রণেনের ঘুম এমনিতে ভালই। স্বপ্ন খুব কম দেখে। নেশারুর মতো ঘুম তার। আজ মনটা বড় খারাপ। সে একবার ঘুমন্ত বীণার গায়ে হাত রাখল। এই মেয়েমানুষটা তার। নিজস্ব। ঘাঁটাঘাঁটি খুব কম হয়নি, তবু কি সবটা চেনা হয়েছে! প্রতিদিন শ্বাসে শ্বাস মিলে যায়, উভয়ের মিলেমিশে তৈরি করা ওই সব সন্তান, তবু দু-জনের মাঝখানে সমুদ্রের ব্যবধান।
ঘুমন্ত বীণার শরীরের সর্বত্র তৃষিতের মতো হাত রাখে রণেন। ঘুমের মধ্যেই বিরক্তির শব্দ করে বীণা হাত সরিয়ে দেয়। একবার অস্ফুট স্বরে বলে—বড় গরম, উঃ!
অপ্রতিভ রণেন বলে—ঘুমোলে?
উত্তর পায় না। বাঁ-হাতের কবজির কাছটায় বড় যন্ত্রণা। ফুলে আছে, টাটাচ্ছে। একটু ডেটল বা কিছু লাগালে হত। পিনটা বের করার পর রক্ত পড়েছে অনেকটা। পেকে ফুলেটুলে ওঠে যদি! আঙুলগুলো কয়েকবার মুঠো করে রণেন। কবজি ঘোরায়, ব্যথা।
বীণা ঘুমন্ত অবস্থায় একবার পাশ ফেরে। তার একটা হাত এসে বুকের ওপর দিয়ে জড়িয়ে ধরে, একটা পা উঠে আসে তলপেটের ওপর। এই ঘুমন্ত আলিঙ্গনটা এখন বড় অস্বস্তিকর। রণেন চায়, এখন তার সঙ্গে কেউ জেগে থাকে। জেগে থেকে আদরে, ভালবাসায় তাকে ঘুম পাড়াক।
বাঁ-হাতির কবজির ওপরেই বীণার শরীরের ভার। হাতটা অবশ হয়ে আসছে। সরার জায়গা নেই। বীণা জেটির দড়ির মতো বেঁধে রেখেছে। ঘরে সবজে রঙের ঘুম-আলোটা জ্বালা আছে। সেই আলোয় একবার বীণার মুখটা দেখে রণেন। শরীর জুড়োলেই কি মেয়েমানুষের প্রয়োজন ফুরোয় পুরুষের কাছে! আর কি চাওয়ার আছে মেয়েমানুষের কাছে? বেশ দেখতে বীণা। মেয়েমানুষের যা যা থাকা দরকার সবই আছে। তবু যেন বেশি কিছু নেই।
রণেন একবার দুঃসাহসে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল—এই।
বীণা বলে—উঃ!
—সরে শোও।
বীণা পাশ ফিরে সরে যায়।
চারদিক থেকে রাতের শব্দ আসে। খাপছাড়া, হঠাৎ শব্দ সব। ইঁদুরের দৌড়-পায়ের আওয়াজ, ইঞ্জিনের ভোঁ, একটা ডাইনামোর আওয়াজ, কাশি, রাস্তায় পায়ের শব্দ, রিকশার ঘণ্টি, রাতচড়া মোটর চলে যাচ্ছে, বহুদূরে কোথায় লাউডস্পিকারে গান হচ্ছে। ঘুম হবে না।
রণেন উঠে মশারি থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরের ঘরে এসে শোওয়ার ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয় সাবধানে। আলো জ্বেলে রেডিয়োগ্রামের খোপে নিবিষ্ট হয়ে খুঁজতে থাকে একটা রেকর্ড। গতবারে খামখেয়ালে কিনেছিল, আছে কিনা কে জানে!
