সব কিছুর জন্য নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয় ঠাকরোন। আমি যদি একটু ভাল মানুষ হতাম।
যা বাবা, ও আবার কী কথা? তুমি আবার খারাপ কীসে?
আমিই তো খারাপ। বিদ্বান গাধা।
ছিঃ, ওরকম বলতে নেই। তুমি তো এ বংশের গৌরব। আর কেউ তোমার মতো হল না।
আশীর্বাদ করো যেন না হয়।
নিজের ঘাড়ে দোষ নিচ্ছ, কিন্তু তোমার বউটি আজ কী কাণ্ড করল বলো। অমন চেঁচিয়ে পাড়া জানিয়ে কেউ নিজের শ্বশুরবাড়ির কথা বলে? আর ওরকম সব অসভ্য কথা!
শঙ্কিত অমল একবার দু ঘরের মাঝখানের বন্ধ দরজাটার দিকে চাইল। বউদি বেশ জোর গলাতেই কথা কইছে। মোনা যদি শুনতে পায়?
কী দেখছ? মোনা তো কখন চলে গেছে!
কোথায়?
বুডঢা তো ঘণ্টাখানেক আগে মাকে নিয়ে কলকাতায় চলে গেছে।
ওঃ!
তোমার ঘরে একটা উঁকিও দিয়ে গেল না দেখলাম।
কলকাতায় চলে গেল?
যেতে পারবে কিনা দেখ।
কেন ঠাকরোন?
শুনছি কোন পার্টি নাকি সড়ক আর রেল অবরোধ করেছে বেলা দশটা থেকে। কিছুই চলছে না। গাঁয়ের অনেকে যেতে না পেরে ফিরে এসেছে।
অমল সিলিং-এর দিকে চেয়ে রইল।
উঠতে পারবে?
শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে।
আগে জানলে ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনতাম।
না, তার দরকার নেই। হঠাৎ অত চেঁচামেচি শুনে মাথাটা কেমন ঘুরে গিয়েছিল। আজকাল আমার চেঁচামেচি সহ্য হয় না।
সন্ধ্যারও ওরকম সব কথা বলা উচিত হয়নি। তোমার বউ আর হয়তো আসবেই না। হা ঠাকুরপো, তোমরা কি শেষে আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক তুলেই দেবে?
তা কেন ঠাকরোন, সম্পর্ক কি ইচ্ছে করলেই তুলে দেওয়া যায়!
যায় না? বলল কী? কত বাপ ছেলেতে মুখ দেখাদেখি বন্ধ।
হ্যাঁ, তাও বটে। ভাবছি ওরা যে গেল কোথাও আটকে থাকবে হয়তো। এ বাড়িতে ফিরবে না হয়তো।
তোমার দাদা সঙ্গে গেছে, ঠিক ফিরিয়ে আনবে।
দাদা সঙ্গে গেছে?
হ্যাঁ। তার তো ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই। বড্ড ভালমানুষ। মান অপমান গায়ে মাখে না। তোমার বউ ফাইফরমাশ করে, হাসিমুখে মেনে নেয়। ওই একধরনের মানুষ। মান অভিমান যা-কিছু সব আমার সঙ্গে। আর কারও সঙ্গে শত্রুতা নেই।
হেসে ফেলে অমল, দাদাকে খুব চিনেছ তো!
না চিনে উপায় কী বললো! কত বলি ভাদ্দর বউয়ের ফাইফরমাশ খাটো, লোকে বলবে কী! কিন্তু সে বলে, ওরা গায়ে এসে অচেনা পরিবেশে পড়েছে, আমার তো দেখা উচিত। কথাটা তো মিথ্যেও নয়।
মোনাও দাদার কথা খুব বলে।
তুমি কি এক কাপ চা বা কফি খাবে?
