—হুঁ, তুই কখন থেকে বসে আছিস?
—অনেকক্ষণ। তখন বেলা ছিল।
বহেরু উঠে দাঁড়ায়। বলে—আজকাল আপনি না থাকলি ভাল লাগে না।
ব্রজগোপাল চুপ করে থাকেন। একটু কষ্ট হয়। বহেরুটা এবার বুড়ো হল এই সত্তর বাহাত্তর বছর বয়সে। বলেন—তা তুই কেন বসে আছিস দুপুর থেকে, আমার তো রাতেই ফেরার কথা, তখন না হয় কালীপদ বা কোকা আসতে পারত!
—তাদের বড় গরজ! বামুনকর্তার মহিমা তারা কী বুঝবে!
—তা না হয় আমি একাই যেতাম। অভ্যেস তো আছে। দুপুর-দুপুর এসে বসে আছিস, বাদলায় ভিজেছিস নাকি!
স্টেশনের বেড়া পার হয়ে রাস্তায় পড়ে বহেরু ডান ধার বাঁ ধার তাকিয়ে দেখে নিয়ে বলে—না। স্টেশনের ঘরে গিয়ে বসলাম তখন। বাদলা তেমন হয়ওনি। ছিটে-ফোঁটা। হারিকেনটা তুলে একবার দেখল বহেরু। আগুনটা দাপাচ্ছে। বলল—এটা নিবে গেলেই চিত্তির।
—টর্চ তো ছিল।
—সে কোন বাবু নিয়ে বেরিয়েছে কী হারিয়ে এসেছে কে তার খোঁজ রাখে। রাবণের গুষ্টি। বলে বহেরু খুব বিরক্তির গলায় বলে—বেরুনোর সময়ে খুঁজে পেলাম না। আপনারও তো একটা ছিল।
ব্রজগোপাল থেমে ক্যাম্বিসের ব্যাগ হাতড়ে ছোট্ট টর্চবাতি বের করে দেখেন বোতাম টিপতে একটা অত্যন্ত মলিন লাল আলো ধীরে জ্বলে উঠল। ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বলেন—এটারও ব্যাটারি ফুরিয়েছে। আজ আনব বলে ঠিক করেছিলাম, তাড়াহুড়োয় ভুলে গেলাম।
—নলিনীর দোকানে পাওয়া যায়।
—দূর! ও ব্যাটা চোর। তিন আনার জিনিস আট আনা হাঁকে। কলকাতায় কিছু সস্তা হয়। গায়ে গায়ে সব দোকান গজিয়েছে, রেষারেষি করে বিক্রি করে। তাই সস্তা।
বহেরু বুঝদারের মতো মাথা নাড়ল। বলল—ভারী শহর। বহুকাল যাই না। বহেরু একটু থেমে গিয়ে ব্রজগোপালের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বলে—আপনি একটু আগু হোন। আলো পেছনে থাকলিই ভাল।
ব্রজগোপাল এগোন। বহেরু পিছনে বোধ হয় ফস করে বিড়ি ধরাল। অলোতে সামনে ছায়াটা লম্বা হয়ে দিগন্তের অন্ধকারে মিশে গেছে। ব্রজগোপাল ঠাহর করে হাঁটেন। বহেরু বলে—সেই দুপুর থেকে বসে বসে মাছি মশা তাড়াচ্ছি। কত ট্রেন গেল।
ব্রজগোপাল শুধু বিরক্তিসূচকভাবে বললেন—হুঁ।
—বাসায় বসে দিন কাটে না।
—তোর তো কত কাজ। ব্রজগোপাল বলেন।
একঝলক বিড়ির গন্ধ আসে পিছনে থেকে। বহেরু নিরাসক্ত গলায় বলে—করতে গেলে কাজ ফুরোয় না, সে ঠিক। কিন্তু এখন মনে করি, আর কাজ কী কাজে! কাজ করে মেলা কাজি হয়েছি। সংসার বেশি দেখতে গেলে কাজিয়া লেগে যায়। ছেলেগুলো সব হারামি, জানেন তো।
ব্রজগোপাল একটু ভেবেচিন্তে বলেন—তোরই রক্তের ধাত তো। পাজি তুই কি কিছু কম ছিলি?
