তারপর বৃন্দাবনকে ডেকে গাঁজা টেনে আবার পড়ে থেকেছে বহেরু। ঘুম আসেনি। দাদার গায়ে হাত তোলাটা ঠিক হল না। ভাবল। আবার ভাবে, ওই রকমভাবে সেও বেঁচে থাকবে নাকি! পাগল! বয়সে যখন ভাঁটি বুঝবে তখনই পোকামারা বিষ তাড়ির সঙ্গে গুলে খেয়ে রাখবে একদিন। ব্রহ্মময়ী, মরণটা যেন সুন্দর হয়।
কথাটা ছ্যাঁৎ করে নিজেকেই লাগে। মরণ! ও কথাটা এতকাল ভাবার ফুরসত হয়নি তো!
রাতটা ভাল গেল না। হিজিবিজি হয়ে কেটে গেল। সকাল ইস্তক দাওয়া গরম করে উঠে পড়া বহেরু। সাঁওতালটা কদিন ধরে শ্বাস টেনে যাচ্ছে। মরেনি। কমাস ধরেই পড়ে আছে। যাই-যাচ্ছি করে এখনও ঠেকিয়ে রেখেছে অন্তিমকাল। সময় মাপা আছে, সেটা ফুরনোর ওয়াস্তা। ইচ্ছে করলেই তো মরা যায় না। তার ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে বহেরু। বিড়-বিড় করে বলে—বেঁচে থাকো বাপু, টিঁকে থাকো। একটা বেঁটে বক্কেশ্বরকে আনাচ্ছি, দুজনে মিলে বাহার হয়ে ঘুরবে।
আলো ফুটতে না ফুটতেই ছোকরাটাকে দেখা গেল, বহেরুর খামারবাড়ির আশে-পাশে ঘুরঘুর করছে। ঝোপঝাড়ে উঁকিঝুঁকি মারছে, গোয়ালঘরের পেছুতে গিয়ে কি খুঁজছে। কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে ছুটে গেছে, কাচ্চা বাচ্চারাও মুখের এড়ানি, চোখের পিঁচুটি ধোয়ার সময় পায়নি, মজা দেখে জুটে গেছে।
গোয়ালঘরের সামনেটায় এসে দাঁড়িয়েছিল বহেরু, লোকটা সে সময়ে এসে কপালে হাত ঠেকিয়ে একটু সম্মান দেখাল। বলল—এ হচ্ছে নাগভিটে। বাস্তু আমরা ধরি না। অন্য সাপ থাকলে ধরব?
বহেরু লোকটার দিকে চেয়েই বুঝতে পারে, গুণি লোক। তার চোখ চকচক করে। বলে—ধরো। দেখি।
এক গ্লাস জল আর একটা তুলসিপাতা চেয়ে নিল লোকটা। পোঁটলা থেকে একটা এতটুকুন মা কামরূপ কামাখ্যার ছবি বের করে ধরল গ্লাসটার ওপর। রেলগাড়ির মতো মন্ত্র পাঠ করতে লাগল। স্যাঙাতরা সব ঘিরে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ কামাখ্যার ছবির দর্পণে কী দেখে চেঁচিয়ে বলল—গোয়ালের পিছনে, খড়ের গাদায়। যাঃ।
স্যাঙাতদের হাতে একটা শুকনো শিকড়। তারই টুকরো-টাকরা ভেঙে গোয়াল ঘরের চারধারে ছিটোতে থাকে। ছানাপোনারা ভিড় করে সঙ্গে সঙ্গে এগোয়। বহেরু হাঁক ছাড়ে— তফাত যা।
ওদের কজনা গোয়ালের ভিতরে ঢুকে যায়। একজন গোয়ালঘরের পিছন দিকে গিয়ে দাঁড়ায়। ভিতরে খড়ের গাদায় একটা সর-সর শব্দ ওঠে, ফোঁসানি শোনা যায়। গায়ে কাঁটা দেয় বহেরুর। আজকাল বড় একটা ভয়-ভয় ভাব ধরেছে তাকে। গোয়ালে খড়ের গাদায় সাপখোপ, বিছে তো থাকবেই। জানা কথা। না ঘাঁটালে ওরা ওদের মতো থাকে। তবু এখন কেমন ভয় খায় সে। নিত্যি তিরিশ দিন দোবেলা গোয়াল ঘাঁটে সে, যদি কোনওদিন দিত। ঠুকে! ভাবতেই গা হিম।
