ননীবালা খাবারের প্লেট আর চা হাতে এলেন।
ব্রজগোপাল একটু তাকালেন মাত্র সেদিকে। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন—ও নিয়ে যাও।
—মেয়ের বাড়িতে এসেছ, একটু মুখে দিতে হয়।
—যখন-তখন খাই না আজকাল। অভ্যেসও নেই। ওদের সব দাও।
বলে ছেলের দিকে তাকালেন। অজিত লক্ষ করে, রণেনের ঠোঁট আবার নড়ছে। আঙুলে বাতাসের একটু শূন্য আঁকল রণেন। কাকে যেন উদ্দেশ করে নিঃশব্দে কী বলে যাচ্ছে।
॥ আটত্রিশ ॥
এই ছেলেটার বরাবরই বড় ঘাম হয়। ধুতি পাঞ্জাবি পরা, মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে, তবু গলা বগল ভিজে গেছে। ননীবালা উঠে ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে বলেন—তুই অত ঘামিস কেন?
রণেন দু-হাতে মাথা চেপে বসেছিল। মুখ তুলে কেমন একরকম ভাবে তাকায়। পাঁজর কাঁপিয়ে একটা শ্বাস ছাড়ে। হঠাৎ চোখের ডিম উলটে শিবনেত্র হয়ে বলে—মা! মাগো!
গর্ভধারিণীকে নয়, যেন জগজ্জননীকে ডাকছে। ডাকটা বেখাপ্পা শোনাল। এ ছেলেটা ননীবালার তেমন সুখী নয়। বউটা তেমন হয়নি, বড্ড খোঁড়ে। ছেলেটা বউয়ের তাল রাখতে পারে না। বোধ হয় ঝগড়াটগড়া হয়েছে আবার। এখন তো বাসায় ননীবালা নেই, রক্তারক্তি হলে চেঁচাবে কে, আটকাবে কে! ননীবালার বুকটা তাই কেঁপে ওঠে। কী করার আছে! বুড়ো হলে মানুষের আর সংসারে বিশেষ কিছু করার থাকে না। এখন তো আর কোলের সেই ন্যাংলা রণো নয়, এখন পুরোদস্তুর স্বামী-বাপ সংসারের ভিত। এই ছেলেকে ননীবালা আগলে রাখেন কী করে! তবু মনের মধ্যে একটা দুশ্চিন্তা ছায়া ফেলে। বড়বেশি দিন মেয়ের বাড়িতে থাকা হল। এবার একবার ওদিককার সংসারে একবার গা ফেলবেন।
বলেন—কবে নিয়ে যাবি আমাকে?
রণেন চোখ বুজে ছিল। বলল—যবে খুশি।
—আজই চল। বুবাই-টুবাই ঠাকুমা ছাড়া কেমন করে সব? মা তো জো পেয়ে খুব ঠ্যাঙায়। ঠ্যাঙাড়ে বাড়ির মেয়ে।
থাবারটাবার সব পড়ে আছে। কেউই ছোঁয়নি এখনও। শীলা বলল—বাবা, খাও।
ব্রজগোপাল প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলেন—তোরা খা। এ বয়সে যখন-তখন খাওয়া বড় অপয়া। যত কম খাই, তত ভাল থাকি।
—একটু শরবত দিই বাবা?
