সোমেন মুখটায় বিরক্তভাব করে বলে—জ্বালাতে এলি।
—আহা, আমি বুঝি সব সময়ে জ্বালাই।
—জ্বালাস না? সেবার লাইটহাউস থেকে তোর জন্য উঠে আসতে হয়েছিল মাঝপথে, মনে নেই?
—আহা। সে তো ড্রাকুলার ছবি দেখে ভয় পেয়ে চিৎকার করেছিলাম বলে!
—ব্যাপারটা একই। হয় ভয় পাবি, নয়তো হাসবি, নাহলে কেবল বক বক করবি। চুপ করে থাকতে পারিস না কেন?
—পেট ফুলে ওঠে যে! দু-তিনঘণ্টা চুপ করে থাকা সোজা কথা?
পিছন থেকে কে আবার বলে—আস্তে। একটু আস্তে হোক।
সোমেন পুর্বার দিকে চেয়ে বলে—ওই শোন।
পূর্বা মুখে রুমাল চাপা দিয়ে হাসতে থাকে। সোমেন চাপা স্বরে বলে—পেট ফুলে উঠলে অ্যান্টাসিড খাস।
পূর্বা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। মঞ্চের একদিকে অন্ধকার, অন্যদিকে আলো। আলোতে নায়িকার ভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছে অপালা। অন্ধকারে আবছা দেখা যাচ্ছে মিহির বোসকে, সে নায়ক। নায়িকা দায়ী করছে নায়ককে, পৃথিবী থেকে সবচেয়ে সুন্দর জিনিস জ্যোৎস্নাকে হরণ করার জন্য। বলছে, সে নাকি আত্মহত্যা করবে। কারণ জ্যোৎস্নার অভাবে তার ভিতরকার ভালবাসা মরে যাচ্ছে।
পূর্বা হঠাৎ চাপা স্বরে বলল—পিছনের লোকটা কী বলছিল রে? আস্তে, একটু আস্তে হোক। কী হওয়ার কথা বলছিল?
—জিজ্ঞেস করে আসব?
—ধ্যুৎ। তুই বুঝি জানিস না?
অন্ধকারেই সোমেন পূর্বার দিকে একটু তাকায়। বলে—খুব পেকেছ খুকি!
মঞ্চে হঠাৎ মাকবেথ নাটকের একটা সংলাপের অনুকরণে হাহাকার করে ওঠে অপালার তীব্র গলা—তুমি চাঁদকে হত্যা করেছ, তাই তুমি কোনওদিন কারও ভালবাসা পাবে না।
অন্ধকারে মঞ্চের অন্য ধারে মিহির বোস একথা শুনে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে—ভালবাসা! ভালবাসা নিয়ে কী হবে। আমার গলায় মহামূল্য চাঁদ। কে ভালবাসা চায়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী-সমস্যা ম্যাক্সের এখনও মেটেনি। সে আবার তার নীল ফসফরাস জ্বালা চোখে চেয়ে বলল—অল অফ ইউ আর ইটিং আউট অফ পি-এম’স হ্যান্ড, ইজনট ইট? ভারতে যদি পি এম না থাকে কোনওদিন, তা হলে তোমাদের কী হবে সোমেন?
ডান কানে ঝুঁকে পূর্বা তখন বলল—পেকেছিই তো। বড়দের দেখে ছোটরা শেখে। তোমাদের সব ব্যাপার-স্যাপার জানি মশাই।
গুল। পূর্বা কিছু জানে না। জানলে কেঁদে ভাসাত। তবু একটু চমকে ওঠে সোমেন, মঞ্চে নায়িকার ভালবাসার সংকট, বাঁ পাশে ম্যাক্সের প্রধানমন্ত্রী ধাঁধাঁ থেকে সরে এসে সে পূর্বার দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে—কী জানিস?
পূর্বা ঠ্যাং নাচিয়ে নিরুদ্বেগ মুখে বলে—এভরিথিং।
সোমেনের বিশ্বাস হয় না। অণিমা যেদিন তাকে চুমু খায় সেদিন ঘরটা অন্ধকার ছিল এবং কেউ তাদের অনুসরণ করেনি। তবু বুকটা কেঁপে ওঠে। দরজাটা বন্ধ করেনি অণিমা, সে কি ইচ্ছে করে?