খাব। তারপর ঘুমোব। স্নান-খাওয়ার জন্য ডেকো না। আমার খিদে নেই।
সোহাগকে ডেকে দেব? একটু বসুক এসে তোমার কাছে।
না ঠাকরোন। ওরা অনেক দূরের লোক। দূরেই থাকুক।
কী যে সব বল না, অলক্ষুণে কথা।
তোমার এক বিছানায় শোওয়ার থিওরি সব জায়গায় খাটে না।
দাসীর কথা বাসি হলে বুঝবে।
কফি খেয়ে অমল ঘুমোল। অনেকক্ষণ ঘুমোল। বিকেলে পড়ন্ত বেলায় ঘুম ভাঙল খিদেয়।
মোনা আর বুডঢা ফিরে এসেছে। পাশের ঘরে তাদের ইংরিজি ডায়ালগ শুনতে পাচ্ছিল অমল। এ দেশের সিস্টেমকে গালাগাল দিচ্ছিল মোনা। রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে ফের ফিরে আসার লজ্জা তো কম নয়।
বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে পড়ল, আজ পারুল আসবে। সর্বনাশ! এই আগ্নেয়গিরির লাভামুখে সত্যিই কি আসবে নাকি পারুল? তাকে যে আটকানো দরকার। ভীষণভাবে আটকানো দরকার!
তড়িঘড়ি উঠতে গিয়ে বিবশ হয়ে ফের বসে পড়ল অমল। মাথা ঘুরছে। স্পন্ডেলাইটিস ধরা পড়েছিল বছর খানেক আগে। ডান হাতে ঝিঁঝি। ঘাড় টনটন করছে ব্যথায়।
চুপ করে বসে থাকে অমল। সামনেই চৌকাঠের ওপারেই দাঁড়িয়ে আছে সর্বনাশ। পারুলকে কী করে একটা খবর পাঠানো যায়?
কিছুই করতে পারল না অমল। দাঁড়াতে গেলেই টলে যাচ্ছে মাথা, পায়ের নীচে মেঝে টলমল করছে। একটু হুইস্কি খাবে কিনা ভাবল। খাওয়াটা বোধহয় বিচক্ষণতা হবে না। একটাই ভরসা, গ্রামে কোনও বাড়িতে ঝগড়া কাজিয়া হলে সেটা রটে যেতে দেরি হয় না। যদি তাদের বাড়ির ঝগড়াটার কথা পারুলের কানে পৌঁছে থাকে তাহলে সে হয়তো নিজে থেকেই আসবে না।
এই ক্ষীণ আশাটুকু নিয়ে গায়ে লেপ চাপা দিয়ে শুয়ে থাকে সে।
সন্ধের শঙ্খধ্বনি শেষ হতে না-হতেই হঠাৎ চটকা ভাঙল অমলের। নীচের তলায় হঠাৎ হাসি আর কথার শব্দ হচ্ছে। কারা যেন উঠে আসছে ওপরে।
মোনার কণ্ঠস্বর শোনা গেল। কাকে যেন বলছে, আসুন, আপনার কথা কত যে শুনেছি ভাই।
কে এল? কে আসতে পারে? পারুল? অসম্ভব। অসম্ভব। তবু বুকটা ধড়াস ধড়াস করতে থাকে তার।
পারুলের গীতধ্বনির মতো কণ্ঠস্বর বলে উঠল, ইস, কী সুন্দর দেখতে ভাই আপনি! অমলদার ভাগ্য খুব ভাল।
আপনার কাছে আমি! কী যে বলছেন। ভিতরে এসে বসুন।
এই ইনিই হলেন আমার স্বামী জ্যোতিপ্রকাশ গাঙ্গুলি।
আপনার কথাও খুব শুনেছি। আপনি তো ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট।
গম্ভীর এক পুরুষ কণ্ঠ বলে, যা শুনেছেন তার অনেকটাই বাড়াবাড়ি। মিস্টার রায় কোথায়?
বসুন। ডাকছি, ওঁর শরীরটা আজ ভাল নেই।
অমলের ইচ্ছে হল দোতলা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পালিয়ে যায়। কিন্তু শরীর আজ বড্ড বাদ সেধেছে। উপায় নেই।
পারুল উচ্চকণ্ঠে বলে, আমার বান্ধবীটি কোথায়?
ও সোহাগের কথা বলছেন?
হ্যাঁ। ও আমাকে পারুল বলে ডাকে। ঠিক বান্ধবীর মতো।
হ্যাঁ, বিদেশ থেকে শিখে এসেছে। চট করে অচেনা কাউকে মাসি পিসি বলতে পারে না।
মাসি বললে খুশিও হই না। পারুল বলেই ডাকুক। সে গেছে কোথায়?
