ননীবালা চেক হাতে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। চোখে জল। বুকে বৃষ্টিপাত। নাতিটা অন্যধারে বসে চিড়ের মোয়া খায় টুক-টুক করে। ননীবালার মনটা উদাস হয়ে যায়। লোকটা অনেক টাকা এককথায় দিয়ে দিল। বিষয় সম্পত্তিও সব দেবত্র না কী যেন মাথামুণ্ডু করছে। হল কী মানুষটার! চিরকালই ঘর-জ্বলানি, পর-ভুলানি ছিল বটে, কিন্তু এখনকার রকমসকম বুঝি কিছু আলাদা। সংসারের ওপর থেকে মায়া তুলে নিচ্ছে না তো! দুম করে একদিন ননীবালাকে রেখে চলে যাবে না তো! বুকটা কেঁপে ওঠে। গভীর শ্বাস পড়ে।
ও-ঘরে বীণার খর গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কী যেন হল। একটু কান পাতলেন ননীবালা। কিছু বুঝতে পারলেন না।
বীণা এসে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে চাপা স্বরে বলে—মা, একবার ও-ঘরে আসুন।
—কী হল?
—আপনার ছেলে কেমন করছে।
বীণার মুখটা থমথমে। ননীবালা উঠলেন, বললেন—ওকে সবাই বড় জ্বালায়।
শোওয়ার ঘরে রণেন বসে আছে চেয়ারে। কপালে একটা জায়গায় থেঁতলে যাওয়ার ক্ষতচিহ্ন, রক্ত।
ননীবালা গিয়ে ছেলেকে ধরলেন—কী হল?
বীণা বাইরের ঘরের দিকের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বলে—ওঁকে আমি বলেছিলাম হাতমুখ ধুয়ে এসে চা খাও। উনি গেলেন না। তারপর আমি রান্নাঘর থেকে ঘুরে এসে দেখি। ড্রেসিং টেবিলের কোনায় মাথা ঠুকছেন।
—কে কী? ননীবালা রণেনের দু-কাঁধ ধরে মুখ নিচু করে বড় ছেলের মুখ দেখলেন ঠিক যেমন করে মা শিশু-ছেলের মুখ দেখে—কী হয়েছে তোর, ও রণো! মাথা খুঁড়ছিলি কেন?
রণেন তার তীব্র ঘোলাটে চোখ তুলে একবার অদ্ভুতভাবে তাকাল। গভীর শ্বাসের মতো শব্দ করে বলল—মা!
॥ উনচল্লিশ ॥
মানুষ কত অসুখী! এরা জানেই না কী করে জীবনযাপন করতে হয়। ব্রজগোপালের মন বড় কু-ডাক ডাকে। সবাইকে ছেড়ে আলগা আছেন তবু সমস্ত মনপ্রাণটা ওদের দিকে চেয়ে। বসে থাকে। ঠাকুর ওদের সুখে রাখো।
হাওড়ায় এসে ট্রেন ধরলেন ব্রজগোপাল। অফিস-ভাঙা-ভিড়। আজকাল বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে পা-দুটো রসস্থ হয়। ওপরে ঝোলানো হাতল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছিল, তাই হাতটাও ভেরে আসে। ক্যাম্বিসের ব্যাগটা ধরে রাখতে কষ্ট হয়। চারধারে মানুষের শরীরের ভাপ, গরম, ঘাম, দুর্গন্ধ। মাথার ওপর পাখা নেই। হাওয়ার জন্য দরজার হাতলে বিপজ্জনকভাবে মানুষ ঝুলছে। বদ্ধ, চাপা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকে ব্রজগোপালের মাথাটা দুবার চক্কর খেল। মাথাঘোরার রোগটা তাঁর যৌবন বয়স থেকেই। তালুতে তিল তিল চেপে ঠান্ডা জলে মাথা ধুলে একটু আরাম লাগে। দাঁড়িয়ে ব্রজগোপাল বারবার বীজমন্ত্র জপ করার চেষ্টা করেন। বারবার সুতো ছিঁড়ে যায়। কাটা ঘুড়ির মতো বনটা ভেসে বেড়াচ্ছে। একবার রণেনের মুখটা মনে পড়ে, একবার ননীবালার, মেয়ে-জামাই, ছেলে-বউ, নাতি-নাতনি সকলের কথাই ভাবেন। বীজমন্ত্র ধরে রাখতে পারেন না। শরীরটা আজ বড় বেগোছ। এই দমচাপা অবস্থায় কারা ভিতরের দিকে ফুটবলের ব্যাপার নিয়ে চেঁচামেচি করছে। সেই গোলমালটা অসহ্য লাগে, আর সিগারেটের ধোঁয়া।
পরপর কয়েকটা স্টেশন পার হতেই ভিড় পাতলা হয়ে গেল। উত্তরপাড়া পার হয়ে বসার জায়গা পেলেন ব্রজগোপাল। ব্যাগটা কোলের ওপর রেখে বসলেন। হালকা জিনিসপত্র কখনও ব্যাঙ্কের ওপর রাখেন না তিনি। যদি চুরি যায়! চুরি যাওয়া ভাল নয়। যার চুরি যায় তার চরিত্রের মধ্যে কোথাও ঢিলেমি আছে, অসংলগ্নতা আছে। যত সামান্য জিনিসও হোক, ব্রজগোপাল সদাসতর্ক থেকে পাহারা দেন!