আছে। রবিঠাকুরের নিজের গলায় গাওয়া গানের রেকর্ডটা চাপিয়ে দিয়ে আস্তে ছেড়ে দিল রেডিয়ো। একটু খোনাসুরে, রিক্ত বার্ধক্যের গলায় বৃদ্ধ কবির গান হতে থাকে—অন্ধজনে দেহ আলো, মৃতজনে দেহ প্রাণ…
দুর্বল গলা, সুরের ওপর স্থায়ী হতে পারছে না, দম ফুরিয়ে যাচ্ছে। স্বাসবায়ুর শব্দ আসছে। তবু হাহাকার ভরা কেমন মরুভূমি ফুটে উঠছে চোখের সামনে। উদ্ভিদহীন এক রুক্ষ ধূসর পৃথিবীর ওপর হাঁটু গেড়ে বসেছে বয়সের ভারে ন্যুব্জ, শোকে তাপে জর্জরিত অপমানিত, অসহায় মানুষ। তার পোশাক ধুলোয় লুটোচ্ছে। ক্ষীণদৃষ্টি সে-মানুষ অস্পষ্ট আকাশের দিকে চেয়ে দুহাত তুলে বলছে—অন্ধজনে দেহ আলো, মৃতজনে…
রেকর্ডটা আবার ফিরিয়ে দেয় রণেন। চোখের জল মুছে নেয়। মানুষ যা ছিল তাই আছে। অন্ধ ও মৃত। আকাশের দিকে নিরন্তর বাড়ানো আছে তার দুই হাত। রবিঠাকুর গাও। রবীন্দ্রনাথ গাইতে থাকেন, কাঁপা কাঁপা, বুড়োটে গলায়, অশ্রুহীন শুষ্ক ক্রন্দনের মতো—অন্ধজনে দেহ আলো…
আর সেই শব্দে মুচড়ে ওঠে বুক। ঝলকে ঝলকে নিঙড়ানো বুক থেকে উঠে আসে চোখের জল। টাগরা ব্যথা করে, কান্নার দলা ঠেলে ধরে টনসিলকে। বয়স ভুলে, সংসার ভুলে, হঠাৎ সব ছদ্মবেশ ঝেড়ে ফেলে ধুলোয় লুটনো শিশুর মতো অসহায়ভাবে ‘মা’ বলে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করে। কেন কাঁদবে তা তো জানে না রণেন। কেন কাঁদবে? কোনও কারণ নেই। কিংবা হয়তো খুবই তুচ্ছ সেই কারণ। কেবল কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করে।
কয়েকবার রেকর্ডটা শুনল রণেন। আরও খারাপ হয়ে গেল। রাস্তায় কুকুরেরা ডাকছে। তাতে যেন আরও নির্জন লাগে কলকাতাকে। আরও ভয়াবহ। বৃশ্চিক রাশির শেষ জীবনটা নাকি ভাল কাটে না। কোষ্ঠীতে রণেনের রাশি বৃশ্চিক নয়, কিন্তু ইংরেজি একটা বইতে সে পড়েছিল, সায়ন মতে জন্মতারিখ অনুযায়ী তার রাশি বৃশ্চিক। শেষ জীবনে সে হয় পাগল হয়ে যাবে, অপঘাতে মারা যাবে। শেষ জীবনের এখনও অনেক দেরি। তবু কেন যে মনে পড়ে!
রাতে ভাল ঘুম হল না, রবিবার সকালটা বাজার করে এসে রণেন তার চার জোড়া জুতোর কালি লাগাল। বাথরুম ঘষল। গেঞ্জি, আন্ডারওয়্যার, টেরিলিন কাচল কয়েকটা। বাচ্চাদের সবকটাকে ধরে ধরে সাবান ঘষে স্নান করাল। কাজকর্মের মধ্যে মন-খারাপটাকে যদি ডুবিয়ে মারা যায়।
পাগল হয়ে যাব না তো! এই কথাটা সারাদিন ধরে মাঝে মাঝে মনে হয়। মরে যাব একদিন! ভেবে চমকে ওঠে সে। স্নানের ঘরে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করে রণেন। উৎকট শিস দেওয়ার চেষ্টা করে। গান গায়—অন্ধজনে দেহ আলো…সুরটা লাগে না। মেঠো সুরহীন। গলায় রামপ্রসাদী গানের মতো হয়ে যায় রবীন্দ্রসংগীত।
স্নান করতে করতেই জলের শব্দের মধ্যেই শুনল, কে যেন এসেছে। বাইরের লোকই হবে। কড়া নাড়ার শব্দ। সোমেন ফিরল বোধ হয় আড়া সেরে। না, সোমেন নয়। সোমেন হলে চেঁচাত। বীণা উঁচু বিরক্তির গলায় জিজ্ঞেস করল—কে? না জিজ্ঞেস করে বীণা দরজা খোলে না। দিনকাল ভাল নয়। ছোট ছেলেটাকে বোধ হয় খাওয়াতে বসেছে। ছুটির দিনে আত্মীয়স্বজনরা আসে। বাদুড়বাগানের সম্বন্ধী, কিংবা গড়িয়ার পিসি। তাদেরই কেউ হবে। ছিটকিনি খোলার শব্দ পেল রণেন। নীরস গলায় বীণা আগন্তুককে বলল—ঘরে এসে বসুন। তারপর বাথরুমের দরজার কাছে এসে বলল—শুনছ, বাবা এসেছেন।