বহেরু একটু হাসল। বলল—বুড়োও তো হলাম।
—বুড়ো মনে করলেই বুড়ো। মনে যদি বয়স না ধরিস তো বুড়ো আবার কী! বুড়োটে ভাবটাই ভাল না।
বহেরু একটু চুপ করে থাকে। বলে—এক পাঞ্জাবি জ্যোতিষকে ধরে এনেছিলাম পরশুদিন। বললাম থাকার জায়গা দেবো, ভাতকাপড়ের ব্যবস্থা করব, থাকো। রাজি হল না। তা সে হাতটাত দেখে বলল, আমার কপাল নাকি খুব ভাল। তীর্থে মরব।
ব্রজগোপাল মরার কথা সহ্য করতে পারেন না। একটু এঁটেল মতো পিছল জায়গা পার। হচ্ছিলেন সাবধানে। একটু ঝাঁকি মেরে বললেন—তীর্তে মরলে কি আর দুটো করে হাত পা গজাবে নাকি! যত ইল্লুতে কথা! বেঁচে থেকে কী কী করতে পারবি তাই ভাব।
—আর কী করব! আপনি কথা কবেন, পায়ের কাছে বসে শুনব। পাপ তাপ কেটে যাবে। কত কুকর্ম করেছি।
—কর্মের পাপ কর্ম দিয়ে কাটাতে হয়। তত্ত্ব শুনলে কাটে না।
—আপনার কেবল ওই কথা। কাজ তো অনেক হল।
—তবে কি তোর পছন্দমতো কথা বলতে হবে নাকি! কাজকে তোর এত ভয় কীসের?
বহেরু একটু চুপ করে থাকে। বিড়ির ধোঁয়া বুকে চেপে রাখতে গিয়ে দু-দমক কাশি আসে। বলে কাজকে ভয় নেই। ছেলেগুলো বড় ব্যাদড়া। সামলাতে পারি না। এই সেদিনও রক্তের দলা ছিল সব, এখন ডাকাত হয়ে উঠেছে।
—হলই বা। বিশ্বসংসারের কাজ বলতে কী কেবল নিজেব সংসারের কলকাঠি নাড়া? অন্য কিছু নেই?
—কিছুতেই মন লাগে না। মেধু ডাক্তারের ভূত নয়নতারাকে ভর করে রাতবিরেতে কত কথা বলে?
—কী বলে? ব্রজগোপাল ধমক দিয়ে বলেন।
পুরনো একটা সাঁকো পার হয়ে ব্রজগোপাল বড় রাস্তা ছেড়ে আল ধরার জন্য নেমে পড়লেন। বহেরু রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল, লণ্ঠনটা উঁচু করে ধরে বলল—দুর্যোগে ফুলতলার রাস্তা দিয়ে যাবেন নাকি!
—ভারী তো দুর্যোগ! ক’ফোঁটা বৃষ্টি হয়েছে, সেইজন্য আধ মাইল ঘুরপথে যাব নাকি!
বহেরু ইতস্তত করে বলে—রাস্তাটা ভাল নয়। রাম রাম।
ব্রজগোপালের মায়া হল। বহেরুর কোনওকালে ভয়ডর বলে বস্তু ছিল না। এখন কেমন কোলঘেঁষা ছেলের মতো ভয় পায়। ব্রজগোপাল নীচে থেকে রাস্তার ওপর ওর বিশাল ছায়াটা দেখলেন। হারিকেনের খুব নিবন্ত আলোয় চোখমুখ অসুরের মতো দেখায়। এখন লোকে ওকে দেখলে ভয় খেয়ে যাবে। কিন্তু আদতে বহেরু ডাকাতের নিজের প্রাণেই এখন নানা ভয়ভীতির বাসা। ব্রজগোপাল বললেন—ভয়টা কীসের? বলে আবার রাস্তায় উঠে এলেন, যেখানে জেদি কুকুরের মতো পা জড়িয়ে আছে বহেরু। এখন ওকে টেনেও নেওয়া যাবে না।
আবার আগে আগে হাঁটেন ব্রজগোপাল, পিছনে বহেরু। বহেরু পিছনে গলা খাঁকারি দেয়। বলে—ঘরে বসেই সব শুনতে পাই। রাতবিরেতে নয়নতারা কাঁদে। ঘুমোয় না মেয়েটা। কেবল বোনাসুরে বলে-রক্ত বৃষ্টি হবে, মাটির তলায় বসে যাবে গ্রামগঞ্জ। আর আমার নাম ধরে ডেকে বলে—তুই মরবি শেয়াল কুকুরের মতো, ধাঙড়ে পায়ে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে ফেলে দিয়ে আসবে ভাগাড়ে। গতিমুক্তি হবে না, অন্ধকারে হাতড়ে মরবি চিরকাল, জন্ম হবে না। এই সব বলে।
