অজিত শ্বশুরের দিকে চেয়ে থাকে। একটু ক্রুদ্ধ দৃষ্টি। বলে—কোনও মানুষই তো বিচ্ছিন্ন নয়। আলাদা ব্যষ্টি হয়ে যেমন, তেমনি আবার সে সমষ্টিরও একজন। কোনওটাই মিথ্যে নয়।
—মিথ্যে হওয়া উচিতও নয়। ঠিকই তো। মানুষ যেমন আলাদা আবার তারা গোষ্ঠীবদ্ধও। কে না স্বীকার করবে? কিন্তু এখনকার রীতিই হচ্ছে আগে সমষ্টিকে দেখা, ব্যক্তির কথা তারপরে। আগে সংখ্যা, তারপর জন। কিন্তু আবার তোমার বিজ্ঞানই বলছে, পৃথিবীর কোনও দুটো জিনিসই হুবহু একরকমের নয়। পৃথিবীর প্রতিটি বালুকণা, প্রতি গাছ, প্রতি ফল, প্রতিটিই আলাদা রকমের। সে হিসেবে পৃথিবীতে ঠিক একরকমের জিনিস একাধিক নেই। তাই কারও সঙ্গে কাউকে যোগ করে এক-এ এক-এ দুই করাই যায় না। কারণ প্রতিটি একই আলাদা এক। তার কোনও দ্বিতীয় নেই। এটা আগে সবাই তোমরা বোঝো তার সমষ্টির কথা ভেব। জনগণ বা জনসখ্যা এ কথাগুলো অস্পষ্ট। প্রতিটি মানুষকে আগে বুঝতে দাও যে সে সমাজ সংসারের অপরিহার্য একজন। তাকে না হলে চলে না। নইলে মানুষ কেবলমাত্র সংখ্যাতত্ত্ব হয়ে যাবে, মানুষের ভিড় দেখে মানুষেরই ক্লান্তি আসবে। ভবিষ্যৎ বচনেরও দরকার নেই, এসে গেছে।
এই সব তত্ত্বকথা শুনেই বোধ হয় ননীবালা উঠে পড়লেন। বললেন—যাই দেখি গে।
ব্রজগোপাল নড়েচড়ে বললেন—আমিও উঠে পড়ি।
ননীবালা মাথা নেড়ে বললেন—উঠবে কী! বোসো। আসছি।
ননীবালা চলে গেলেন। রন্নাঘরের দিকেই বোধ হয়। সেদিক থেকে তাঁর গলা পাওয়া গেল, বাচ্চা ঝিটাকে বকছেন—তুই খাবার বেড়ে নিয়ে যাচ্ছিস কিরে! সবাইকে কী আর ঝি-চাকরে খাবার দিতে আছে! এ কী যে সে লোক। রাখ, আমি নিয়ে যাচ্ছি।
অজিত চুরি করে একটু হাসল। শ্বশুরমশাইয়ের দেওয়া অনেক হাজার টাকার চেক আঁচলে বেঁধে শাশুড়ি ঠাকুরুনের ভালবাসাটাসা সম্মানবোধ সব মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। বিয়ের সম্পর্কটা কি তবে অর্থনৈতিক। ভালবাসার জান কি টাকা আর নিরাপত্তার ভিতরে বীজাকারে নিহিত রয়েছে! সংসার থেকে প্রায় বহিষ্কৃত ব্রজগোপালের তো এত সম্মান প্রাপ্য নয়! সংসারের কারও ব্রজগোপালের প্রতি কোনও দরদ আছে বলে অজিত জানে না। সবাই বলে, এ লোক হচ্ছে একগুঁয়ে জেদি মানুষ, কারও সঙ্গে বনে না। কথাটা ঠিক। তবু অজিত মনে মনে এ-লোকটাকে হিংসে করে। এ লোককে দিনে দশবার বউয়ের অকারণ রাগ অভিমান ভাঙাতে হয় না, এ লোক বিবাহের বহন করার কষ্টকর কাজ থেকে কৌশলে নিজেকে সরিয়ে নিতে পেরেছে। এ সব তো বটেই। তার ওপর অজিত দেখেছে, এ লোকটার ভিতরে এখনও ভালবাসা মরে যায়নি। নইলে কেউ বয়স্ক জামাইয়ের হাতে মিষ্টি খাওয়ার টাকা দিতে পারে। অজিত হলে পারত না।
একটা চমৎকার মিঠে কমলা রঙের শাড়ি সদ্য পরে ঘর আলো করে শীলা ঘরে এল। চুলটুল আঁচড়ে এসেছে। চোখে এখনও কান্নার ফোলাভাব। কপালে সিঁথিতে সিঁদূর দগদগে। মুখে একটু পাইডারের ছোঁয়া। এ সবই মুখের ভাব, কান্নার চিহ্ন ঢাকার ছদ্মবেশ। কোনও কথা না বলে প্রণাম করল বাপকে। ব্রজগোপাল মাথায় হাত রাখলেন। একটু বেশিক্ষণ রাখলেন যেন। চোখটা বুজলেন। ইষ্ট স্মরণ করলেন বোধ হয়।
শীলা বাপের পাশ ঘেঁষে বসল। আঁচলটা কুড়িয়ে নিয়ে মুখে চাপা দিল একটু বলল—কেমন আছ বাবা?
