ননীবালা নড়লেন না। এর একটা বিহিত করতে হবে বলে বসে রইলেন। বললেন—ওঁর কথাটা শুনিছিস। আমি দুপক্ষকে পর করেছি। ঝগড়া লাগিয়েছি।
—তা নয়। ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বললেন—তা নয়। দু’পক্ষকে বুঝতে দিলে না। তাদের সম্পর্কে কী। কথাটা বোঝানো শক্ত। তর্ক করে বোঝানো যাবে না। তবু তোমাকে একটা জিনিস বুঝতে বলি, আমিও ছেলেদের ভাল চাই।
—ভাল চাইলে আর দেবত্র করে দেবে কেন?
অজিত আবার আস্তে করে বলে—ব্যালান্স অফ ইকনমি।
ঠাট্টা! ব্রজগোপাল জামাইয়ের দিকে তাকালেন। তারপর নিজের ক্যাম্বিসের ব্যাগটার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন—না বাবা, ব্যালান্স অফ ইকনমি আমি বুঝি না। আমি বড় স্বার্থপর। সার বুঝি, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে সেইজন্যই ভয় খাই। আমার সন্তানের দুধ ভাত একদিন নিরন্ন, বর্বর মানুষ যদি কেড়ে নেয়! তাই এই ত্যক্তেন ভূঞ্জীথাঃ। তবে একজন অ্যাকচুয়ারির সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। বিজ্ঞ লোক। সে ওই ব্ৰতর কথা শুনে বলেছিল—এ ভারী আশ্চর্য জিনিস, ব্রজদা, ঘরে ঘরে সবাই এমন করলে মুহূর্তের মধ্যে আমাদের দুর্দিন, অভাব কষ্ট সব লোপাট হয়ে যাবে। আমি তো অত বুঝি না। বুড়ো বামুন যেমন বলে গেছে তেমন করি। আমার বুঝটা বড় সাদামাটা।
কেউ কোনও কথা বলার আগেই ব্রজগোপাল উঠে দাঁড়ালেন। ভারী ক্লান্ত দেখাছিল। শীলা উদ্বিগ্ন মুখে বলে—শরবতটা খেলে না বাবা!
ব্রজগোপাল সে কথায় কান না দিয়ে বললেন—ভূতভোজনের কথা বলছ, ভয় বোধ হয় হ্যাঙালি ক্যাঙালিরা এসে রোজ ভাগাড়ের শকুনের মতো পড়বে। কিন্তু এ কাঙালি ভোজনের ব্যবস্থা নয়, দরিদ্র নারায়ণ সেবাও নয়। বসিয়ে খাওয়ালে মানুষের গতরে মরচে পড়ে যায়, আর নড়ে না। এ কে না জানে! অযোগ্য অপাত্রে দান, দাতা গ্রহীতা দুই-ই ম্লান। কিন্তু সেবাবুদ্ধি থাকলে মানুষের ঠিক অভাবের জায়গায় হাত বাড়ানো যায়। কত বড়মানুষেরও কত অভাব আছে। আমি যেমন বলছি তেমন করলে নিজের মধ্যেও সেবাবুদ্ধি জাগে, পাঁচজনেও দেখে শেখে। তা এসব কথা তো তোমাদের কাছে অবান্তর।
ননীবালা কী বলতে যাচ্ছিলেন, রণেন আবার বলল—মা!
ননীবালা ছেলের দিকে চেয়ে সামলে গেলেন। রণেনের মুখ লাল। চোখ দুটো বড় ঘোলাটে লাগল। ননীবালা একটা দীর্ঘশ্বাস, ফেললেন। ব্রজগোপালের দিকে চেয়ে বললেন—উঠলে নাকি?
—উঠি। অনেক দূর যেতে হবে।
ননীবালা বাধা দিলেন না। বললেন—দুর্গা, দুর্গা। জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে শীলার দিকে চেয়ে বলেন—আজ আমি একবার ও-বাড়ি যাব। ছাদ থেকে আমার জামাকাপড়গুলো আনতে বল তো!
