মানস হাসে।
ওর বুড়ো বাবা ওর ছোটভাইয়ের কাছে থাকে দূরের এক মফস্বল শহরে। সে বাড়িতে আমি মোটে বার দুই গেছি। ও বেশি সম্পর্কও রাখত না। মা নেই। এখানে যারা আছে, তারা সব মামা, মাসি, পিসি গোছের। সে সব সম্পর্কও আলগা হয়ে গেছে।
–তোমাকে আমি খুব দুরে নিয়ে গিয়ে থাকব।
–কেন? ওর আত্মীয়দের ভয়ে?
–হু। আমার রেলের চাকরি। ইচ্ছে করলেই বদলি হতে পারি।
আমার কলকাতা ভাল লাগে।
–কেন?
–আমার লাগে। একটা শখ আছে আমার, ঘুরে ঘুরে এ-জায়গা সে-জায়গা থেকে জিনিসপত্র কেনা। কিনতে যে কী ভীষণ ভাল লাগে! কলকাতা ছাড়া এরকম দোকান আর দোকান তো কোথাও নেই!
–আচ্ছা, তা হলে কলকাতাতেই থাকব। ফ্ল্যাট তো পেয়েছিই।
আমি কিন্তু খুব জিনিস কিনি, আর ঠকে আসি।
–কিনো।
–ঠকলে বকবে না তো?
না। মেয়েরা তো ঠকেই। কলকাতায় এই যে এত দোকান, এত ফিরিঅলা, এরা তো মেয়েদের ঠকিয়েই বেঁচে আছে।
তুমি কত মেয়ে চেনা!
একজনকে তো চিনি। তাকে চিনলেই সব চেনা হয়ে যায়।
আমি একটা গ্লাটন। সামনে আস্ত একটা মুরগির রোস্ট, নিচু হয়ে সেটার গন্ধ শুঁকে বলল মানস।
–গ্লাটন মানে কী?
–লোভী। পেটুক।
যা। তুমি কি তাই?
–নয়?
একদম নয়। তোমার শরীর আন্দাজে ওইটুকু আবার খাওয়া নাকি। একটা তো এইটুকুন মাত্র মুরগি।
আস্ত মুরগি। –
-হোকগে।
–খাওয়া কমাব, বুঝলে মৌ?
–কেন?
তুমি খাবে এইটুকুন, আমি খাব অ্যাতো, সেটা কি ভাল দেখাবে?
–মোটেই তুমি অতো খাও না।
—খাই।
-খাও তো খাও।
তবে তুমি খাওয়া বাড়াও।
–মেয়েরা বেশি খেতে পারে না।
–কে বলেছে? এসপ্ল্যানেডে বিকেলের দিকে মেয়েরা যা গপাগপ ফুচকা খায় না, দারা সিং অত তে পারবে না।
সীতা মুখে আঁচল তুলে হাসল।
–তুমি খাও না বলেই রোগা হয়ে অ্যানিমিক।
–স্লিম থাকাই তো ভাল। মোটা মেয়েরা বেশি ভোগে। আমার কোনও অসুখ নেই।
–তোমার ঠিক অ্যানিমিয়া আছে। ডাক্তারের কাছে গেলেই ধরা পড়বে।
–থাকলে আছে।
থাকবে কেন?
–থাকলে অপছন্দ নাকি? বিয়ে বাতিল করবে?
দুজনে দুপলক পরস্পরের দিকে চেয়ে থেকে হেসে ফেলে।
—আইসক্রিমটা নাড়াচাড়া করছ মৌ, খাচ্ছ না।
–ভীষণ ঠাণ্ডা, দাঁত শিরশির করে। গলা বসে যাবে।
–তবে পকৌড়া খাও।
–ভাল লাগছে না। তুমি খাও, আমি দেখি।
আস্তে ধীরে খাচ্ছিল মানস, মাঝে মাঝে তাকিয়ে হাসছিল। একদৃষ্টে চেয়েছিল সীতা। সুন্দর মেদহীন চৌকো পুরুষ মুখশ্রী। কাঁধ দুটো কতদূর ছড়ানো। মস্ত হাত। দেখতে ভাল লাগে। অনেকদিন ধরে দেখছে সীতা। তবু এ নতুন করে দেখা। এ ভাবে দেখা হয়নি। এই ডবলডেকারের মতো মানুষটার কাছে সে পাখির মতো ছোট্ট। বোধহয় মানসের মাথা কোনওদিনই বুকে নিতে হবে না সীতার। এবার উল্টো নিয়ম হবে। তাকেই পাখির মতো বুকে নিয়ে শুয়ে থাকবে লোকটা। সারা রাত।
হঠাৎ সীতা আস্তে করে বলে তুমি স্বপ্ন দেখ না?