ব্রজগোপাল একটু ঘাড় নাড়লেন। মুখে দুশ্চিন্তার চিহ্ন। বললেন—সেটা বরং সহজে গলা দিয়ে নামবে। নিজের হাতে করে আনিস যদি।
—আনছি। বলে শীলা উঠে গেল।
ব্রজগোপাল চারদিকে একবার তাকালেন। কিন্তু কিছুই দেখলেন না। দৃষ্টিটা এসে স্থির হল ননীবালার চোখে। ননীবালাও চেয়ে আছেন। একদৃষ্টে। তাঁদের ভালবাসা ছিল। সে-আমল এখনকার মতো নয়। সারা দিন কেউ কারও দেখা পেতেন না। রাতে দেখা হত, কিন্তু কথা হত ফিসফিসিয়ে, যেন গহীন রাতের চোরেও না শুনতে পায়। এই যে এখন যেমন, মা-বাপের সামনে মেয়ে আর জামাই বসে থাকে, কিংবা ছেলে আর ছেলের বউ, এরকমটা ভাবা যেত না। নিজের বাবার সঙ্গে কখনও বসে কথা বলেননি ব্রজগোপাল, সর্বদা দাঁড়িয়ে থাকতেন। ননীবালার সঙ্গে যৌবন বয়সে বেড়াতে বেরিয়েছেন জোড়ে, এমন মনে পড়ে না। বউ ছিল শুধু রাতটুকুর জন্য, বেহানেই সে হয়ে যেত সংসারের একজন, স্বামীর কেউ নয়। তুব ভালবাসা তো কিছু কম ছিল না। আর এখন স্বামী-স্ত্রী বড় বেশি পায় পরস্পরকে। এদের বিরহ কম। এদের বিবাহের পুরোহিত হচ্ছে কামস্পৃহা। মনে মনে তাই বড় তাড়াতাড়ি দূরের হয়ে যায়। কাছে কাছে থেকেও। কামটুকু ফুরোলেই আর থাকে কী! অবশ্য ব্রজগোপাল আর প্রমাণ করতে পারেন না যে, তাঁর এবং ননীবালার মধ্যে ভালবাসা ছিল। প্রমাণের দরকারই বা কী? মনে মনে তিনি তো জানেন, তাঁর হৃদয় ননীবালার নিরন্তর মঙ্গল প্রার্থনা করে। স্থির জানেন, পরজন্মেও তাঁর বউ হবে এই ননীবালাই। ছাড়ান কাটান নেই, এই এক সম্পর্ক। এসব কি প্রমাণ করা যায়।
ননীবালার চোখে চোখে আটকে গেল। ননীবালাই সামলালেন আগে। ঘোমটা ডান কানের পাশে দিয়ে একটু টেনে দিয়ে বলেন— বুকের ব্যথাটা কি আর হয়?
—না।
শরীর-টরীর খারাপ হলেও তো খবরবার্তা কেউ দেয় না যে গিয়ে পড়ব।
ব্রজগোপাল মুখটা ফিরিয়ে নেন। বলেন—ব্যস্ত হওয়ার মতো ব্যাপার কী! মেঘু ডাক্তার আমলকী আর মধু খেতে বলেছিল। সেই খেয়ে এখন ভালই আছি।
—রাতে বোবায়-টোবায় ধরলে কে ডেকে দেয়! বুড়ো বয়সে একা শোওয়া ভাল নয়, রাতটা ভয়ের।
ব্রজোগোপাল তাচ্ছিল্যের ভাব করে বলেন—শোয় একজন। উটকো লোক, পেল্লায় ঘুম তার। আর বোবায় ধরবে কাকে, ঘুমই নেই।
ননীবালা বলেন—মাটির ভিত্-এর ঘর। এই গ্রীষ্মকালটায় সাপখোপ সব ঘরেদোরে চলে আসে। বহেরু যেন ঘরের গর্তটৰ্ত সব বুজিয়ে দেয়।
ব্রজগোপাল উত্তর করলেন না। তবু ননীবালার এই উদ্বেগটুকু বহুকাল বাদে তাঁর বেশ লাগছিল। এটা টাকায় কেনা জিনিস নয়, স্বার্থত্যাগ মানুষকে কখনও-সখনও একটু বা মহৎ করে। ব্রজগোপালের মূর্তিটা বোধ হয় ননীবালার বুকের মধ্যে ঘষা-মাজা খেয়ে একটু স্পষ্ট হল।
কিন্তু মেয়েমানুষের দোষ হল, সে বেশিক্ষণ আলগা ভালবাসার কথা বলতে পারে না। তার মধ্যে হঠাৎ বিষয় সম্পর্কিত কিংবা সংসারের আর পাঁচটা কথা এনে ফেলে। বেসুর বাজতে থাকে।
যেমন ননীবালা এসব কথার পর হঠাৎ বলেন—এবারও বহেরু ধানের দাম কম দিল।
ব্রজগোপাল মাথা নাড়লেন। বললেন—বহেরুর হাতে তো সব নয়। ছেলেরাই এখন সব করছে।
—কেন, বহেরুর কী হয়েছে?
ব্রজগোপাল হাসলেন। বললেন—কী আর হবে। বুড়ো হয়েছে। সে যতদিন দেখত ততদিন বুঝেসুঝে দিত। ছেলেরা দেবে কেন? তারা বর্গা ভাল জানে। যা দেবে, তাই নিতে হবে।
