ছাতাটা একটু মাটিতে ঠুকল বহেরু। গলাখাঁকারি দিল। আলোটা তুলে কল ঘুরিয়ে তেজি-কমী করল। ব্রজগোপাল ফিরে তাকালেন একটু। মুখের কাছে আলোটা তুলেছে তাই মুখটা দেখতে পেলেন। আর কিছু নয়, কেবল মুখে একটা আলগা বুড়োটে ছাপ পড়েছে। ব্রজগোপাল একটু চিন্তিতভাবে হাঁটেন। অনেকক্ষণ বাদে হঠাৎ একটু ফুর্তির সুরে বলেন— দূর ব্যাটা! দলমাদল কামান দাগায়ে দে, সব ভয়ভীতি খসে পড়বে।
বহেরু পিছন থেকে তাড়াতাড়ি দু-কদম এগিয়ে আসে—কী বলেন কর্তা?
—কী কী! জয়গুরু জগন্নাথ। তুই ছিলি কাজের কাজি, এখন হয়েছিস ভাবন কাজি। এত ভাবিস ক্যান? চাষাভুষো মানুষকে কি ভাবনাচিন্তা সয়? মনের মুখে নাড়া জ্বেলে দে। দুনিয়া কি তোর? এত ভাবনা কেন?
তত্ত্বকথার গন্ধ পেয়ে বহেরু কান খাড়া করে। ব্রজগোপালের ঘাড়ে শ্বাস ফেলে পিছু পিছু হাঁটে গৃহপালিতের মতো। বলে—ঠাকুর থাকবেন তত আমার কাছে? ছাড়ে যাবেন না তো!
দূর ব্যাটা।
বহেরু একটা শ্বাস ফেলে। বিড়বিড় করে বলে—ঠাকুর, থাকেন। থাকেন।
৪০. মাথায় ধপধপে সাদা পাগড়ি
॥ চল্লিশ ॥
মাথায় ধপধপে সাদা পাগড়ি বাঁধা, ছোটখাটো কালো-কোলো, গোপাল-গোপাল চেহারার একটি বছর তেইশ-চব্বিশের ছোকরা সেদিন সকালে এ গাঁয়ের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছিল। সঙ্গে পাঁচ-সাতজন লোক। সঙ্গীরা সব বয়সে বড়, কিন্তু হাবভাবে বোঝা যাচ্ছিল ওই ছোকরাই ওদের সর্দার, সঙ্গে সাপের ঝাঁপি।
রাতটা ভাল কাটেনি বহেরুর। গন্ধ বিশ্বেস এখনও বেঁচে আছে; আশি কি নব্বুই পার হয়ে গেল বুঝি। এই সব বয়সে সে মানুষ বড় জ্বালাতন করে। বোধ-বুদ্ধি সব জল হয়ে যায়। গন্ধ বিশ্বেস তার ওপর আবার চোখে দেখে না। দিনরাত লোকজনকে হাঁকডাক পাড়ে। সবচেয়ে বেশি জ্বালায় খাওয়া আর হাগা-মোতা নিয়ে। তার ওপর আছে মিথ্যে কথা। খেয়ে বলে খাইনি। বিছানায় হেগে-মুতে ফেললে বেড়াল কুকুরের ঘাড়ে দোষ চাপায়। নিপাট ভালমানুষের মতো এইসব করে। কাছেপিঠে ছেলেপুলেদের হাতে মোয়াটা নাড়ুটা আছে টের পেলে কেড়ে খেয়ে ফেলে। অশ্রাব্য গালাগাল দেয় আজকাল রেগে গেলে। ভয় পায় বহেরুকে।
বহেরু আজকাল কেমন চুপসে গেছে। এই গরমকালটায় উঠোনে কি দাওয়ায় তাড়ির ওপর এক ছিলিম গাঁজা চড়িয়ে গামছার ওপর পড়ে থাকত। বড়জোর একটা খাটিয়ায় একটু শক্ত একটা বালিশ। তাতেই খুব বড়মানুষি। খুবই অথৈ ঘুম তার। তবু একটু-আধটু শব্দ হলেই কুকুরের মতো উঠে বসে। নেশা-টেশা ঘুম-টুম কোথায় কেটে যায়। হাঁক ছেড়ে বৃন্দাবনকে ডাকে। বৃন্দাবন এক সময়ে দোস্তো-মানুষ ছিল বহেরুর। জাতে নমঃশূদ্র। এখন সে বহেরুকে মনিব বলে মানে। বহেরু গাঁ রাত-বিরেতে পাহারা দেয়। হাঁক ছাড়তেই দুটো চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই