নাতির পিঠে একবার হাত রাখলেন। কোলে নিলেন না। অভ্যাস ভাল নয়। ফিরে গিয়ে মনটা আবার গর্ত খুঁড়বে। পিঠে হাতটা রেখে বললেন—যাও, মায়ের কাছে যাও।
খেয়ে নিতে একটুও সময় নষ্ট করল না রণেন। ঘরের মধ্যে তার হাঁপ ধরে আসছে। একটা ধুতি আর পাঞ্জাবি পরে বেরিয়ে এসে বলল—চলুন।
চেকটা টেবিলের ওপর পড়েছিল। ব্রজগোপাল সেটা সযত্নে ভাঁজ করে ভিতরের পকেটে রাখলেন। ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললেন—তোমাদের জমিটাও ওইখানেই?
—হ্যাঁ, জমিটাও দেখা হয়ে যাবে আপনার। রণেন বলে।
—আমি দেখে কী করব! তোমরা থাকবে, তোমাদের পছন্দ হলেই হল।
রণেন উত্তর দিল না।
বেরোবার মুখে দরজার কাছ বরাবর একটু দাঁড়ালেন ব্রজগোপাল। ইতস্তত করে বললেন—সোমেন এল না এখনও? রোজ এরকম বেলা করে নাকি!
বীণা হেসে বলে—কিছু ঠিক নেই।
—ভাল কথা নয়। অনিয়ম করে এ বয়সে শরীর ভাঙলে খুব বিপদ। চাকরিবাকরি কিছু হয়নি?
—না। বীণা উত্তর দেয়।
ট্যাক্সিতে বসে রণেন বলে—বাবা।
ব্ৰজগাপাল অন্যমনস্ক ছিলেন। উত্তর দিলেন না। কিন্তু হঠাৎ মুখটা ফিরিয়ে বললেন—ট্যাক্সিতে চড়ে পয়সা নষ্ট করো কেন? এ বয়সে আয়েশি হলে শরীর বসে যায়, মনটাও আলসে হয়।
—বাসে-ট্রামে চড়া যায় না। বড় ভিড়।
—তোমরাই ভিড় বাড়াচ্ছ। ভিড় তো তোমাদেরই। বলে আবার মুখটা বাইরের দিকে ফিরিয়ে বলেন—কলকাতায় যারা থাকে তারা ক্রমে মানুষকে ঘেন্না করতে শেখে। এ বড় পাপ।
রণেন আবার ডাকল—বাবা।
—উঁ! বলে ব্রজগোপাল মুখ ফেরালেন।
রণেনের তখন বড় লজ্জা করল। কী বলবে? বাবাকে তার কিছু বলার নেই। মুখে পান ছিল। গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল—বাড়িটা যদি হয় তো আমাদের কাছেই এসে থাকুন।
ব্রজগোপালের ভিতর যে অভিমানী কঠিন মানুষটির বাস সেই মানুষটিই যেন ঈষৎ উষ্মভরে জবাব দেন—কেন?
ঠিকই তো। কেনো? বাবা কেনো থাকবেন তাদের সঙ্গে!
ব্রজগোপাল আরও কিছুক্ষণ আলগা চোখে বাইরের দিকে কলকাতার অপসৃয়মান বাড়িঘর দেখলেন। গাড়ি আনোয়ার শা রোড ধরে শীলাদের বাড়ির গলির কাছাকাছি এসে পড়ল। ট্যাক্সি থামলে ব্রজগোপাল হঠাৎ চমকে উঠে বললেন—এসে গেলাম নাকি!
—হুঁ। রণেন নেমে ভাড়া দিতে দিতে বলে। এবং টের পায়, বাবা এখনও মায়ের সাহচর্যে আসতে কত লাজুক ও অপ্রতিভ হয়ে যান। বাবা ও মার মধ্যে তবে কি ভালবাসা আছে আজও?
॥ ছত্রিশ ॥
অজিত দরজা খুলে ভারী অবাক হয়। শ্বশুরমশাইকে তার বাড়িতে সে একদম প্রত্যাশা করেনি। তারওপর দুপুরের কাঁচা ঘুম থেকে উঠে এসেছে, ভারী থতমত খেয়ে গেল। এ সময়টায়, বিশেষত ছুটির দুপুরে সবাই ঘুমোয়।
ব্রজগোপালের মুখে-চোখে একটু অপ্রসন্নতার ছাপ। বললেন—আছে সবাই?
—আসুন। বলে দরজার পাল্লা হাট করে দিয়ে বলে অজিত—ঘুমোচ্ছে। ডাকছি।
ব্রজগোপাল ঘরে এসে বসলেন। চারদিকে চেয়ে-টেয়ে বললেন—ভালই।
অজিত সেন্টার টেবিল থেকে সন্তর্পণে তার সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার সরিয়ে নিচ্ছিল। ব্রজগোপাল সেটা নিশ্চয়ই চোখে দেখলেন। অজিত তাঁকে অন্যমনস্ক করার জন্য বলল—কী ভাল? বাড়ি?
