—তুমি তো আছো, তুমি দেখতে পারো।
ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বলেন—ছড়ানো জমি, অত কি একটা মানুষ দেখতে পারে! তার ওপর মাঝেমধ্যে তো মানুষের মন বিষয় থেকে উঠে যায়। আমার ওসব আর ভাল লাগে না। নিজের হাতে গাছপালা যে এখনও করি সে ফুলপাকুড় খাব কী টাকা হবে বলে নয়। গাছ জন্মায়, ফল দেয়, ফুল ফোটে, সেটা চোখে দেখার একটা মায়া আছে, তাই।
ননীবালা রাগ করেন না, তবু অনুযোগের সুরে বলেন—সেটা কি কোনও কাজের কথা! ছেলেরা যেতে পারে না বলে তুমি রাগ করো। কিন্তু তারা কি তোমার মতো বিষয়বুদ্ধি রাখে! তুমি না দেখলে তো হবে না।
ব্রজগোপাল একটু চুপ করে থেকে বলেন—তারা না গেল, তা বলে আমাকে যক্ষবুড়ো হয়ে থাকতে হবে কেন? তোমার তো মোটে পাঁচ কী ছ-বিঘে, আমার তারচেয়ে ঢের বেশি। যা ফসল হয় তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ রাখি, বাকি, চার ভাগ খয়রাতিতে যায়।
—সে কেন?
—ওটা আমার একটা ব্রত।
—দেবত্র করলে নাকি?
—ওরকমই।
ভারী উদ্বিগ্ন হয়ে ননীবালা প্রশ্ন করেন—সে কেন?
ব্রজগোপাল ননীবালার উদ্বেগটা টের পেয়ে হেসে মাথা নেড়ে বললেন—ভয়ের কিছু না। ঠাকুর দেবতার নামে লিখে দিইনি, আমার নামেই আছে, আমার ওয়ারিশ যারা তারাই পাবে। কিন্তু পেলেও আমার ব্রতটা যেন তারা না ভাঙে। ফসলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ নেবে, বাকি থেকে যা আয় হবে তা দিয়ে সম্পত্তি বাড়াবে। আর মানুষকে দেবেথোবে, অনাহারীকে খাওয়াবে, গরিব গুর্বোদের দেখবে, কাঙাল ফকিরকে সাহায্য করবে।
—সে তো ভূতভোজন হল। তবে ওরা খাবে কী?
ওদের খেতে বারণ নেই। খেয়েপরেও অনেকের খানিকটা থাকে। দেয় না।
—সে যাদের অনেক আছে তারা দিকগে। আমাদের তো জমিদারি নেই। বছরে সামান্য কটা টাকা। সেও ভূতভোজনে গেলে জমি লোকে করে কেন?
—নিজের জন্যেই করে। জমি, সম্পত্তি, চাকরি সবই নিজের জন্য। সে একশোবার। আবার গরিব গুর্বো, শিয়াল কুকুর, কাক শালিখকেও ভাত দেয়, সেও নিজের স্বার্থেই দেয়। জগৎসংসারে থাকতে হলে প্রতিকূলভাবে না থেকে অনুকূলভাবেই থাকা ভাল। আমি তৃপ্ত হই, আমার চারদিক তৃপ্ত হোক।
—ওসব ভাল কথার দিন কি আর আছে! শখের গয়না বেচে জমি কিনেছিলে, আমারটা খয়রাতি হতে দেব কেন?
ব্রজগোপাল ননীবালার দিকে একটু চেয়ে থাকেন। সামান্য বুঝি অভিমান ভরে বলেন— তোমার দুঃখ কী! সংসারে আটকা আছো, বুঝতে পারো না মানুষজন কীভাবে বেঁচে আছে। চারদিকে মানুষজন যত উপোসী থাকবে, যত অতৃপ্ত অশান্ত হবে তত তোমার সংসারে তাদের হাত এসে পড়বে। ছেলেদের ভালই যদি চাও তো তারা যে সমাজ সংসারে আছে তার আগে ভাল করো। শুধু আলাদা করে রণেন সোমেনের ভাল চাইলেই কি ভাল হয়?