রণেন রয়ে গেল, মাকে নিয়ে বাসায় ফিরবে। ব্রজগোপাল একাই বেরিয়ে এলেন। রাস্তায় পা দিয়ে হঠাৎ টের পেলেন, তিনি বড় বেশি একা। ভয়ংকর একা। বুকের ভিতরটা যেন এক চৈত্রের ফুটি-ফাটা মাঠ, সেখানে এক ন্যাড়া গাছে বসে দাঁড়কাক ডাকছে—খা, খা।
উত্তজনা বীজমন্ত্রের খেই হারিয়ে গিয়েছিল। ছেঁড়া সুতোটা মনের মধ্যে কাটা ঘুড়ির সুতোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। বীজনাম অতিদ্রুত স্পন্দিত হতে থাকল শরীরে, রক্তে, হৃৎস্পন্দনে। নির্ঝরের মতো। অবগাহন হতে থাকে। তবু মনটা ভাল না। ছেলেটা ভাল নেই, মেয়ে-জামাইয়ের মধ্যে একটা কেমনতর ভাব! আর ননীবালা! এখনও এই আয়ুর সাঁঝবেলায় দু-হাতে ছেলেদের স্বার্থ আগলাচ্ছে। ব্রজগোপাল তাই এই মস্ত জগৎসংসারে বড় একা।
নির্জন পাড়াটা পার হয়ে বড় রাস্তায় লোকজনের মাঝখানে চলে এলেন ব্রজগোপাল। তখনও মনটা ওইরকম খাঁ-খাঁ করছে। আপন মনে বলেন—দূর বেটা, তুই যে নেংটে নেই নেংটে। একা আবার কী? একটা শ্বাস ছেড়ে ব্রজগোপাল বাস-স্টপে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। চারদিকে ফুলিয়ে ওঠা কলকাতার ভিড়, ট্রামে-বাসে লাদাই ভিড়, ধুলোটে আকাশ। তারই মাঝখানে হঠাৎ যেন বহুদূরের এক চিত্র ভেসে ওঠে। যজ্ঞস্থলীতে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। যজ্ঞধূমের গন্ধ ভেসে আসে। কী পবিত্র পৃথিবী! কী পরিষ্কার এর বাতাস! ব্রজগোপাল তাঁর পরিবারের কথা ভুলে গেলেন। বুড়ো বামুনের মুখটা ভেসে ভেসে ওঠে নাসামূলের আজ্ঞাচক্রে।
ননীবালা যখন ঢাকুরিয়ার বাড়িতে পা দিলেন তখন সন্ধে হয়ে গেছে। নাতি-নাতনিরা মাস্টারের কাছে পড়ছিল, ঠাকুমাকে দেখে দৌড়ে এসে সাপটে ধরল। ঠাকুমা, ঠাকুমা ডাকে অস্থির। বাচ্চাকাচ্চা না থাকলে আর বাড়ি কী! শালির বাড়িতে এ ক’দিন যেন হানাবাড়িতে কেটেছে। হাঁফ ধরে গিয়েছিল।
ছোট নাতিকে ট্যাঁকে গুঁজে নিজের ঘরের তক্তপোশে এসে বসলেন। ভারী একটা নিশ্চিন্তভাব। বীণা একবার উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করে গেল—চা খাবেন তো! হচ্ছে।
—দিয়ো, বললেন ননীবালা। নাতিটা ধামসাচ্ছে। বললেন—বড় ডাকাত হয়েছিস দাদা।
চারদিকে চেয়ে দেখলেন। সোমেনের টেবিলে ছাইদানিটা উপচে পড়ছে পোড়া সিগারেট, দেশলাই কাঠি আর ছাইতে। বিছানার চাদর নোংরার হদ্দ। মশারিটা আগে খুলে ভাঁজ করে রাখা হয়, এখন চালি করে রাখা, তাতে ময়লা হয়েছে। বিছানায় ছাড়া জামাকাপড় পড়ে আছে।
এসব সারতে থাকেন ননীবালা, আর আপনমনে বক বক করেন। পরোক্ষে বউকেই শোনান।
ঘরদোর সেরে পরনের কাপড়টা পালটে নিলেন। ভাঁজ করে তুলে রাখতে যাবেন এমন সময়ে আঁচলের গেরোটা চোখে পড়ল। সাবধানে পেট আঁচলে বেঁধে এনেছেন। সেই চেকটা খুলে শত ভাঁজের দাগ ধরা চেকটা আলোয় দেখলেন একটু। চোখে জল এল। অনেকগুলো টাকা। এত টাকা ও-মানুষ জন্মে কখনও দেননি ননীবালাকে। এতকাল গরিবেরই ঘর করেছেন ননীবালা, টাকার মুখ বড় একটা দেখেননি। লোকটা যে শেষ পর্যন্ত দেবে এমন বিশ্বাস ছিল না। তবু দিল তো!