ব্রজগোপাল মাথা নাড়লেন। বললেন—ঘরদোর তো বেশ বড় বড় দেখছি। কখানা?
—দুটো বেডরুম আছে দুদিকে। একটা প্যাসেজ, আর যা যা সব থাকে। বলে হাই তুলল।
রণেন একটু দূরে বসেছে। এতক্ষণে কথা খুঁজে পেয়ে বলল—ওরা দোতলা করে নীচের তলাটা ভাড়া দেবে।
ব্রজগোপাল উদাস গলায় বলেন—লাভ কী?
—বাড়ির কষ্টটা খানিকটা উঠে আসে।
—ভাড়াটেদের সঙ্গে থাকা সঙ্গত নয়। ব্রজগোপাল তেমনি নিশ্চিত স্বরে বলেন—বাড়ির বড় মায়া। পরমানুষ দেয়ালে পেরেক ঠুকলেও বুকে লাগে।
—আমিও ভাবছিলাম, বাড়িটা যদি হয় তো তিনতলার ভিত গেঁথে করব। একতলাটা ভাড়াটে, দোতলা আর তিনতলায় আমরা।
ব্রজগোপাল একবার ছেলের মুখ নিরীক্ষণ করলেন। তারপর মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে বললেন—তোমরাই থাকবে, তোমাদের যা ইচ্ছে।
অজিত ভিতরের ঘরে এসে দেখে শীলা এক কাত হয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছ। এ সময়টায় চেহারা রুক্ষ হয়ে যায়, মুখে মেচেতার মতো দাগ পড়ে। চোখ বসা, কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে আছে। কিছু পেটে রাখতে পারে না, সব উলটে বের করে দেয়। তা হোক। তবু পেটের বাচ্চাটিকে ধরে রাখতে পেরেছে। নষ্ট হয়নি শেষ পর্যন্ত। ঘুমন্ত শীলাকে ডাকতে বড় মায়া হয়। পাশেই শাশুড়ি ঠাকরুন গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছেন। ঘুমের মধ্যেও মাথায় ঘোমটা।
অজিত গলাখাঁকারি দিল। শাশুড়িকে মা বা শ্বশুরকে বাবা বলে ডাকার অভ্যাসটা তার এখনও হয়নি? শীলা সেজন্য রাগ করে। বলে—তোমার মা-বাবাকে আমি মা বাবা ডাকতে পারি, আর তুমি আমার মা-বাবাকে পারো না? অজিত অবশ্য ঝগড়া করে না, কিন্তু ডাকেও না।
অজিত গলাখাঁকারি দিতেই অবশ্য ননীবালা মুখখানা সন্তর্পণে তুলে বললেন—কে এসেছে? বাইরের ঘরে আওয়াজ পাচ্ছি।
অজিত ইতস্তত করে বলে—উনি।
ননীবালাকে আর বলতে হল না। বুঝলেন। যেন উনি বলতে বিশ্বসংসারে একজনই আছে। শীলাকে একটু ঠেলা দিয়ে বললেন—ওঠ্।
শীলা আদুরে ঘুম-গলায় বলে—উঁ।
—উনি এসেছেন। উঠতে হয়। তোর বাড়িতে প্রথম এলেন।
ঘুম থেকে উঠলেই একটা সিগারেটের তেষ্টা পায়। অজিত তাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট টেনে নিতে থাকে দ্রুতবেগে। পরশুদিন একটু বৃষ্টি হয়েছিল। সামান্য বৃষ্টিতেই সামনের রাস্তার ধুলো ধুয়ে পাঁজর বেরিয়ে পড়েছে। খাটালের জমানো গোবরের টাল থেকে পচাটে গন্ধ আসে। ওপরে ধুলোটে আকাশ। ফরসা রোদ। শুকনো গরম হাওয়া দিচ্ছে। বহু ওপরে আকাশের গায়ে দাগের মতো বড় পাখি চিল বা শকুন উড়ছে। ভারী নিরালা দুপুর। আকাশে চড়ানো ডানামেলা পাখি, রোদ, বিস্তার দেখে অজিতের মনটাও নিরালা হয়ে যায়। আত্মীয়স্বজন আজকাল তার ভাল লাগে না। আগেও লাগত না। মা বাবা ভবানীপুরের সংসার ছেড়ে এসে আরও নিষ্ঠুর হয়ে গেছে সে। বাড়িতে আত্মীয় এলে তার অকারণ উৎপাত মনে হয়। কথা বলতে হবে, সামনে গিয়ে বসে থাকতে হবে, সিগারেট লুকোতে হবে। কিংবা আবার ভদ্রতা রক্ষার জন্য কখনও-সখনও যেতে হবে তাদের বাড়িতেও। ভাবতেই ক্লান্তি লাগে। নিজের মতো নিরালা জীবন পাওয়াটাই সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার কাছে।