পিছনের বেড়ায় একটা টিন আলগা লাগানো। বাইরে দাঁড়ানো লোকটা সটান সেই টিনটা টেনে খুলে ফেলল মড়াত করে। সাঁত করে হাত ঢুকিয়ে দিল ফোকর দিয়ে। একটা হ্যাঁচকা টানে হাতটা বের করে আনতেই সবাই দেখে, মাঝারি লম্বা একটা গোখরো। লেজের দিকটা ধরে আছে, মাথাটা শূন্যে ঝুলছে, একটু একটু তোলার চেষ্টা করছে মাত্র। ঝাঁপি নিয়ে একজন এগিয়ে আসে। পাগড়ি বাঁধা লোকটা সাপের গায়ে মন্ত্র পড়ে হাত বুলিয়ে দেয়। সাপটা ঝাঁপিতে পড়ে থাকে।
বহেরুর গা কাঁটা দেয়। মাগো! সাক্ষাৎ যমদূত।
আবার তুলসিপাতা আর জলের ওপর কামরূপ কামাখ্যার ছবি রেখে লোকটা কি যেন দেখতে পায়। দক্ষিণের কলাবাগানের দিকে হাত তুলে বলে—এই মোটা, মস্ত একটা ওখানে রয়েছে। কতগুলো ডাঁড়াশ সাপ আছে, আশে-পাশে, তাড়িয়ে দিস। বড়টাকে ধরবি।
লোকগুলো ঠিক জায়গায় চলে যায়। ঘিরে ধরে শিকড় ছিটিয়ে ছিটিয়ে এগোতে থাকে। বহেরু দেখে, ঠিকই কতগুলো ডাঁড়াশ সাপ পালাচ্ছে। তারপরই ফোঁসানি শোনা যায়। মাটি ফুঁড়ে মাথা তোলা দেয় এক গোক্ষুরো। মা গো! কী তার চেহারা। তেল-পিছল গায়ে বাদামি আলো ঠিকরোচ্ছে। ধাঁই করে বেরিয়ে পালাচ্ছে, বেঁটে মতো কালো একটা লোক লেজটা নিচু হয়ে ধরে তুলে ফেলল। হাত উঁচু করে ধরেছে, তবু মাথাটা মাটি ছুঁই-ছুঁই। বাচ্চাগুলো, মানুষজন সব ঘিরে ধরেছে লোকটাকে। বড্ড কাছাকাছি চলে গেছে। বহেরু হাঁক ছেড়ে সবাইকে সতর্ক করে দেয়—তফাত যা, তফাত যা।
পাগড়ি মাথায় ওস্তাদ ছেলেটা হেসে বলে ভয় নাই, ভয় নাই বাবু, আমি তো আছি। সুনীল নাগা জুহুরি আজ্ঞে, সাতপুরুষের পেশা।
বহেরু ধাতস্থ হয়ে তাকে ডেকে দাওয়ায় বসাল। বিড়ি দিলে লোকটা হাত তুলে বলল— এখন নয়।
—সাপ খেলাও নাকি? বহেরু জিজ্ঞেস করে।
লোকটা মাথা নেড়ে বলে—না। চাষবাস, আছে। এ পৈতৃক পেশা। বছরে এক-দুবার বেরোই। আসাম পর্যন্ত চলে যাই আমরা সাপ ধরতে। খেলাই না।
—ধরে করো কী?
—বেচে দিই। সরকার কেনে। এক ভরি বিষ তিনশো আশি টাকা। যোলোটা সাপে এক ভরি হয়।
লোকটার বয়স ভারী কম বলে মনে হয়। গোঁফদাড়ি এখনও ওঠেনি তেমন। লাউয়ের গায়ের রোঁয়ার মতো নরম কিছু রোঁয়া উঠেছে গালে। গোঁফের কাছে আবছা রেখা দেখা যায়। সেখানে ঘাম জমেছে। মুখের ডৌলটুকু বড় মিঠে। বহেরু তার কাছ ঘেঁষে বসে, বলে—বাড়ি কোথা?
—বহরমপুর। এই বলে লোকটা উঠে যায়। তার স্যাঙাতরা চারধারে ঘুরছে। এখান-সেখান থেকে মাটি খুঁটে হাতে নিয়ে শুঁকছে। সতর্ক চোখ।
বহেরু উঠে গিয়ে নাগা জহুরির সঙ্গ ধরল, বলল—শোঁকো কী?
