চ্যাংড়াদের একজন বলে—জায়গাটা যে ছেড়ে দিলাম দাদু, তার বদলে কী দেবেন?
—কী দেব বাবা, বুড়ো মানুষ আমরা, পরের ভরসায় রাস্তায় বেরোই। তোমরা জায়গা ছাড়বে না তো কে ছাড়বে! ইয়ং ম্যান সব, স্পিরিটেড।
—ওসব গ্যাস ছাড়ুন। বর্ধমানে কিন্তু মিহিদানা খাওয়াতে হবে।
—আর মিহিদানা! সে বস্তু কী আর আছে। এখন কেবল বেসম আর চিনির রস। ও আমরা খাই না। আবার লেবু মুখে দিয়ে কোয়ার ফ্যাঁকড়া মুখ থেকে টেনে বের করতে করতে বলেন—তোমাদের বয়সে বুড়ো মানুষ আর মেয়েছেলে দেখলেই আমরা জায়গা ছেড়ে দিতুম।
—আমরাও তো দিলাম। আর একজন চ্যাংড়া বলে—আরও কিছু করতে হবে নাকি বলুন না। আর খুব পরোপকারী। বয়সের নাতনি-টাতনি থাকলে বলুন, দায় উদ্ধার করে দেব।
লোকটা খুব ঘোড়েল। একটুও ঘাবড়ায় না। হাতের আধখানা লেবু গিন্নির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে—ধরো! গিন্নি মুখটা ফিরিয়ে নেন, হাতের একটা ঝাপটা দিয়ে সরিয়ে দেন হাত। বুড়ো লেবুটা ফিরিয়ে নিয়ে বলে—না ভাই, নাতনি-টাতনি নেই। দুই ছেলে। ছোটটির জন্যই, মেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম কলকাতায়।
একজন সঙ্গে সঙ্গে বলে—পছন্দ হল?
—না বাবা। বড্ড রোগা। মুখখানা আছে একরকম, কিন্তু হাওয়ায় হেলেপড়া চেহারা। ও আমার পছন্দ নয়।
—তা ওখানে খ্যাঁটটা কেমন হল দাদু?
বুড়ো হাসে। মাথা নেড়ে বলে—খাইয়েছে ভাল। এই দুর্দিনে বেশ বড় বড় রাজভোগ পায়েস, ফলটল।
—বছরে কবার মেয়ে দেখেন দাদু? দু-তিনবার করে হলে তো বেশ ভালই ম্যানেজ হয়, কী বলেন? আচ্ছা ম্যানেজার বাবা!
অন্য একটা চ্যাংড়া বলে—বুড়ো ভাম।
বুড়ো সবই শোনে। একটু হাসিমুখে লেবু খায়, আর বলে—তা ছেলের বিয়ে দিতে হলে মেয়ে তো দেখতেই হবে।
—হুঁ! ওদের চোখকে বিশ্বাস কী? বয়সের ছেলে, কটা চামড়া কী ভাসা ভাসা চোখ, কী একটু পাতলা হাসি দেখে মাথা ঘুরে যাবে। আমাদের চোখ অন্যরকম।
—দুরকম চোখ দাদু? ছুঁচে সুতো পরাতে পারেন?
বুড়ো হঠাৎ সোজা হয়ে বসে বলে—চোখ দুখানা এখনও আছে, বুঝলে! ঘরে লক্ষ্মীনারায়ণের সেবা হয়। রোজ সকালে নিজের হাতে মালা গেঁথে পরাই। লক্ষ্মীনারায়ণকে বলে রেখেছি, যেদিন চোখের দোষ হবে সেদিন থেকেই মালা বন্ধ।
বলে ঘোড়েল মানুষটা মাথা নেড়ে হেসে বলে—বুঝলে তো! চোখে আজ তাই পষ্ট দেখি। লক্ষ্মীনারায়ণের প্রাণে ভয় আছে না, মালা বন্ধ হয়ে যাবে যে!
