–তা নয়। তবে ইচ্ছেমতো কিছু কিনে আনব, তার তো উপায় নেই! যা করব, সব অনুমতি নিয়ে করতে হবে। তুমি বেশ আছ।
–এরকম বেশ থাকতে চাও নাকি?
চাই-ই তো।
-কেন?
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সব সংসারটা হাটকে মাটকে দিয়ে চলে যাই। মেয়েমানুষ হওয়া একটা অভিশাপ।
ওরকম সবাই বলে। আবার এ সব নিয়েই থাকে।
তুমি তো থাকোনি।
সীতা দাঁতে ঠোঁট চাপে। আস্তে বলে–এ সব কথা থাক বউদি। তুমি ঠিক বুঝতে পারবে না। বউদি চলে গেলে অনেকক্ষণ জ কুঁচকে ফলসটার দিকে চেয়ে থাকে সীতা। ফুটপাতের দোকান থেকে কেনা ফলস মাপে অনেকটা ছোট হল, শাড়ির পুরো কুঁচিটা ঢাকা পড়বে না। খুব ঠকে সীতা। দেখেশুনে কেনে, তবু ঠিক ঠকে যায়। বরাবর। মনোরম খুব রাগ করত, বলত–মেয়েদের অভ্যাসই হচ্ছে সস্তা খোঁজা। সারা কলকাতা দুনম্বর মালে ছেয়ে গেছে, আসল-নকল চিনবার উপায়ই নেই, কেন নিজে নিজে কিনতে যাও?
ফলসটায় ঠকে গেছে বলে সীতার মনটা খারাপ হয়ে গেল খুব। এতটাই খারাপ হল যে, উঠে বিছানায় গিয়ে শুল। এবং একটু পরে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে সে মনে মনে প্রাণপণে তার কান্নার গূঢ় কারণটাও বোধহয় খুঁজে দেখছিল। কারণটা খুঁজে পেল একটু পরে। বউদি একটা কথা বলেছিল–তোমার কত টাকা! তুমি কত স্বাধীন। কথাটার মধ্যে কিছু নেই। তবু আছে। মনোরমের সর্বস্ব কেড়ে না নিলেও পারত সে। বীরু সেদিন বলছিল, মনোরম তার কৃপণ মামার কাঠগোলায় চাকরি করছে। বীরু ছেলেটা মুখ-পলকা। হেসে বলেছিল আমার বাবার কাছে কাজ করা মানে কিন্তু সুখে থাকা নয়। জানো তো! না জানলেও বোঝে সীতা। সুখে নেই।
.
মানস আবার কাল চলে যাবে দিল্লি। চার-পাঁচ দিন পরে ফিরবে ফোন করল দুপুরে।
–আজ বিকেলে ফ্রি থেকো মৌ।
আমি তো সব সময়ে ফ্রি।
–একটু ঘুরব।
–আচ্ছা।
—দিল্লি যাচ্ছি।
জানি তো।
–ভাল লাগে না।
সীতা হাসল। শব্দ করে। যাতে মানস ফোনে হাসিটা শোনে।
–বেশি দিন তো নয়।
–তা নয়। দুঃখিত গলায় মানস বলে কিন্তু সারাজীবনই এরকম মাঝে মাঝে আমাকে চলে যেতে হবে। ছেড়ে থাকতে পারব তো?
সীতা শ্বাস ফেলল, এবং সেটাও শুনতে পেল মানস। আবেগের সঙ্গে বলল-মাঝে মাঝে তোমাকেও নিয়ে যাব।
-যেয়ো।
–আমি সেই ক্লাবটা থেকে ফোন করছি।
–কোন ক্লাব?
–সেই ক্লাবটা, যেখানে সেদিন..হাসিটা ফোনে শোনাল মানস।
সীতা একটু হাসল।
মানস বলল–ইচ্ছে করলে আজ আবার আমরা এখানে আসতে পারি।
সীতা উত্তর দিল না।
–রেডি থেকো। পাঁচটায়।
কথা শেষ হয়ে যায়। তবু একটু ফোন ধরে থাকে দুজন। পরস্পরের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শোনে।
ফোনে খাসের শব্দ শুনলে সীতার কেমন একটু অন্যমনস্কতা আসে। কদিন আগে একটা ফোন কল কেটে গিয়েছিল। কেটে গিয়েছিল? নাকি কেউ সত্যি ছিল ওপাশে? একটা অস্পষ্ট দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনেছিল সীতা। ভুল? তাই হবে। কিন্তু একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায় সে।
ফোন রেখে দেয়।
.
