ছটা বাজে। বাইরে এখনও বেশ রোদ। বাইরে এসে বুক ভরে শ্বাস নেয় রণেন, কিন্তু তবু একটা শ্বাসরোধকারী কী যেন কাজ করছে ভিতরে! ভয়? নিরাপত্তার অভাব? মৃত্যু?
মনটা ভারী খারাপ লাগতে থাকে। শরীরটাকে কয়েকবার ঝাঁকি দেয় রণেন, হাতের ব্যাগটা দোলায়। মনটাকে হালকা করে দেওয়ার জন্য মুখ ছুঁচলো করে শিস্ দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। উৎকট শ্বাসবায়ুর শব্দ বের হয়। লম্বা লম্বা সব বাড়ির ছায়ায় হাঁটে। ধুলোটে গরম হাওয়া দিচ্ছে, নাকে ধুলোর গন্ধ। উদ্ভিদহীন, শান বাঁধানো কলকাতা নির্মম তাপ বিকীরণ করছে। একটা পাম্পসেটের দোকানের শো-কেসের সামনে দাঁড়াল রণেন। কাচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। গায়ে কলকা ছাপ, টেরিকটনের বুশ শার্ট, পরনে চেক প্যান্ট, পায়ে দামি জুতো। তবু চেহারাটা লোকাল ট্রেনের ফেরিঅলার মতো কেন যে লাগে!
মনটা খারাপ। মনটা বড্ড খারাপ। কেবলই মনে পড়ে, মলিন অফিস ঘরে ছুটির পর নিরালায় বসে ঘোষ আঁক কষছে। একটা সময় আসে যখন আয়ুটাকে ফালতু সময় বলে মনে হয়। না? আর আসে একাকীত্ব! মৃত্যু!
অনেকে আছে, মন খারাপ থাকলে একা থাকতে ভালবাসে। নিরালায় ছাদে-টাদে গিয়ে চুপচাপ থাকে। রণেন সেরকম নয়। তার উলটো। মন খারাপ থাকলে তার খুব ইচ্ছে করে কোনও আপনার জনের কাছে গিয়ে বসে, আদর খায়, ভরভর করে অনেক কথা বলে।
সন্ধ্যাবেলা বাসায় ফিরে এল রণেন। মা নেই। গত তিন মাসে মা এই নিয়ে বারচারেক শীলার বাড়িতে গিয়ে থাকছে। এই সময়টায় সোমেন থাকে না। বড় ছেলেমেয়ে দুজন বাইরের ঘরে ছোকরা মাস্টারের কাছে পড়ছে। নতুন রাখা হয়েছে টিউটরটিকে, ফালতু পঞ্চাশ টাকা চলে যাচ্ছে মাসে মাসে। সোমেনই পড়াতে পারে, পড়ায় না। সংসারের সবাই বড় উদাসীন রণেনের প্রতি, এমন মনে হয়।
টুবাই সন্ধেয় ঘুমোয়। শোওয়ার ঘরে মশারি ফেলা। রণেন ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালতেই নাইলেক্সের মশারির ভিতর থেকে বীণা ঘুম চোখে আলো লাগাতে চোখ পিট পিট করে বলে—আঃ নেবাও না। ছেলেটা এইমাত্র ঘুমিয়েছে, উঠে পড়বে।
ভারী অপমান বোধ করে রণেন। বড় সহজেই বীণা আজকাল তাকে ধমকায়। মনটা ভাল নেই বলে অভিমানটা যেন আরও গাঢ় হয়ে মেঘলা করে দিল মনটা। রণেন সবুজ রঙের ঘুম-আলোটা জ্বেলে বড় আলো নিবিয়ে দিল। লুঙ্গি পরতে পরতেই অভিমানটা খসে গেল খানিক। ডাকল—বীণা।
—উঁ।
—শুয়ে কেন? বেরিয়ে এস।
—চা চাই নাকি!
—সে পরে হবে। এখন তোমাকে চাই।
—হঠাৎ এত প্রেম?
এটাও অপমান। রণেন ড্রেসিং টেবিলের সামনে টুলে বসে আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে একটা সিগারেট ধরাল। এই কায়দায় অশোককুমার সিগারেট ধরাত একসময়ে। বিছানায় বীণার শাড়ির আর গয়নার শব্দ উঠল। বসে খোঁপাটা বেঁধে নিল। অনেকখানি আঁচল বিছানায় রেখে বেরিয়ে এল, তারপর শ্লথ হাতে অফুরান আচলটা টেনে আনতে থাকল বিছানা থেকে।
রণেন বাইরের ঘরের দিককার দরজাটা বন্ধ করে দিল উঠে।
বীণা বলল—ও কী! বাইরের লোক রয়েছে, কী ভাববে?
কাম নয়, একটা তীব্র সঙ্গলিপ্সায় আকুল রণেন দু-হাতে জাপটে ধরল বীণাকে, প্রথম প্রেমিকের মতো কাঁপা গলায় পুরনো বউকে ডাকল—বীণা!
