—নিজের নামে? কিন্তু ইনকাম ট্যাক্স…
ঘোষ মুখ না তুলেই বলে—ইনকাম ট্যাক্স, অ্যান্টি করাপশ্যান, আর বউ, এ তিনের মধ্যে বউ সবচেয়ে ডেঞ্জারাস। পুরুষমানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু।
রণেনের ঘেমো শরীরে গরম ছুঁড়ে একটা শীত এসে লাগে। কথাটা মনের মতো। সে বলল—আমার বউ…
ঘোষ কথাটা শেষ করতে দিল না, তেমনি ছোট ছেলের আঁক কষতে কষতে বলল—ও জানি। সব্বার বউয়ের গল্পই একরকম। নারীরাই এখন লড়ছে ভাল৷ পুরুষসিংহের বড় অভাব।
রণেন উঠতে উঠতে বলে—কিন্তু লকারের ব্যাপারে একটা ভাবনায় ফেলে দিলেন ঘোষদা। এখন মনে হচ্ছে, লকার তেমন সেফ নয়।
ঘোষ হাসল। এই বয়সেও ভাল চেহারা, লম্বা—ফরসা। একহারা। চোখেমুখে ভাল বংশ এবং বুদ্ধির ছাপ আছে। সেই সঙ্গে একটু ক্লান্তিও। লাল ঠোঁট চিরে একটু হাসল, বলল— মানুষকে ভয় দেখানোটা আমার হবি, যেমন হচ্ছে ছেলের অঙ্ক কষা। ওসব কিছু নয়। সবাই রাখছে, আপনিও রাখবেন। বউয়ের নামে যে এককাঁড়ি নিন্দেমন্দ করলাম সেও কি সব সত্যি? ভড়কে দেওয়ার জন্য বলি। এই যে অফিস ছুটির পর বসে অঙ্ক কষছি, বউ থাকলে পারতাম? বুড়োগুড়ো, কালো-কুচ্ছিৎ যাইহোক, বউ বেঁচে থাকলে ঠিকই সংসারের দিকে, বাসার দিকে একটা টান থাকত। ওই টানটুকুর জন্যই সংসারী, নইলে সব ব্যাটা সন্ন্যাসী।
ঘোষ আবার কিছুক্ষণ নীরবে অঙ্ক কষে। বিরক্তিকর। রণেন বুকের বোতাম খুলে গেঞ্জি ফাঁক করে ভিতরে হাওয়া ঢোকানোর চেষ্টা করে। বড্ড গরম।
ঘোষ বলে—কিন্তু মেয়েছেলেদের উলটো। বউ মরলে পুরুষে যেমন একাবোকা হয়ে যায় আমার মতো, মেয়েদের তা হয় না। বুক চাপড়ে কাঁদেটাঁদে প্রথমটায় ঠিকই, তারপর আবার হামলে সংসার করে, ছেলেপুলে, নাতি-নাতনি টানে। ভুলে-টুলে যায় তাড়াতাড়ি।
—আজ উঠি।
—বাজে বকছি, না? টাকা-পয়সা কেমন করেছেন?
—দূর! কই? বলে রণেন লাজুক হাসে।
ঘোষ একপলক তাকিয়ে দেখে নেয়। মুখটা নামিয়ে নিয়ে বলে—খবরটবর সব পাই। করুন না দোষের কিছু তো নয়। লোকের হাতে আজকাল অঢেল টাকা। বাজারে কোনও জিনিস পড়ে থাকে না, তা সে যত দামই হোক। দোকান-পসারও কত বেড়ে গেছে দেখেছেন? কত বাহারি শোকেস? লুকনো টাকা ধরার ফাঁদ। তবু কেন যে লোকে দেশের দুরবস্থার কথা বলে! ওপর ওপর কিছু ফালতু লোক না খেয়ে মরছে, কিন্তু মোটের ওপর মানুষ সুখেই আছে। নাকি! বলে ফের অঙ্কটা একটু করেই বলে ওঠে—ওই যাঃ!
—কী হল?
ঘোষ খুব হতাশার সুরে বলে—অঙ্কটা মিলে গেল।
—ভালই তো।
ঘোষ খুব বিমর্ষভাবে মাথা নেড়ে বলে—হুঁ।
তার ভ্রূ কোঁচকানো মুখ দেখে পরিষ্কার বোঝা যায় যে ঘোষ খুশি হয়নি। অঙ্কর সঙ্গে আর কিছুক্ষণ লড়ালড়ির ইচ্ছে ছিল বোধ হয়। টেবিলের টানা খুলে একটা ছেঁড়া-খোঁড়া পুরনো টেস্ট পেপার বের করে পাতা উলটে আবার অঙ্ক খোঁজে ঘোষ।
রণেন বলে—আপনি তো এখন অঙ্ক কষবেন। আমি উঠি।
—আরে কেবল উঠি-উঠি করছেন কেন? বসুন না। ঘোষ বলে।
—একটু খোলা হাওয়ায় যাই, এখানে বড় গরম। বলে রণেন মাথার ওপর সিলিং ফ্যানটার দিকে চেয়ে বলে—আজকাল যে কেন ফ্যানগুলোর হাওয়া হয় না?
