সুমুন্দির পো। নিল না। ফিরে বিয়ে করেছে, নেওয়ার জো-ও নেই। তবু নয়নতারা যে কাঁদে তা বোধ হয় সেই লোকটার কথা ভেবেই। যৌবন বয়সে অনেক ছটফটানি ছিল। এখন সে সব মরে টান এসেছে বুঝি। রাতে ঘুম ভেঙে সেই কান্নার গোঙানি মাঝেমধ্যে শোনে বহেরু। দুঃখ বড় একটা হয় না, কেবল নিশুতরাতে ওই কান্না শুনে কেমন একটা ধন্ধভরা ভয় লাগে।
কদিন হল আর একা শোয় না সে। দোকা লাগে। কিন্তু দোকা পাওয়াই মুশকিল। বড় বড় ছেলেপুলে নাতিপুতি নিয়ে শোয়, বয়সের মানুষ, তার কথা ওঠে না। বিন্দুর মাও লজ্জা পায় বোধ হয়। রাজি হয় না। লোকলজ্জা বলে কথা আছে। ব্রজ বামুন থাকেন গাঁয়ে। বলবেন। কী! অগত্যা বড় ছেলে কপিল বাপের কাছে-পিঠে বিছানা ফেলে শোয়। এরা বাবু মানুষ। গদি ছাড়া ঘুম হয় না। তোষক বালিশ কত কী লাগে, বউ এসে মশারি গুঁজে দিয়ে যায়। তার ওপর রাতবিরেতে উঠে উঁকি মেরে দেখো, বাবু হাওয়া। কখন গিয়ে বউয়ের পাশবালিশ হয়ে পড়ে আছে। এখন এই দোকা পাওয়াটাই একটা সমস্যা। নিশুত রাতটা বড় নটখটে জিনিস। চাষার দুর্বল মাথায় কত আকাশ-পাতাল ঢুকিয়ে দেয়! হাঁক পাড়লে বৃন্দাবন আসে ঠিকই, কিন্তু সে তো ওই রকম বিটকেল মানুষ। রসকষ নেই। তা ছাড়া আপনজনা কেউ তো নয়। দূরের মানুষ দূর হয়ে বসে থাকে। বহেরুর বড় দোকা হতে ইচ্ছে করে আজকাল। মাঝলা ছেলে কোকাকে বললে সে এসে শোয়। কিন্তু বড় ভয় বহেরুর গায়ে খুনের রক্ত, বাপকেও ভাল চোখে দেখে না। টুঁটি টিপে ধরে যদি ঘুমের মধ্যে। যদি কৈফিয়ত চায়?
রাতে উঠে তাই আজকাল বহেরু ছমছম করা চারধারের মধ্যে বসে বসে ভাবে। কাল রাতেও ভাবছিল, দোকা ছাড়া পৃথিবীতে বাঁচা যায় না। এই যে এত জমি-জোত, ধান-পান, কার জন্য! দশভূতে খাচ্ছে। সে খাক, একা খাওয়ারও তো মানে হয় না, সে খাওয়ার আনন্দ নেই। কিন্তু কেবলই মনে হয়, একজন বুকের কাছের আপনজন হলে তার জন্য সব-কিছুর একটা আলাদা আনন্দ থাকত। কত ফিসফিসানো কথা জমে আছে বুকের মধ্যে! বলত। সে থাকলে এই রাতের ভয় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারত। কিন্তু সে মনিষ্যিটা কে! মেয়েমানুষ কোনও? নাকি ছেলেপুলে? নাকি নাতিপুতি? কে? কার জন্য এত সব করেও কিছুই নেই বলে তিন প্রহর রাতে উঠে বসে থাকে বহেরু? বুকের ফাঁকা জায়গা থেকে শ্বাসবায়ু বেরিয়ে এলে মনে হয় ফের বুঝি বাতাস টানতে পারবে না। গেল দম ফুরিয়ে কলের পুতুলের। নয়নতারার ঘাড়ে ভর করে মেঘু যে শাপশাপান্ত করেছিল তা কি ফলে গেল নাকি! এত ফাঁকা ফাঁকা তো লাগত না কখনও!