—ইস্! কী যে করো না! বীণা রোগাটে হলেও গায়ে জোর কম নয়। দু-হাতে ঝটাপটি করে ছাড়িয়ে নিল।
—তোমাকে আমার ভীষণ দরকার। রণেন হাঁফসানো গলায় বলে।
—রাতে হবে। বীণা নিস্পৃহ গলায় বলে।
—সে সব নয়। এমনি এসো, কাছাকাছি জড়াজড়ি করে বসে থাকি। কথা বলি।
বিরক্ত হয়ে বীণা বলে—কিছু খেয়েছ নাকি!
বলে কাছে এসে মুখটুখ শুঁকে বলে—না তো! তবে হল কী?
আকুল দু-হাতে আবার ভালুকের মতো তাকে চেপে ধরে রণেন—শোনো। আমার কোনও কথা তুমি আজকাল শুনতে চাও না। বড় সংসারী হয়ে গেছ বীণা। আজ একটু বোসো।
বীণা বলে—ধ্যেৎ। বলে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। বলে—দরজাটা খুলে দাও। খুব বিশ্রী দেখাচ্ছে। ছেলেটা কি না জানি ভাবছে! তুমি একটা কী বলো তো!
বীণা দরজাটা খুলে দেয়। বাইরের ঘরের স্টিক লাইটের আলো পরদার ফাঁক দিয়ে ঘরে এসে পড়ল। বীণা গেল রান্নাঘরে। আয়নার সামনে বসে রইল রণেন। অ্যাশট্রের ওপর রেখে দেওয়া সিগারেটটার কথা ভুলে গিয়ে নতুন একটা সিগারেট ধরিয়ে নিল। অন্য সিগারেটটা ধূপ কাঠির মতো জ্বলতে থাকল একা-একা।
ঘোর সবুজ আলোয় ঘরটা কেমন ভৌতিক দেখাচ্ছে এখন। প্রাচীন অরণ্যের অন্ধকারে একটা ধ্বংসস্তূপ। পাখার হাওয়ায় মশারি কাঁপছে। ঢেউ দিচ্ছে। আয়নায় তার আবছা প্রতিবিম্ব। কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগে সব কিছু। কেমন যেন রোজকার মতো নয়। বুকটা ফাঁকা। গায়ে ঘাম। সিগারেটের ধোঁয়ার কর্কশ গন্ধ। রণেনের মাথার ভিতরটা ক্রমে পাগল-পাগল হয়ে যাচ্ছে।
তাড়াতাড়ি উঠে বড় আলোটা জ্বালল রণেন। জানালার কাছে দৌড়ে গিয়ে বাইরের বাতাস টানল। অস্থিরতা। তার নিজের মানুষ যেন কেউ নেই পৃথিবীতে। এমন কেন লাগছে। উজ্জ্বল আলোয় নিজের হোঁৎকা শরীরের প্রতিবিম্বের দিকে আয়নায় চেয়ে থাকে রণেন। তীব্র একটা ঘেন্না হয় লোকটাকে।
একটা সেফটিপিন পড়ে আছে টেবিলের ওপর। কিছু না ভেবে সেটা তুলে নিল রণেন। এবং দাঁতে দাঁত ঘষে আচমকা খোলা সেফটিপিনটা বসিয়ে দিল বাঁ হাতের কবজির ওপর। ক্যাঁচ করে ঢুকে গেল সেটা। প্রথম একটা তীক্ষ্ণ ব্যথা, তারপর হাতটার একটা অবশ ভাব। গাঁথা সেফটিপিনটা তুলল না রণেন। একটু পরে দুই বিন্দু রক্ত উপচে এল। চেয়ে রইল সে, একা ফাঁকা অফিসঘরে ঘোষ বসে আঁক কষছে, ছুটির পর কিছু করার নেই…কোথাও যাওয়ার নেই! মানুষ এরকম অবস্থা সহ্য করে কী করে? মাথাটা ঘুলিয়ে ওঠে আবার। মৃত্যু! একা! কেউ নেই।
॥ পঁয়ত্রিশ ॥
চুপ করে জেগে শুয়েছিল রণেন। পাশে বউ বীণা। ওপাশে বাচ্চারা। পাঁচ বাই সাত খাটে জায়গা হয় না বলে দেয়ালের দিকে একটা বেঞ্চ খাটের সঙ্গে জোড়া হয়েছে। বেঞ্চটার পায়ায় দোষ আছে। বাচ্চাদের কে একজন ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করছে। কৃমি। পাশ ফিরতেই বেঞ্চটায় মচাং শব্দ হল। রাস্তায় ঘেয়ো কুকুররা ঝগড়া করছে। সোমেনের ঘরে পুরনো পাখার একটা খটাং খটাং শব্দ হয়। এ সব রণেন একা শোনে। বিশ্বসংসার ঘুমোয়।