ননীবালা ধৈর্য রাখতে পারেন না। আঁচলে বাঁধা চেকটার কথা ভুলে গিয়েই বুঝি তেড়ে ওঠেন—ওসব আমি বুঝি না। ব্ৰতট্রত ওরা মানতে পারবে না। পুরো ফসলের হিসেব যদি না পাই তো জমি বেচে দেব।
অজিত এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল। একটু বিষণ্ণ, একটু অনুতপ্ত, শীলার জন্যই। এখন হঠাৎ বলল—উনি বোধ হয় ওইভাবে একটা ব্যালান্স অফ ইকনমির চেষ্টা করছেন।
ননীবালা জামাইয়ের দিকে একটু ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন। জামাইটা বড় ট্যাটন। লঘুজন-গুরুজন মানে না, পট পট কথা বলে। একটু আগে বুড়ো শ্বশুরের মুখে মুখে জবাব করছিল। বললেন—কী বললে?
অজিত হেসে বলে—গরিবকে দিয়েথুয়ে খুশি রাখলে বড়লোকদের এরকম সুবিধেই হয়। ধর্মও হয়, শোষণের সুবিধে হয়।
ননীবালা কথাটা বুঝলেন না। মানলেনও না। গম্ভীরভাবে বললেন—বড়লোকরা যা খুশি করুক। আমরা করতে যাব কেন?
শীলা চমৎকার কাচের গ্লাসে ঠান্ডা শরবত এনে রাখলে টেবিলে। মুখখানা একটু ভার, একটু নত। বাপের কাছে বসে মুখ তুলে মাকে বলল—চুপ করো তো মা। বাবার জমি যা খুশি করুক, তোমার কী!
—আহা, বড় বাপসোহাগী হলেন! ননীবালা এই ঢঙে কথা বলে রাগের মাঝখানেও হেসে ফেললেন একটু। পরমুহূর্তে গম্ভীর হয়ে বললেন—ওঁর জমি মানে ছেলেদেরও। ছেলেরা তো আকাশ থেকে পড়েনি, ওঁরই জন। পর নয়।
ব্রজগোপাল মলিন একটু হাসলেন। বললেন—ছেলেরা বাপের পর হবে কেন, তারা শ্রাদ্ধের অধিকারী।
কথাটার মধ্যে একটু ব্যঙ্গ ছিল, আর বুঝি নিজের মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা। ননীবালা দমলেন না, বললেন—শ্রাদ্ধের কথা ওঠে কেন? বেঁচে থাকতে কি অধিকার থাকে না নাকি?
মাথাটা দু-হাতে কঠিনভাবে চেপে ধরে বসেছিল রণেন। হঠাৎ উত্তেজিত মুখ তুলে বলে—মা!
এবার জগজ্জননীকে নয়, নিজের নাকেই বলা। বরাবর এ ছেলেটা বাপের পক্ষ হয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করেছে। শেষমেষ বাপের উপরেও বিরক্তি এসেছিল। তবু বুঝি এখনও কিছু পক্ষপাত রয়ে গেছে। ননীবালা ঝাঁকি দিয়ে বললেন—কী, বলবি কী? বাপের সম্পত্তিতে তোর দরকার নেই এই তো! তোর না থাকে, সোমেনের আছে। আমি ছাড়ব না।
ব্রজগোপাল খানিকটা হতভম্বের মতো চেয়ে থাকলেন। শীলা শরবতের গ্লাসটা তাঁর হাতে তুলে দিয়ে বলে—বাবা খেয়ে নাও তো। ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে এনেছি, আবার গরম হয়ে যাবে।
ব্রজগোপাল গ্লাসটা ধরলেন না। ননীবালার দিকে চেয়ে বললেন—বরাবর দেখে আসছি তুমি সংসারের দুটো পক্ষ তৈরি করে নিয়েছ। আমি একদিকে, ছেলেরা আর তুমি অন্যদিকে।
শীলা মাকে একটু চোখ টিপে বলে—মা, তুমি একটু রান্নাঘরে যাও তো। ঝি মেয়েটাকে দুধ জাল দিতে বলে এসেছি, ও গ্যাসের উনুন নেবাতে পারে না। যাও।
