—তবে গেলে কেন?
অণিমা তেমনি সুন্দর হেসে মৃদু গলায় বলল—বিয়ের আগে শরীর সারাতে।
সোমেন সিগারেট ধরিয়ে বলে—তোমার শরীর সেরেছে অণিমা।
অণিমা লজ্জা পেল। মুখ নামিয়ে নিল।
তারপর বলল—কিন্তু তুমি রোগা হয়ে গেছ সোমেন। কেন?
—কী জানি! সোমেন উত্তর দিল।
ভিতর থেকে কে এসে ডাকল—অণিমা!—যাচ্ছি। অণিমা তাকে বলল। তারপর সোমেনের দিকে চেয়ে বলল—যাই সোমেন।
—আচ্ছা। বলে হাসে সোমেন—দেখা হবে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
অণিমা মৃদু হাসল। কী লাজুক, সুন্দর হাসি। সেই ইয়ারবাজ মেয়েটার চিহ্ন আর নেই ওর কোথাও।
ফুটপাথে দাঁড়িয়ে সিগারেটটা শেষ করল সোমেন। হাঁটতে হাঁটতে আজও যেন আবার সোমেনের রাস্তা ফুরোয় না। সময় কাটে না।
একটা লাইন আজকাল প্রায়ই অকারণে মনে পড়ে সোমেনের। প্রতিশোধ, প্রতিরোধ, প্রতিবাদ, কমরেড, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো ব্যারিকেড।
রিখিয়াদের দেয়ালে কে এই লাইনটা লিখেছিল কে জানে! যে লিখেছিল সে কি বেঁচে আছে! না কি মুক্তি সংগ্রামের হাওয়ায় ছেঁড়া পোস্টারের কাগজের মতো উড়ে গেছে দুনিয়া ছেড়ে! ওই স্লোগান এখন কেউ আর লক্ষও করে না দেয়ালটায়। কিন্তু লাইনটা বড় আশ্চর্যভাবে বেঁচে থাকে সোমেনের মধ্যে। অকারণে মনে পড়ে। চারদিকে গতিময়, ক্ষিপ্র কলকাতা বয়ে যায়। কর্মহীন সোমেনের অলসভাবে চলতে-ফিরতে হঠাৎ ওই লাইনটা মনে পড়ে যায়।
জীবনের সুখী সুন্দর দিনগুলি বুঝি শেষ হয়ে এল!
॥ চৌত্রিশ ॥
ব্যাঙ্কের লকারের জন্য বহুদিন আগে দরখাস্ত করে রেখেছিল রণেন। তিন-চারটে ব্যাঙ্কে। আজ ব্রাবোর্ন রোডের একটা ব্যাঙ্কে খোঁজ নিয়ে জানল, বীণা লাহিড়ির নামে একটা লকার পাওয়া যাবে সামনের মাসে। লকার নিয়ে আজকাল বড় কাড়াকাড়ি। সকলেরই কিছু না কিছু লুকনো টাকা, সোনাদানা বা গয়নাগাটি আছে।
আজ শনিবার। অফিসে কাজ ছিল না। একটা ইনস্পেকশন রিপোর্ট দিয়ে আসবার সময়ে বুড়ো রামসদয় ঘোষকে খবরটা দিল। ফাঁকা অফিস। সবাই চলে গেছে। কেবল ঘোষ বসে বসে একটা আন-অফিসিয়াল অঙ্ক কষছিল। মুখ তুলে বলল—ছেলেটা কাল রাতে টেস্টপেপার থেকে অঙ্কটা কষতে গিয়ে পারেনি। তাই আমি অফিসে নিয়ে এসেছি। কেউ পারল না সবাইকে দেখিয়েছি। আমি সারাদিন ধরে বার দশেক করলাম।
ঘোষকে প্রায়ই এরকম আফিসে বসে অঙ্ক কষতে দেখেছে রণেন। ওটা ঘোষের নেশা। রণেন হেসে বলে—তাই বলুন। আমি ভাবছিলাম অফিসের কাজকর্ম।
—নাঃ। অফিস আবার কী! এ বছরই রিটায়ারমেন্ট, ডিসেম্বরে। ত্রিশ বছর ঢের কাজ করেছি। এবার ছোট ছেলেটাকে দাঁড় করাতে পারলে নিজের কাজ হবে।