সোমেন প্রসঙ্গটা পাশে সরিয়ে হঠাৎ বলল—আমরা বুঝি তোর চেয়ে বয়সে বড়! আর তোমার বুঝি এখনও দাঁত ওঠেনি!
পূর্বার ঠ্যাং নাচানো বন্ধ হয়, চোখ ফিরিয়ে সোমেনের দিকে চেয়ে বলে—কে, বলেছে আমি ছোট?
—এই যে বললি বড়দের দেখে ছোটরা শেখে! তুই কি ছোট?
পূর্বা সঙ্গে সঙ্গে কাঁদো-কাঁদো হয়ে বলে—কখন বললাম! এ মা! যাঃ!
—বলেছিস।
একটা হাত কাঁধে এসে পড়ে পিছন থেকে, একটা স্বর বলে—দাদা, কাইন্ডলি একটু আস্তে।
একটা চিনেবাদামের খোলা ভাঙার শব্দ হয়, কাছেই। আর তখনই হঠাৎ অপালা মঞ্চ থেকে চেঁচিয়ে বলে—হায় চাঁদ! হায় প্রেম!
মঞ্চ অন্ধকার হয়ে যায়। অন্ধকারে টানাটানি করে কারা পরবর্তী দৃশ্যের দৃশ্যপট সাজাচ্ছে।
পূর্বা হঠাৎ মনে-পড়ায় ব্যগ্র কণ্ঠে বলে—বলেছি তো, কিন্তু সে তুই আমাকে খুকি বলেছিস বলে।
—ও। সোমেন উদাস গলায় বলে।
—রাগ করলি? পূর্বা অন্ধকারেই চেয়ে থাকে তার দিকে।
—না।
—করেছিস। মাইরি, রাগ করিস না। জানিস তো, কেউ আমার ওপর রাগ করলে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায়।
—করিনি।
তৃতীয় দৃশ্যের মাঝ বরাবর সোমেন বেরিয়ে এল।
গ্রিনরুমের গলিতে ঢুকেই চমকে ওঠে সোমেন। অণিমা দাঁড়িয়ে আছে। চুলে এখনও সাদা মেক-আপ লেগে আছে। সাদা খোলের শাড়িটাও পরনে। দিল্লির জলহাওয়ায় শরীরে একটা ঢল এসেছে। এত শ্ৰী ওর আগে কখনও দেখেনি সোমেন। রং-ও বোধ হয় ফরসা হয়েছে, মেক-আপের জন্য ভাল বোঝা যাচ্ছে না।
চোখে চোখ পড়তেই মুখটা কেমন অপরাধী লজ্জায় মাখা হয়ে গেল অণিমার। চোখটা নামিয়ে নিয়ে আবার তুলল। ভারী চশমার ভিতরে ওর চোখ বরাবরই ছোট দেখাত। সে-চোখ দুটির দিকে অনেকবার অলস মন নিয়ে তাকিয়ে দেখেছে সোমেন। আজকের দেখার মধ্যে একটু অনুসন্ধিৎসা ছিল। ছিল রহস্যমোচন।
ভারী মিষ্টি একটা লাজুক হাসি হাসল অণিমা। অণিমার সর্বাঙ্গে আর কোথাও এতটুকু ইয়ারকির ভাব নেই। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল—চলে যাচ্ছ?
সোমেন থমকে বলল—তুমিও যাবে নাকি!
অণিমা তার চোখে চোখ না রেখে একটু অপ্রস্তুত হেসে বলল—কী করে যাই! এই দৃশ্যেও পাট রয়েছে। শেষটা দেখে যাবে না?
সোমেন একটু হেসে বলে—তোমাদের বাড়িতেই যাচ্ছি। গাব্বুর টার্মিনাল, একবার যাব বলেছিলাম। আর বেশি দেরি করলে রাত হয়ে যাবে।
—ও! ভারী নরম বিস্ময় প্রকাশ করে অণিমা।
—কবে ফিরেছ?
—এই তো কদিন।
—খুব বেড়ালে?
—উঁ! বলে একটু চুপ করে থাকে অণিমা, তারপর আস্তে দু-দিকে মাথা নেড়ে বলে—না। বেড়াইনি খুব একটা। ভাল লাগত না। ঘরে বসে থাকতাম। রেকর্ড শুনতাম।
