বাবা! বাবার কথা ভারী ভুল হয়ে যায় আজকাল। মনেই থাকে না যে বাবা আছেন। কাল একবার মনে হয়েছিল, ঘোষের কথায়। তাড়াতাড়ি জল ঢেলে স্নানটা সম্পূর্ণ করে রণেন। বুকের ভিতরে একটা আকুলি-বিকুলি। মনটা কেবলই বায়নাদার বাচ্চার মতো আপনজনের গন্ধ খুঁজছে। কোথায় আছে মায়ের কোল, বাপের গন্ধ, বউয়ের শরীর। কেউ যেন নেই। বাবা এসেছে শুনে বুকটা তাই কেমন করে উঠল।
গামছা-পরা অবস্থায় বেরিয়েই খানিকক্ষণ বাবার দিকে চেয়ে দেখল রণেন। গায়ে হাফ-হাতা সাদা ফতুয়া, একটু উঁচুতে তোলা ধুতি। শরীরটা বেশ রোগা। বেতের চেয়ারে বসে ধুতির খুঁটে মুখটা মুছছেন। রুমাল রাখেন না। চেয়ারের পাশে মেঝের ওপর রাখা সেই ক্যাম্বিসের ব্যাগ।
মুখ মুছে তাকালেন একটু। কথা বললেন না।
রণেন বলল—এই রোদে বেরিয়েছেন?
ব্রজগোপাল হাসলেন একটু। বললেন—আর সব কোথায়?
রণেন বুঝল, মার কথা বলছেন। বলল—মা তো শীলার কাছেই আছেন। ওর বাচ্চা হবে, কাছে থাকেন।
—ও। আর সোমেন?
—বেরিয়েছে। বসুন, এই সময়ে আসে।
বীণা রান্নাঘর থেকে জিজ্ঞেস করল—চা খাবেন তো!
ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বলেন—বরং একটু জল দিয়ো। হাতের কাজ সেরে নিয়ে।
রণেনের কান-মুখ গরম হয়ে ওঠে। রাগে, লজ্জায়। অতিথি তো নয়, বাবা। ভরদুপুরে তাঁকে কেউ চায়ের কথা বলে। বলা উচিত—ভাত খেয়ে যাবেন। কিংবা বলারও দরকার। নেই। ভাত বেড়ে ডাকতে হয়।
লুঙ্গি পরে, চুল আঁচড়ে এসে বসে রণেন। বাবার কাছাকাছি বসতেই যেন একটা শস্য, ফুল আর যজ্ঞমাটির গন্ধ পাওয়া গেল। বীণা পাখাটা খুলে দিয়ে যেতে ভুলে গেছে, রণেন পাখা খুলল। বলল—অনেকদিন বাদে এলেন। শরীরটরীর ভাল তো!
—শরীর ভাল। তবে ওদিককার খবর ভাল না।
—কেন, কী হয়েছে?
ব্রজগোপাল স্পষ্ট কিছু বললে না। কেবল বললেন—কী আর হবে! বহেরুর বয়স হচ্ছে। আমারও। বুড়োরা এবার পা বাড়িয়ে রয়েছি। এই বেলা সব বুঝে না নিলে…
সেই পুরনো কথা। রণেন চুপ করে থাকে।
বীণা হাত ধুয়ে এক গ্লাস জল রেখে যায় টেবিলের ওপর। ব্রজগোপাল জলটার দিকে চেয়ে থাকেন। বলেন—সে যাকগে। আমার অ্যাকাউন্টে এল আই সি’র চেকটা ক্যাশ হয়ে এসেছে নাকি?
—সে তো কবে!
—তা হলে টাকাটা দিয়ে যাই। সেজন্যেই এসেছি। তোমাদেরও জমিটার ব্যাপারে দেরি হয়ে যাচ্ছে।
ক্যাম্বিসের ব্যাগ থেকে খুঁজে খুঁজে হাঁতড়ে দোমড়ানো চেক বইটা বের করলেন বাবা। বুকপকেট থেকে ট্রেনের ফেরিঅলার কাছ থেকে কেনা সস্তা কলম বের করে বললেন—উনি দশ হাজার চেয়েছিলেন, না কি পলিসির পুরো টাকাটাই, তুমি জানো?
রণেন বিপদে পড়ে মাথা নেড়ে বলল—না।
—কার নামে লিখলে ভাল হয়?