—ফ্যানের দোষ নেই, ওটা টাকার গরম। বলে ঘোষ হাসল।
ঠাট্টা বিদ্রূপ করলেও এই ঘোষ লোকটাই বরাবর রণেনকে বুদ্ধিটুদ্ধি দেয়। ভারী ঠান্ডা মাথা। রিটায়ারমেন্টের কাছাকাছি এসে এখন একটু নিস্পৃহ হয়ে গেছে। মনের মতো একটা অঙ্ক বুঝি খুঁজে পেল ঘোষ। কাগজে সেটা টুকতে টুকতে বলল—জমি জায়গা করেছেন?
রণেন বিমর্ষভাবে বলে—এখনও নয়। তবে টালিগঞ্জে খানিকটা জমি মায়ের নামে।
ঘোষ সবিস্ময়ে চোখ তুলে বলে—মায়ের নামে! আপনি তো দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ! আজকাল কেউ মায়ের নামে জমি করে?
রণেন বাধা দিয়ে বলে—না না। বাবা টাকা দিচ্ছেন।
—বাবা বেঁচে আছেন এখনও? বলে লাল ঠোঁট চিরে এরকম গা-জ্বালানো হাসি হেসে ঘোষ বলে—ভারী অন্যায়।
ঘোষ ব্রজগোপালকে চেনে। এক ডিপার্টমেন্টে কিছুকাল একসঙ্গে কাজ করেছে। ব্রজগোপালকে যারা চেনে তাদের সামনে রণেন একটু অস্বস্তি বোধ করে।
ঘোষ অঙ্কের দিকে চেয়েই বলে—উনি টাকা পেলেন কোথায়?
—পলিসির টাকা।
ঘোষ একটা নিশ্চিন্ত হওয়ার শ্বাস ছেড়ে বলে—তাই বলুন। হঠাৎ ব্রজগোপালদার টাকার কথা শুনে চমকে গিয়েছিলাম। ওরকম মানুষের তো বাড়তি টাকা থাকার কথা নয়। সারাজীবন অন্যের ফাইফরমাস খাটতেন, এটা-ওটা কিনে এনে দিতেন কলিগদের, কিন্তু কখনও কারও টাকা নিজের বা অন্য কারও টাকার সঙ্গে মেশাতেন না, সব আলাদা রাখতেন। বলতেন মেশালে সূক্ষ্মভাবে গো-বিটউইন হয়। মনে নাকি একটা দ্বন্দ্বীবৃত্তি আসে। বলে ঘোষ নিঃশ্বাস ফেলে হাসল—এ টোটাল মিসফিট। তবু ওরকম দু-চারজন লোক বেঁচে আছেন বলেই এখনও চন্দ্রসূর্য ওঠে।
রণেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। একটু অস্বস্তি হতে থাকে। একটা ঘুমন্ত আবেগ হঠাৎ বুকের মধ্যে ধড়ফড় করে জেগে উঠতে চায়। যার বাবা সৎ সে কত ভাগ্যবান। ভাবতেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। সে উঠে দাঁড়ায়।
—চললেন? ঘোষ জিজ্ঞেস করে।
—চলি। আপনি যাবেন না?
ঘোষ উদাসভাবে বলে—কোথায় যাব? বসে বসে অঙ্কটা কষি। একটু বাদে দারোয়ানরা বন্ধ করতে আসবে, তখন উঠে পড়ব।
ঘোষ আবার অঙ্কের মধ্যে ডুবে যায়।
বড় ঘরটা পার হয়ে দরজার কাছ বরাবর এসে একটু তাকিয়ে দেখে রণেন। সারি সারি খালি টেবিল। ফাঁকা ঘরে একা ঘোষ বসে আছে এতটুকুন হয়ে। অঙ্ক কষছে। হঠাৎ ভিতরটায় একটু চমকা ভয় জেগে ওঠে। মনে পড়ে বুড়োবয়েস, একাকীত্ব। মনে পড়ে মৃত্যু। মাথাটা একটা টাল খায়। ভারী ব্যাগটা একহাতে ধরে রেখেই কষ্টে একটা সিগারেট জ্বালে রণেন। ঘোষের সামনে খায় না, বাবার কলিগ ছিল। সিগারেটের ধোঁয়া ভিতরে যেতেই একটু অন্যরকম লাগে।