ব্রজগোপাল মুখটা ফিরিয়ে নেন। পশ্চিমা লোকটা সীতারামের নাম পড়ে যাচ্ছে নীরবে। জপ করছে। অন্তরের গভীরতম প্রার্থনা সংসার থেকে সুতো বেয়ে চলে যাচ্ছে কী তাঁর কাছে! ব্রজগোপাল চোখ বুজে একটা গভীর শ্বাস ফেলেন। রণেনের কথা কেন যে এতবার মনে হচ্ছে! ভাবতে ভাবতে একটু শিউরে ওঠেন বুঝি! ছেলেটা শীলার বাসায় বসে একা-একা কথা বলছিল। সংসারে বোধ হয় ন্যাজে-গোবরে হচ্ছে একটু অল্প বুদ্ধির ছেলেটা। ছেলেবেলায় টাইফয়েডের পর মাথার দোষ হয়েছিল। মাথাটা কমজোরি। তেমন ভাবনা-চিন্তার চাপ পড়লে কী হয় না হয়। সংসারের আত্মীয়রা বড় স্বার্থপর, মন বুঝে, অবস্থা বুঝে চলে না। রণেনের মনে ব্যথা দিয়ে কারও কিছু করা উচিত নয়। কিন্তু সে কি ওর বউ বোঝে! না কি ননীবালাই বোঝেন? না কি বাচ্চাকাচ্চা বা ভাই-ই বোঝে! সংসার এত মন বুঝে চললে তো স্বর্গ হয়ে যেত। রণেনের জন্য ব্রজগোপালের মনটা তাই ভাল লাগে না। ওকে বোধ হয় সবাই অতিষ্ঠ করে, অপমান করে। কিছুকাল আগে একবার দৌড়ে গিয়েছিল গোবিন্দপুরে। স্টেশনে দেখা হতে বলেছিল—সংসারে যত অশান্তি। আজকেও একবার ট্যাক্সিতে হঠাৎ ‘বাবা’ বলে ডেকেছিল, কিন্তু কিছু বলেনি। কিছু যেন বলার ছিল। লজ্জায় পারেনি।
ব্রজগোপাল চোখ বুজে চাপ ধরা বুকের ভারটা আর একটা দীর্ঘশ্বাসে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। মনের মধ্যে বলে রাখলেন—সব ভাল রেখো। ওদের সুখে রেখো।
সংসারে ওই যে লেবু খাচ্ছে ঘোড়েল লোকটা, মান অপমান জ্ঞান কিছু কম, লোভী ওই সব মানুষেরা একরকম সুখেই আছে। ঠাকুরদেবতার সঙ্গে পর্যন্ত চুক্তি করে কাজ করে। ব্রজগোপাল আবার একটা শ্বাস ছাড়লেন। পাশের লোকটা আপনমনে সীতারামের নাম পড়ে যাচ্ছে। ওটা বুঝি বুড়ো বামুনেরই ইঙ্গিত। ব্রজগোপাল ছিঁড়ে-যাওয়া জপের সুতোটা আবার চেপে ধরলেন। জপ চলতে থাকল।
স্টেশনে যখন নামলেন তখন বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। এদিকে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। প্ল্যাটফর্মের মোরম ভেজা। বাতাসে ভেজা মাটির আঁশটে গন্ধ। গাছপালার হাওয়া-বাতাসের পাগল শব্দ। আকাশে হালকা মেঘ রেলগাড়ির মতো চলে যাচ্ছে, অন্ধকারেও বোঝা যায়। প্ল্যাটফর্মে নেমে দাঁড়াতেই ওই বাতাস, ওই গাছ-মাটির গন্ধ, পৃথিবী-জোড়া অন্ধকার ব্রজগোপালের মন থেকে ধুলোবালি ঝরিয়ে দিল। মনখারাপটা ভুল পড়ল একটু।
প্ল্যাটফর্মের গাছতলায় কাঠের বেঞ্চ-এ একজন লোক গা মাথা একটা গামছায় ঢেকে বসে আছে। বেঞ্চের নীচে, পায়ের কাছে হারিকেন। আলোটা বাতাসে দাপাচ্ছে। নিববে। লোকটার পাশে রাখা একটা ছাতা, খোলেনি, প্রকাণ্ড অন্ধকার চেহারাটা দেখেই চিনতে পারেন ব্রজগোপাল।
একটু এগিয়ে গিয়ে বলেন—বহেরু।
লোকটা নড়েচড়ে উঠে বসে, বলে—আলেন?
—হুঁ।
—ভয় লাগতে ছিল, ভাবলাম বুঝি আজ আর আলেন না। ঠাকরোন আর ছানা-পোনারা সব ভাল?