—মার তো অ্যাকাউন্ট নেই।
—নেই? বলে একটু দ্বিধায় পড়লেন ব্রজগোপাল।
—আমার আছে।
—তোমার নামে লিখব? বলে ব্রজগোপাল রণেনের দিকে তাকালেন। চোখের দৃষ্টি কেমন যেন সংশয় ভরা। যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছেন না।
ভারী অভিমান হল রণেনের। চুপ করে রইল।
ব্রজগোপাল কলম রেখে জলটা খেলেন। কোঁচার খুঁটে মুখ মুছে বললেন—তোমার তো ইনকাম ট্যাক্সের ঝামেলা আছে। বরং তোমার মায়ের নামে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে নাও। বলে একটু চুপ থেকে বললেন—তোমার মাকেই টাকাটা দেওয়ার কথা আমার। তোমার নামে লিখলে কথা রাখা হল না। কাজের সুবিধে হলেও সেটা উচিত হবে না।
—তবে মার নামেই লিখুন।
ব্রজগোপাল তাই লিখলেন। সাবধানে চেকটা ক্রস করে অ্যাকাউন্ট পেয়ি করে দিলেন। রণেন দেখল, ব্রজগোপাল পলিসির পুরো টাকাটাই লিখে দিয়েছেন।
চেকটা হাতে দিয়ে বললেন—তোমার মায়ের হাতে দিতে পারলেই ভাল হত।
রণেন বলল—শীলার বাড়ি তো দূর নয়। খাওয়া-দাওয়া করে নিন, তারপর, একটা ট্যাক্সি করে চলে গেলেই হবে।
ব্রজগোপাল ভারী লাজুক একটু হেসে বলেন—ওখানে যাওয়ার কী দরকার? তুমি ওঁর নামে ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে দিয়ো।
ব্রজগোপালের কাজ ফুরিয়েছে, এক্ষুনি বুঝি চলে যাবেন। ফলে রাতের সেই কান্নার দলাটা আজও ঠেলা দিয়ে উঠল রণেনের টনসিলের কাছে। বাবা চলে গেলেই বড় একা লাগবে। রণেন তাই তাড়াতাড়ি বলল—চলুন না। শীলা অজিতদেরও বহুদিন দেখেননি।
ব্রজগোপাল কী ভেবে চেয়ারে ঠেসান দিয়ে বললেন—তা হলে তুমি তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। আমি বসছি।
—আপনি খাবেন না?
—আমি! ব্রজগোপাল ভারী অবাক হয়ে বললেন। মাথা নেড়ে বলেন—আমি তো স্বপাক খাই। নিরামিষ। খেয়েই এসেছি।
বীণা ভিতরের ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। তাকে ঘিরে ছানাপোনা। সবাই অবাক হয়ে ব্রজগোপালকে দেখছে। বীণা বলল—কিছুই খাবেন না?
সংকোচের সঙ্গে ব্রজগোপাল বললেন—খাওয়ার দরকার নেই। ওই ডানদিকেরটি বুঝি সুপ্রসন্ন? না, কি যেন ওর নাম রেখেছ?
বীণা লজ্জা পেয়ে বলে—মনোজিৎ, ছেলেকে একটু ঠেলা দিয়ে বলে—যাও, দাদুর কাছে যাও।
—এস দাদা। বলে হাত বাড়ান ব্রজগোপাল। তাঁর দুই গর্তে ঢাকা চোখে কী একটা অন্তর্নিহিত পিপাসা ঝিকিয়ে ওঠে। আপনজন! রক্তের মানুষ! উত্তরাধিকার!
ভয়ে ভয়ে বুবাই এক-পা দু-পা করে এগিয়ে আসতে থাকে। এই বুড়ো মানুষটা তার দাদু, সে জানে। কিন্তু পবিচয়হীনতার দূরত্বটুকু পার হতে সময় লাগে তার।
ব্রজগোপাল নিচু হয়ে ক্যাম্বিসের ব্যাগ তোলপাড় করে কাগজে মোড়া এক ডেলা আমসত্ত বের করে আনেন, একটা ঠোঙায় কিছু শুকনো কুল, আমসি, প্লাস্টিকের ঠোঙায় কিছু ক্ষোয়া ক্ষীর। নাতির হাতে দিয়ে বলেন—সবাই খেয়ো।