একটা মোটামতো পশ্চিমা লোক সরে বসে ব্রজগোপালকে জায়গা করে দিয়েছিল, লোকটার গায়ে খয়েরি রঙের এরটা পাঞ্জাবি, পরনে পরিষ্কার ধুতি, মাথায় একটু টিকি আছে, হাতে ভোলা একটা ছোট বই। খুব মন দিয়ে বইটা পড়ছে। ব্রজগোপাল একটু উঁকি দিয়ে দেখেন, বইটার পাতা জুড়ে দেবনাগরী অক্ষরে কেবল একটা কথাই ছাপা আছে, সীতারাম, সীতারাম, সীতারাম। প্রথমটায় কিছু বুঝতে পারলেন না তিনি। পশ্চিমা লোকটা পাতা ওলটাল। আবার দেখেন, ওই একই কথা লেখা সারা পাতায়, সীতারাম, সীতারাম, সীতারাম। বুঝলেন, সারা বই জুড়ে ওই একটি কথাই আছে। গল্প না, প্রবন্ধ না, ধর্মকথা না।
ব্রজগোপাল একটু ঝুঁকে বললেন—এটা কীসের বই ভাই?
লোকটা মুখ তুলে একটু হাসল। পাকানো মোচের নীচে বেশ ঝকঝকে হাসি। মাঝবয়সি মানুষ। দেখে মনে হয় কোথাও বেশ ভাল বেতনের দায়োরান-টারোয়ানের চাকরি করে বলল—রামসীতার নাম আছে বুড়াবাবা, আর কুছু নাই।
—সে তো মনে মনে জপ করলেও হয়।
—এ ভি জপ আছে। পড়তে পড়তে জপ হয়ে যায়।
তাই তো! ব্রজগোপাল ভারী মুগ্ধ হয়ে যান। এই হচ্ছে এৎফাঁকি বুদ্ধি। দুনিয়ার টানাপোড়েন, গণ্ডগোলে অস্থির মন যখন জপ করে রাখতে পারে না তখন এইভাবে নিজেকে জপে বদ্ধ করা যায় বটে। লোকটার ওপর ভারী শ্রদ্ধা হয় ব্রজগোপালের। কেমন নিবিষ্ট মনে নিজেকে রামসীতার নামের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে! লোকটার সঙ্গে একটু কথা বলতে ইচ্ছে করে তাঁর। কিন্তু ইষ্টনাম জপে বাধা হবে বলে বলেন না। কিন্তু মানুষের মধ্যে আন্তরিক ভক্তিভাব দেখলে তাঁর চোখে জল আসে।
গ্রীষ্মকালে হাওড়া স্টেশনে বেশ সস্তায় নাগপুর না কানপুর কোথাকার যেন কমলালেবু বিক্রি হয়। কদমার মতো ছোট ছোট লেবু, ভারী মিষ্টি। বোঁটার কাছে কিছু পচা-পচা ভাব থাকে, সেটুকু চেঁছে ফেলে বেশ খাওয়া যায়। হাওড়া স্টেশনে গাড়ি ছাড়বার আগে এক বুড়ো মানুষকে লেবু কিনতে দেখেছিলেন। সঙ্গে পোঁটলা-পুঁটলি আছে, বৃদ্ধা স্ত্রীও আছেন সঙ্গে। এই ভিড়ে ‘আমি বুড়ো মানুষ বাবা, সঙ্গে মেয়েছেলে আছে বাবা’ এইসব বলতে বলতে ঠেলেঠুলে গাড়িতে উঠে পড়তেও দেখেছিলেন। এখন ভিড় পাতলা হওয়াতে দেখা গেল, সেই বুড়ো মানুষটি বেশ গুছিয়ে বসেছেন উলটোদিকের দূরের জানালার ধারে। জানালার ধারের জায়গা দখল করা এই গরমকালে বেশ মুশকিল। কিন্তু ঘোড়েল গোছের লোকটা দিব্যি জায়গাটা বন্দোবস্ত করেছেন। এও এৎফাঁকি বুদ্ধি। বুড়োর উলটোদিকে কয়েকটা চ্যাংড়া ছেলে বসেছে, ইয়ারবাজ। তাদের সঙ্গে জমিয়ে তুলেছেন বেশ। পাশে আধ-ঘোমটায় গিন্নি মানুষটির মুখ বেশ প্রসন্ন। দেখলেই বোঝা যায়, এরা বেশ সুখী লোক। বিষয় সম্পত্তি আছে, ছেলেরা প্রতিষ্ঠিত, তেমন কোনও দুশ্চিন্তা নেই। চপাচপ লেবু খাচ্ছেন, মুখে হাসি।