ব্রজগোপাল উদাস স্বরে বললেন—আছি। আমাদের আর বিশেষ কী। তোরা কেমন?
শীলা মাথা নেড়ে বলে—ভাল।
ব্রজগোপাল একটা শ্বাস ছেড়ে বলেন—সংসারের কাজটাজ সব করিস নিজের হাতে?
শীলা হাসল একটু। বিবাহিতা বয়স্ক মেয়ের উপযুক্ত প্রশ্ন নয়; তবু বলল—করি।
—করিস! বলে ব্রজগোপাল হালেন—কখন করিস? তুই তো চাকরি করছিস, শুনেছি।
—দুটোই করি।
—চাকরি করিস কেন? অজিতের আয়ে তোদের চলে না? ওর তো রোজগার ভালই।
—আজকাল সব মেয়েই করে।
—তাই করিস? নিজের ইচ্ছেয় নয়? প্রয়োজনও নেই?
শীলা একটু অপ্রস্তুত হয়। অনেকদিন পর বাপের সঙ্গে দেখা, তাই বোধ হয় মানুষটাকে ঠিক বুঝতে পারে না। একপলক বাবাকে দেখে নিয়ে বলে—টাকার দরকার তো আছেই। সময় কাটে না। লেখাপড়া শিখেছি, সেটাও তো কাজে লাগানো উচিত।
—ও। বলে ব্রজগোপাল বুড়োটে মুখে দুষ্টুমির হাসি হাসেন। যেন তাঁর এ-মেয়েটা নাবালিকা এবং তিনি তার সঙ্গে খুনসুটি করছেন। বলেন—মেয়েরা যেন এত টাকার ফিকির খোঁজে রে? পুরুষ যদি খাওয়াতে পরাতে না পারে তখন না হয় কিছু করলি। এমনি খামোকা চাকরি করবি কেন? এককাঁড়ি টাকার মধ্যে কি সুখ? বেশি বহির্মুখী হলে মেয়েদের মধ্যে ব্যাটাছেলের ভাব এসে যায়। সংসারেও বিরক্তি আসে। স্বামীর সঙ্গে পাল্লা টানে। ও ভাল নয়।
শীলা মাথা নিচু করে চুপ করে আছে। তর্ক করে লাভ কী!
ব্রজগোপাল তেমনি দুষ্টুমির হাসি হাসেন। আচমকা বলেন—ট্রামে বাসে পুরুষের বগলের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে রোজ যাতায়াত। সেও বিশ্রী। পুরুষেরাও তো ভাল নয়। কত লোকের মনে কত বিকৃতি আছে। তারচেয়ে বরং হামলে সংসার করবি। নিজের হাতে রেঁধেবেড়ে দিবি। স্বামীর সেবা নিজের হাতে করলে ভালবাসা আসে। এ তো আর অংশীদারি কারবার নয় যে, যে-যার ভাগের টাকা ঢেলে সংসার চালালি।
ব্রজগোপাল ডান হাতে মেয়ের দীর্ঘ এলো চুলে একটু হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন—বাচ্চাকাচ্চা যখন হবে তখন দেখবি। মা-বাপ ছাড়া বাড়িতে কেমন অনাথ হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
