মোনা তীক্ষ্ণ গলায় বলে, শুনলেন! ওর কথা শুনলেন! কত দূর স্পর্ধা একবার দেখুন। বাপের বাড়ি তুলে কথা বলছে! শ্বশুরবাড়ি থেকে তো লাথি খেয়ে পালিয়ে এসেছ, অত বড় বড় কথা মুখে আসে কী করে?
সন্ধ্যা এবার বিকট একটা গলায় চেঁচিয়ে উঠল, আমার দাদা যদি পুরুষের মতো পুরুষ হত তাহলে তোমার মতো বজ্জাত মাগীকে অনেক আগেই পাছায় তিন লাথি মেরে তাড়াত। দাদা ভেড়ুয়া বলে বেঁচে গেছ। কোন গুণীন ধরে ওষুধ করিয়েছ কে জানে বাপু, লোকটা তো ওরকম ছিল না। সোনার মেডেল পাওয়া ছাত্র, এক ডাকে দশটা গাঁ চিনত। তার কী অবস্থা করেছ তা কি আমরা দেখতে পাই না!
ঘরের মধ্যে অমল বিছানায় শুয়ে পড়েছে। তার বুকের মধ্যে ব্যথা হচ্ছে। তার বমি পাচ্ছে। মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাদের অনেক গুণ জানি। সোনার মেডেল পাওয়া ছেলে গাঁয়ের মেয়েদের ধরে ধরে রেপ করে বেড়াত। আর তোমার কাছে যারা আসে তাদের কথাও জানি। স্বামী তাড়িয়েছে, এখন যত ওটোলোক ছোটনোক জুটিয়ে নিয়েছ। তোমরা সবাই তো এক ঝাড়েরই বাঁশ, গুণকীর্তির কথা আর বোলো না।
সন্ধ্যা চিৎকার করতে লাগল, বল মাগী, বল আমার দাদা কাকে রেপ করেছে! বল, পাঁচজনের সামনেই বল দেখি তোর কত বড় বুকের পাটা! তোর মুখে পোকা পড়বে হারামজাদী, বেশ্যা মাগী কোথাকার!
এই সময়ে বুডঢা কোথা থেকে দৌড়ে এসে ভিড়ে ভরা উঠোনে ঢুকল। বুদ্ধিমান ছেলে। তরতর করে দোতলায় উঠে মাকে জাপটে ধরে ঘরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
জ্ঞান হারানোর আগে অমল শুনতে পাচ্ছিল, ঘরের মধ্যে মোনা চিৎকার করছে, বলতে দে, আমাকে বলতে দে। ওর দাদা কাকে রেপ করেছে তা ফাঁস করে দিচ্ছি
মা! মা! প্লিজ! ইউ আর আউট অফ ইওর সেনসেস! ওদের সঙ্গে কি তোমার ঝগড়া করা মানায়? চুপ করো, প্লিজ চুপ করো।
তবু ফুঁসছিল মোনা, ছাড়, ছাড় আমাকে। এখনই ওদের ভদ্রলোকের মুখোশ খুলে দিয়ে আসছি।
সেটা ঠিক হবে না মা। এরকম করতে নেই। জাস্ট টেক রেস্ট।
বুডঢাকে বোধহয় চটাস করে একটা থাপ্পড় মারল মোনা, কেন ছাড়ছিস না আমায়? ও যে এক তরফা চেঁচিয়ে যাচ্ছে শুনছিস না?