পাঁচ রবিবারে এবারের বোশেখ মাস গেছে। ঝড়া কিংবা খরায় যাবে। ঝড়ার লক্ষণ নেই। খরায় ধরেছে বছরকে। সে সবও ভাবে বহেরু। জোত-জমি ধান-পান, গরু-ছাগল ছেলে-পুলে, বউ-নাতি। সব ভেবেও একটা জায়গায় এসে থেমে যায়। জীবনের একটু বৃত্তান্ত জানা হল না। কার জন্য? কে সেই আপনজনা!
কাল রাতে ঘুমটা এসেছিল সময়মতো। একটু আফিং দিয়েছিল বৃন্দাবন। সেইটে খাওয়াতে ঠিক যেমন চেনা লোক মজা করতে পিছন থেকে থেকে চোখ টিপে ধরে, বিন্দুর মায়ের সঙ্গে যখন দেওর-বউঠান সম্পর্ক ছিল তখন বিন্দুর মাও এসে ও-রকম ধরত পিছন থেকে, ঠিক তেমনি ঘুমটা এসে পিছন থেকে চোখ টিপে ধরল। মাইরি-ঘুম একেবারে। সেই সময়ে একঝাঁক শিয়াল চেঁচিয়ে উঠেছিল, আর সেই সঙ্গে গন্ধ বিশ্বেস। কোথাও কিছু না, ‘চোর, চোর বলে চেঁচাল খানিক। লাঠি ঠুকে ঠুকে কেসে বুকের গয়ের তুলে ফেলল ঘরের মেঝেয়। পেচ্ছাপের হাঁড়ি ওলটাল একটু বাদে। বেড়াল কুকুরদের শ্রাদ্ধ করতে লাগল। হাঁড়িটা যে বেড়ালে উলটিয়েছে সেটা প্রমাণ করার জন্যই বোধ হয় লাঠি দিয়ে ঘা-কতক বসাল ওদিকে। বেড়ালে, কুকুরে, গন্ধ বিশ্বেসে সে এক তুলকালাম কাণ্ড। বেড়ালরাই বা ছাড়বে কেন, কার লেজ মাড়িয়েছে, সেও ফ্যাঁস করে দিয়েছে আঁচড়ে, মাঝরাতে গন্ধর তখন হাপুস নয়নে কান্না। বহেরু তখন উঠে গিয়ে ইঞ্জিনের মতো ফুঁসতে ফুঁসতে গন্ধর ঘরের ঝাঁপের দড়ি খুলে ঢুকেছে। গন্ধ চোখে দেখে না বলে হারিকেনের রেওয়াজ নেই। অন্ধকারে মাটির ভিটেয় তরল পদার্থ গড়িয়ে পিছল, তার মধ্যে পা হড়কাল বহেরুর। দাঁতে দাঁত কড়মড় করে বহেরু গিয়ে গন্ধ বিশ্বেসকে টেনে তুলল মেঝে থেকে। বসাতে যাচ্ছিল ঘা কতক। প্রথম থাবড়াটা মেরেই খেয়াল গেল, আরে, এ লোকটাও যে একা! সারাদিন খাই-খাই করে, হাগে-মোতে, কাঁদে, যাই করে, সেও তো দোকা নয় বলেই। গন্ধ তখন ভয়ে কাঁপছে, আর ধরা গলায় বলে—আমি কিছু জানি না বাবা, আমি কিছু জানি না বাবা…
বুড়ো বয়সে বাপ ভাইয়ের তফাত গুলিয়ে ফেলেছে ভয়ে। গন্ধকে তাই মায়াবশে ছেড়ে দিল বহেরু। বেড়ালগুলোকে অন্ধকারেই সাঁত সাঁত করে কয়েকটা লাথি কষাল। বড় রাগ। চারধারে পৃথিবীটার ওপরেই বড় রাগ তখন বহেরুর। দুর্গন্ধের চোটে গন্ধর ঘরে টেকা যায় না, তবু অন্ধকারে খানিক দাঁড়াল বহেরু। গন্ধর বুড়ো হাতটা এসে তার হাত ধরল। নাকের জলে চোখের জলে ফঁত ফঁত শব্দ করতে করতে গন্ধ বলে—তুমি মা-বাপ বাবা, মেরো না গো। কাঁকালের হাড়টায় মটাং করে বড় লেগেছে।
বহেরু হাতটা ধরে বিছানায় তুলে দিল। বলল—ফের চেঁচাবে না। পড়ে থাকো মটকা মেরে।