টেরিলিনের জামাকাপড় পরলে বড় ঘাম হয়। এ গরমে সবচেয়ে আরামের হল ধুতি পাঞ্জাবি, নয়তো সুতির জামাকাপড়। বীণা সে সব পাট চুকিয়ে দিয়েছে। টেরিলিনের জন্যই পাখার তলায় বসেও রণেন ঘামে। একটা পাতলা ফাইল তুলে হাওয়া খেতে খেতে বলল—লকারটা পেয়ে গেছি।
—লকার? ব্যাঙ্কের নাকি? বলে অন্যমনস্ক ঘোষ মাথা নাড়ে—সে তো বড়লোকি ব্যাপার।
মনে মনে রণেন বলে—তাই তো, সেটা বুঝতে দেরি হয় কেন রে শালা? মুখে বলল—না না। আজকাল যা চুরি-ছিনতাই গেরস্থরাও লকার রাখে। সেফ।
—সেফ আবার কী! একটা চাবি তো ম্যানেজারের কাছে থাকে শুনেছি।
—তা থাকে। তাও সেফ।
মাথা নেড়ে ঘোষ বলে—ধরুন, লকারে গিয়ে যদি একদিন দেখেন যে, টাকাপয়সা সোনাদানা সব হাওয়া, তখন কী হবে? ব্যাঙ্ক ক্ষতিপূরণ দেবে?
—না, তেমন নিয়ম নেই।
—তবে! সে আবার কী! চাবি যখন ওদের কাছে থাকে তখন একটা ডুপ্লিকেট করে রাখলে আটকাচ্ছে কে! চাবি-দাওয়া যখন চলবে না তখন সিকিউরিটি কী থাকল! তার ওপর পুলিশ এসে জোর করে খেলে আজকাল, সেও ফ্যাসাদ।
রণেন একটু দ্বিধায় পড়ে।
ঘোষ অঙ্কটা কষতে কষতে না তাকিয়েই বলে—সবচেয়ে ভাল হল লোহার সিন্দুক। লকার কি বউমার নামে নিলেন নাকি?
—হুঁ।
—ভাল। স্ত্রী কৈবল্যদায়িনী। এ যুগটা বউদেরই যুগ। সবাই বউয়ের নামে সব করে। আমার বউটা বেঁচে থাকলে আমিও তার নামে কিছু না কিছু করতাম।
রণেন অবাক হয়ে বলে—কিছু করেননি?
—কী করব? তিলজলায় খানিকটা জমি কিনেছিলাম বউয়ের তাগিদে, যেদিন ভিত পুজো সেদিনই সুট করে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেল। অলক্ষণ দেখে জমি বেচে দিই, আর কিছু করিনি।
—রিটায়ারমেন্টের পর?
—ছেলেরা আছে। তবে বল-ভরসা কেউ নয়। বড় দুজন বিয়ে শাদি করে বউ চিনেছে। ভরসা ছোটটা, তা এও বড় হয়ে হাতে হারিকেন ধরিয়ে দেবে। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাটা তাই মুঠো করে বসে থাকব, সেই টাকার জোরে যা সেবাযত্ন পাই পাব। বুড় বয়েস বউ না থাকলে ভারী মুশকিল। জোর খাটানো, রাগ দেখানোর মানুষ থাকে না। অথচ কেরানি-টেরানির তো এই বুড়ো বয়সটাই খিটকেল মেজাজের বয়স। তখন মনের মধ্যে নতুন রাগ অভিমানের দাঁত গজায়, কিন্তু বউ না থাকলে কামড়ানোর কিছু থাকে না। ভারী মুশকিল।
লকার পাওয়ার যে আনন্দটা ছিল তা যেন হঠাৎ নিবে গেল রণেনের। মানুষের মুশকিল, নানুষ মরণশীল। দূর ভবিষ্যতের একটা অচেনা, অজানা, একাকীত্বের ছবি ভেবে কেন যে শিউরে উঠল রণেন। হঠাৎ মনে হল, লকার-টকার এ-সব মিথ্যে প্রয়োজন। সিকিউরিটি কোথাও নেই।
উঠতে যাচ্ছিল, ঘোষ অঙ্কটা কষতে কষতেই বলল—বউয়ের নামে সর্বস্ব উচ্ছুগ্যু করবেন, তাতে মাগিদের বড় তেল হয়। এদিক-ওদিক নিজের নামেও কিছু রাখবেন।