শুনছি মা। লেট দি ডগ বার্ক। তুমি চুপ করো।
তোর বাবাকে শুনতে বল। তোর বাবা বেরিয়ে গিয়ে বলুক কাকে রেপ করেছে।
সন্ধ্যা চিৎকার করছিল, কী রে খানকির মেয়ে, বললি না আমার দাদা কাকে রেপ করেছিল! বললি না আমি কার সঙ্গে শোয়াবসা করি! বুকের পাটা থাকে তো আয়, সামনে এসে পাঁচজনকে বল! গুয়ের পোকা, কেলে কুত্তার পায়খানা, ইংরিজি মারাতে আসে।
নীচে যারা জড়ো হয়েছিল তারা সববাই সন্ধ্যাকে শান্ত করতে চেষ্টা করছিল।
ছেড়ে দাও দিদি, বড় মাপের মানুষের কেলেঙ্কারিও বড় মাপেরই হয়। তুমি তোমার মতো থাকো। আমরা তো চিনি তোমাকে।
আরে ওরা সব সাহেব মেম লোক, ওদের ধাত আলাদা।
সন্ধ্যা ফোঁপাচ্ছিল, কী সব বলল শুনলি তো তোরা। শুনি নাকি লেখাপড়া জানা মেয়ে। অমন লেখাপড়ার মুখে আগুন। বাইরের রং ফর্সা হলে কী হবে, ভেতরটা কালো আংরা।
যেভাবে পৃথিবীর সব ঝগড়াই ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে কথা ফুরিয়ে দম শেষ হয়ে স্তিমিত হতে থাকে এ ঝগড়াটাও শেষ অবধি থামল। হাত মুঠো করে, দাতে দাঁত চেপে বজ্রাঘাতের অপেক্ষায় ছিল অমল। কখন উত্তেজিত বলগাহীন মোনার মুখ থেকে পারুলের নামটা উচ্চারিত হয়। অল্পের জন্য আজ বেঁচে গেল পারুল। খুব অল্পের জন্য। বুডঢা সময়মতো না এলে সারা গাঁয়ে চাউর হয়ে যেত পারুলের নাম।
তীব্র উত্তেজনা, স্নায়ুর দুর্বলতা এবং অবসাদে অমল কিছুক্ষণের জন্য সত্যিই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। এই ক্ষমাহীন পৃথিবীতে মানুষ কী করে যে বেঁচে থাকে!
কী হয়েছে তোমার ঠাকুরপো! কী হয়েছে?
অমল ফ্যালফ্যাল করে যখন চাইল তখন তার মুখে চোখে ছিটোনো জলের শীতল স্পর্শ। সে প্রতিধ্বনি করল, কী হয়েছে আমার বললো তো!
তাই তো জিজ্ঞেস করছি। ঘরে এসে দেখি দাঁতকপাটি লেগে পড়ে আছ।
অমল এত দুর্বল বোধ করছিল যে চোখের পাতা দুটো পর্যন্ত খুলে রাখতে পারছিল না। বারবার বুজে আসছে চোখ, মানুষের শরীর যে এত শক্তিহীন হয়ে যেতে পারে এমন অভিজ্ঞতা তার আগে হয়নি কখনও।
আমার মেয়েটা কোথায় ঠাকরোন?
কোথায় আবার! পান্নাদের বাড়িতে গিয়েছিল। রোজই তো যায়। কী যে আজ অশান্তি হল তাই নিয়ে।
অমলের কিছু বলার নেই। চুপ করে থাকে।
চিন্তা কোরো না। তোমার মেয়েটা একটু ক্ষ্যাপাটে হলেও খারাপ কিছু নয়। বলতে কি বাপু, ওই তো আমাদের সঙ্গে যা একটু মেশে-টেশে। তোমরা আর কেউ বাপু আমাদের পাত্তাও দাও না।
সোহাগও মিশুকে নয়। এখানে এসে মিশুকে হয়েছে। সেটা হয়তো তোমাদের গুণ।
বাপু, গুণের কথা ওঠে কেন? আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মেলামেশাটাই স্বাভাবিক। আমরা তো পর নই। পর করে রাখলে আর কী করা যাবে।
সোহাগ কোথায়?
এসেছে। দাদুর কাছে বসে আছে। আজ যা কাণ্ড হল তাতে শ্বশুরমশাইয়ের হার্টফেল হতে পারত। ঝগড়া দেখে সোহাগকে খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। ফিরে এসে কেঁপেকেঁপে অস্থির হয়ে শয্যা নিয়েছিলেন। ডাক্তার অবধি ডাকতে হয়েছে। অনল বাগচী এসে ওষুধ ইনজেকশন দেওয়ায় এখন ঘুমোচ্ছেন।
খারাপ কিছু নয়তো?
ডাক্তার তো তেমন কিছু বলল না। শক পেয়ে নাকি হয়েছে। বয়সও তো কম হল না।