–স্বপ্ন? একটু হাঁ করে চেয়ে থাকে মানস। তারপর অনেকক্ষণ বাদে হাসে–স্বপ্ন, মৌ? না, দেখি না। আমি খুব সাউন্ড স্লিপার। কেন?
-এমনিই। অনেকে ঘুমের মধ্যে কথা বলে।
আগে থেকে সাবধান হচ্ছ? ভয় নেই, ও সব হয় তাদের যারা স্নায়ুর রোগে ভোগে।
–তাই!
আবার চুপ। দুজনেই। সীতা সাদা আঙুলে কাঁচের টেবিলে একটা শূন্য আঁকল। তারপর মুখ তুলে হাসল।
ট্যাক্সিটা বাঁক ঘুরতেই অন্ধকারের মধ্যে স্টিমারের মতো ঝলমল করে ওঠে ক্লাব। চারধারে যেন বা কালো নদী। স্টিমার চলেছে।
গাছগাছালিতে বাতাস মর্মরধ্বনি তুলেছে। আলোকিত টেনিস লন। সাইটস্ক্রিনের আড়ালে বলে দেখা যায় না কিছু। হঠাৎ পক করে বলের শব্দ আসে।
আজও কেউ বড় একটা ফিরে তাকায় না। তারা সিঁড়ি বেয়ে ওঠে। টেবল-টেনিসের টেবিলে খুব ভিড় আজ। বহু খেলোয়াড়। চারদিকে বেয়ারাদের দ্রুত আনাগোনা।
মানস মুখ ফিরিয়ে হাসল। বলল–আজ শনিবার।
–তাতে কী?
–ভিড়।
–ও।
–শনিবারে কলকাতার মানুষ পাগল হয়ে যায়।
–আমরাও কি শনিবারের পাগল?
–না। চিরকালের।
করিডোরে একজন তোক শ্লথ পায়ে আগে আগে হাঁটছিল। কথা শুনেই বোধহয় ফিরে তাকাল। অচেনা লোক। খুব ফরসা সুন্দর চেহারা, অবিকল সাহেবদের মতো। লালচে একজোড়া গোঁফ, লালচে চুল এলোমেলো হয়ে আছে মাথায়। মুখে সামান্য ক্লান্তির ছাপ। একটু হাসল কি লোকটা?
সীতা সিটিয়ে যাচ্ছিল। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল, সে কিছু অন্যায় করছে না। সে কোনও অপরাধ করেনি।
পিঠে মানসের আলতো হাত তাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিছু ভয় নেই।
ঘরটা খালিই ছিল। ঠিক আগের দিনের মতো। মানস দরজাটা আগেই বন্ধ করে দিল। ফিরে ইঙ্গিতময় হাসি হাসল একটু। ঠিক সেই মুহূর্তেই সীতার মনে পড়ে, কদিন আগে কেটে যাওয়া টেলিফোন কল। লাইনটা কি কেটে গিয়েছিল সত্যিই? না কি কেউ দীর্ঘশ্বাসই কেবল শুনিয়েছিল তাকে?
ভ্রূ আপনা থেকেই কুঁচকে গেল সীতার।
কী হল? কিছু ভাবছ? মানস প্রশ্ন করে।
সীতা উত্তর দেয় না। শুনতেই পায় না প্রশ্নটা।
ঘরের একদিকে চমৎকার একটা পুরনো আমলের ড্রেসিং টেবিল। বেলজিয়ামের মসৃণ কাঁচ বসানো। সীতা ধীর পায়ে উঠে গিয়ে একটু দাঁড়াল আয়নার সামনে। অ্যানিমিক? বোধ হয়। তাকে খুব রোগা আর ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। মিছে কথা বলেছিল সীতা মানসকে। তার আজকাল খুব অম্বল হয়, মাথা ধরে। হয়তো খুব শিগগিরই অসুখ হবে। আমার অসুখ নেই, এ কথাটা খুব ভেবে বলেনি সে। একটু পিছনে দাঁড়িয়ে আছে মানস। এতক্ষণে ওর পোশাকটা লক্ষ করেনি সীতা তেমন করে। খুব ঝকঝকে একটা চেক প্যান্ট পরনে, গায়ে সাদা স্পোর্টস গেঞ্জি। বুকের চৌকো পাটা ফুটে আছে গেঞ্জির ওপর। বাঁ কাঁধটা ভাঙা, একটু নোয়ানো। খুবই বড় শক্তিমানের চেহারা। ওর পাশে সে কি আধখানা, না সিকিভাগ?