ছুটন্ত ট্যাক্সিতে বার বার সিগারেট ধরাতে চেষ্টা করছিল মানস। হাওয়ায় দেশলাইয়ের কাঠি নিবে যাচ্ছে বার বার। সীতা হাসছিল।
–ওভাবে নয়। হাত দুটো কাপ করে নাও। সীতা বলে।
কাপ? সেটাই তো হচ্ছে না। আঙুলের ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকছে।
–থাক, খেতে হবে না।
–খাবই! এই ড্রাইভার রোকে।
ট্যাক্সি দাঁড়ালে সিগারেটটা ধরাতে চেষ্টা করে মানস। সীতা দেশলাই কেড়ে নেয়। নিজে যত্নে ধরিয়ে দেয়। ট্যাক্সি আবার চলে।
–কেন যে ছাই লোকে খায় এটা। কী আছে সিগারেটের মধ্যে?
বোধহয় ভালবাসা। মনে মনে এই কথা বলে সীতা। মুখ টিপে হাসে। দেখে, ধোঁয়া লেগে মানসের দুই হরিণ-চোখ ভরা জল।
–আর খেয়ো না।
–কেন?
–অভ্যেস নেই। কাশবে।
–আমার মুখে কি কোনও দুর্গন্ধ আছে সীতা?
–সীতা নয়, মৌ। তুমিই নাম দিয়েছিলে।
সিগারেটের ধোঁয়ায় মাথা আবছা হয়ে গেছে। কিছু ভাবতে পারছি না। গন্ধ নেই তো?
না তো! তোমার মুখের গন্ধ সুন্দর।
তবে কেন সিগারেট খেতে বললে আমাকে?
–পুরুষেরা সিগারেট খায়, দেখতে আমার ভাল লাগে।
–শুধু দেখার জন্য একজনের না-খাওয়ার অভ্যাস নষ্ট করছ?
খেয়ো না।
–রাগ করে বলছ?
না, আমার অত সহজে রাগ হয় না।
–সিগারেট তো আমি খাচ্ছিই। অভ্যাস করে নেব।
না। মাঝে মাঝে খেয়ো। পুরুষের মুখ কাছাকাছি এলে একটুখানি সিগারেটের গন্ধ পাওয়া যায়, সেটা ভীষণ ভাল লাগে।
-আচ্ছা! মনোরম খুব খেত না?
–খেত। কিন্তু তার সঙ্গে এটার কোনও সম্পর্ক নেই।
জানি। সেদিনকার ওই লম্বা ছেলেটা কে?
বীরু। আমার মামাশ্বশুরের ছেলে।
–তোমার মামাশ্বশুর? বলে মানস চেয়ে থাকে। খুব অবাক চোখ। সীতা অবাক হওয়ার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে বলে কী হল?
-মামাশ্বশুরের ছেলে?
–হ্যাঁ। দেওর।
কী বলছ মৌ?
হঠাৎ খেয়াল হতে সীতা জিভ কাটে। ঠিক তো। তার আর কোনও মামাশ্বশুর নেই, দেওর নেই।
মুখ নিচু করে একটু লাজুক ভঙ্গি করল সীতা।
ভুল হয়ে গিয়েছিল।
মানসকে একটু পাঁশুটে দেখায়। সিগারেটটা আধখাওয়া করে ফেলে দিয়ে বলে–ঠিক আছে।
না, ঠিক নেই। তুমি রাগ করেছ। সীতা একটু ঘন হয়ে বসে।
–রাগ করিনি। তবে কেমন একটু লাগে। তুমি ঠিক ভুলতে পারছ না।
ভূলছি। এইমাত্র সব ভুলে গেলাম। দেখ, আর এরকম হবে না।
মানস একটু থমথমে মুখে বলে- ভুলবে কী করে, যদি কলকাতাময় মনোরমের আত্মীয়তা ছড়ানো থাকে!
–ওর বেশি আত্মীয় নেই।
–নেই?
না। ওর বুড়ো বাবা বলে তাকিয়ে একটু হাসে সীতা, বলে–দেখ, শ্বশুর বলিনি কিন্তু।