এসে যায় বৃন্দাবন। গহীন রাতে আর চাকর-মনিবের সম্পর্ক থাকে না বটে, তবু লাঠি-গাছটা আর লালটেম নামিয়ে রেখে একটু দূরে বসে সে। গাঁজা সাজে। প্রথমটায় বহেরু টানে, পরে বৃন্দাবন। বিষয়ী কথাবার্তা হয় দু-চারটে। বন্দাবন কম কথার মানুষ। এই রাতবিরেতেই যা তার পেট থেকে কিছু কথা বেরোয়। বহেরুর গোটা দুই খুনের সে জলজ্যান্ত সাক্ষী আছে। কিন্তু ‘রা’ কাড়ে না কখনও। এমনকী কখনও বহেরুর চোখে চোখও রাখে না। ওই এক ধারার মানুষ। বিশ্বাসী, কর্মঠ, কিন্তু একটু আবছামতো। দুনিয়ায় সে কী জন্য আছে, কী তার ভবিষ্যৎ, কার জন্য করছে কম্মাচ্ছে তা বোঝাই যায় না। মুখে টিকিট আঁটা আছে। সারাদিন তার দেখা পায় না বহেরু। শুধু এই রাতে দু-একবার। দু-একবারই ওঠে বহেরু। আবার ঘুমোয়। ভোরবেলা, আলো ফোটার অনেক আগে প্রথম জাগে খুড়োমশাইয়ের পবিত্র খোল। কালীপদর প্রভাতী শোনা যায়—জাইগতে হবে, উইঠতে হবে, লাইগতে হবে কাজে…। পেছুতে তিনটে লাথি কষাতে হয় জামাই শালার। কোনওকালে বহেরুর কোনও কম্মে লাগেনি। মাগ-ছেলের টানে পড়ে আছে। তিনটে লাথি ওর বহুকাল ধরে পাওনা হয়ে আছে, দিনক্ষণ দেখে একদিন সেই তিনটে ঝাড়বে বহেরু, বিদেয় করে দেবে বহেরু গাঁ থেকে। কালীপদর পর বা আগে ওঠেন ব্রজকর্তা। ততক্ষণে ভোরের জানান পড়ে যায়।
এইরকমই ছিল নিয়ম। কিন্তু বহেরুর ঘুমটাকে পেঁচোয় পেয়েছে আজকাল। তাড়ি-গাঁজার চাপান সত্ত্বেও পয়লা প্রহরটায় শেয়ালের হুড়ড়া শুনে কাটে। তারপর ঝিমুনি আসে। কিন্তু সে কতক্ষণ? হঠাৎ যেন বুকের মধ্যে ধড়াধ্বড় ধাক্কা খেয়ে উঠে বসে। চারদিকে কোনও রাতে জ্যোৎস্নার দুধ চলকে ভেসে যায়। কোনও রাতে বা শ্যামা মায়ের এলোকেশ। বহেরু সেই নিশুত রাতের মধ্যে জেগে উঠেই কেমন একা-বোকা বোধ করে। ভয় হয় হঠাৎ সব মরেটরে গেল নাকি! এত নিঝুম কেন চারদিক! নাকি আমিই মরে এলাম পরকালের রাজ্যে! হাঁক পাড়লে বৃন্দাবন আসে ঠিকই, গাঁজার চাপানও হয়। কিন্তু গা বড় ছমছম করে আজকাল, গুণীন এসে খুব কষে ঝাঁটাপেটা করে গেছে নয়নতারার ভূতকে। আজকাল নয়ন খুব নিঃসাড়ে পড়ে থাকে সারাদিন। কথাবার্তা কয় না, খেতে চায় না, উঠতে চায় না, চুল বাঁধে না। মেঘুর ভূত যদি ছেড়েও থাকে তবু অন্য কোন্ ভূত আবার চেপে বসেছে কে জানে! ছলছলে চোখে চেয়ে থাকে, কাঁদে মাঝে মাঝে। বিপদ বুঝে জামাইয়ের সন্ধানে একদিন গিয়েছিল বহেরু। আগের দিনে পেয়াদারা বাবু হত না কোনওদিন। আজকাল হয়। বিষড়ের এক কেমিক্যাল কোম্পানিতে লোকটা পিওন ছিল, এখন কেরানি। কী ভেবে সে শ্বশুরকে তুমি-তুমি করে বলতে লাগল। মেয়েকে ফিরে নেওয়ার কথা বলতেই খুব রাগ, বলে—ওকে ঠান্ডা করা আমার কর্ম নয় বাপু। তোমাদের ঘরের ধাত আলাদা। আমাদের সঙ্গে মেলে না।
