওইটুকু যেন তার প্রাণ, তার পরমায়ু, তার শ্বাসের বাতাস। রাতে ঘুম হয় না। প্রেসারের বড়ি আর ট্রাংকুলাইজার খায়। তাতে হয়তো প্রেসার কমে, টেনশনও কমতে পারে। কিন্তু শরীরটা বড় দুর্বল লাগে। সারাদিন অবসাদ। মা এসে বুকে হাত বুলিয়ে দেয়, মাথার তালুতে তেল চাপড়ে দেয়। দিতে দিতে চোখের জল ফেলে বলে— আজকাল কচিবয়সেই এ-সব তোদের কী রোগ হয় রে?
কচি বয়স? মায়ের কাছে অবশ্য ছেলের বয়স বাড়ে না। কিন্তু বয়স কথাটা আজকাল বড় ধাক্কা দেয় রণেনকে। তার বোধ হয় আটত্রিশ পেরিয়ে উনচল্লিশ চলছে। আর একটা বছর ত্রিশের কোঠায়। তারপরই চল্লিশ। মধ্যবয়স, প্রৌঢ়ত্ব। সে ধাপটা পেরোলেই বুড়ো। বড় সাংঘাতিক। বয়স যত ঘনায় তত একে একে প্রিয়জন খসে পড়তে থাকে। বাবা যাবে, মা যাবে, বয়স্করা যাবে। একদিন তারও যাওয়ার সময় এসে পড়বে।
কেমন হবে সেই দিনটা? মেঘলা? নাকি রৌদ্রোজ্জ্বল? শীত? না কি গ্রীষ্ণকাল? বর্ষা হবে না তো! দিন, না রাত্রি? ভাবতে ভাবতে বিছানায় উঠে বসে রণেন। খুব কাছে কে যেন বলে ওঠে—সব মরে যাবে। চমকে ওঠে রণেন। কে বলল ও কথা? পরমুহূর্তেই বুঝতে পারে যে, সে নিজেই বলেছে। তার ঠোঁট নড়ে উঠল এইমাত্র। আবার বলল—উঃ, মা গো!
নিজের ঠোঁটে হাত রাখে রণেন। সে এই একা-একা কথা বলাকে বড় ভয় পায়। সন্দেহ করে। কিন্তু ঠেকাতেও পারে না। আজকাল মাঝে মাঝে সে টের পায়, তার ঠোঁট নড়ে, জিব নড়ে, কথা উঠে আসে বুক থেকে। আপনিই চমকে ওঠে রণেন। ঠোঁট চাপা দেয়, নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করে। আর তখনই আবার বলে ওঠে—ক্যাডাভ্যারাস, ক্যাডাভ্যারাস, ইউ…ইউ…ইউ…
কথাগুলোর অর্থ কী! তবু বুক থেকে, মাথা থেকে ওইরকম সব অর্থহীন শব্দ উঠে আসছে আজকাল। কী হয়েছে তার? খুব শক্ত অসুখ? ঘোর সবুজ আবছা আলোয় সে আয়নার দিকে তাকিয়ে মুখ ভ্যাঙচার। হাসে। ওই মৃদু আলোতেও বুঝতে পারে, তার চোখে না ঘুমোনোর ক্লান্তি। একটু ঝুঁকে গেছে মোটা শরীর। ঘুম ভেঙে কখনও বীণা উঠে ধমক দেয়—কি হচ্ছে কি পাগলামি? বিছানায় এস। ঘুমোও।
রণেন বিছানায় যায়। শুয়ে থাকে। ঘুমোয় না। বিড়বিড় করে বলেচছক্যাডাভ্যারাস, ক্যাডাভ্যারাস, ইউ..ইউ…ইউ…
কদিন ঘরবন্দি রেখেছিল বীণা আর মা। এখন আবার বেরোয় রণেন। জোর করেই বেরোয়। শরীর খারাপ বলে আজকাল আর তাকে বাইরে ঘুরতে হয় না। অফিসেরই একটা সেকশনে বসে থাকে চুপচাপ। কিন্তু অফিসের লোকজন আজকাল তাকে বড় বেশি লক্ষ্য করে। হঠাৎ হঠাৎ কথা বলে ওঠে রণেন। সবাই তার দিকে ফিরে তাকায়। এও এক জ্বালাতন। তাই আবার আজকাল বাইরে বেরোয় সে। শরীর খারাপ লাগলেও মনটা একরকম থাকে।
একদিন অফিসে ঘোষের কাছে গিয়ে হাক্লান্ত রণেন বলেছিল—ঘোষদা, একটা কথা বলতে পারেন?
ঘোষ অফিসের ফাইল আজকাল প্রায় ছোঁয় না। ডিসেম্বরে রিটায়ারমেন্ট, কাজ করে হবে কী? বসে বসে পুরনো টেস্ট পেপার থেকে খুঁজে পেতে অঙ্ক কষছিল অফিসের কাগজে। অঙ্কটা কষতে কষতেই বলল কী?
—মানুষ মরার পর কি হয় বলুন তো, আত্মা-টাত্মা বলে কিছু আছে নাকি সত্যিই?
ঘোষ চোখ তুলে তাকে একবার দেখে নিয়ে মিচকে হাসে। বলে—বাঃ। বেড়ে প্রশ্ন। আজকাল এ-সব নিয়ে কেউ ভাবে নাকি আপনার বয়সে?
ঘোষ জানে অনেক। ভারী স্থির বুদ্ধি। তবে কথাবার্তায় সবসময়ে একটু বাঁকাভাব থাকে।
রণেন বলেছিল—বলুন না ঘোষদা।
ঘোষ কাগজপত্র সরিয়ে রেখে চেয়ারে পা তুলে বসল, বলল—মশাই, আপনি যে আছেন, এটা কি সত্যি?
রণেন মাথা নাড়ে—সে তো আছিই।
