আর বলবেন না। এখানে এখন তার অনেক বন্ধু হয়েছে। দিনরাত আড্ডা। তবে এসে পড়বে ঠিকই। আপনি আসবেন জানে তো।
খুব ইন্টারেস্টিং মেয়ে।
এমনিতে খুব ভাল, কিন্তু বড্ড খেয়ালি।
কী চমৎকার অভিনয় মোনার। ওকে অস্কার দিতে ইচ্ছে হচ্ছে অমলের। অমল তীব্র শীতে জবুথবু হয়ে জড়বস্তুর মতো বসে রইল অন্ধকার ঘরে। মনে হচ্ছিল, সে আর নড়তে পারবে না। পারুলের মুখোমুখি হওয়াও সম্ভব নয় তার পক্ষে। মোনা বড় বিপজ্জনক জায়গায় চলে গেছে। আজই রাগের মাথায় সে পারুলের কথা বলে ফেলেছিল প্রায়। অমলের কলঙ্কের কোনও ভয় নেই, তার কিছুতেই কিছু যায় আসে না। কিন্তু পারুলের মূর্তিটা ভেঙে পড়ে যেত আর একটু হলেই।
সে শুনতে পেল, পারুল বলছে, অমলদার কি শরীর খারাপ?
হ্যাঁ। স্পন্ডেলাইটিসে কষ্ট পাচ্ছেন। দাঁড়ান, ডেকে আনছি।
থাক না। একটু পরে ডাকলেও হবে। আজ আপনার সঙ্গে আলাপ করতেই তো আসা।
মোনা বলল, আপনার সঙ্গেও আলাপ করার ভীষণ ইচ্ছে ছিল আমার। সোহাগের কাছে তো আপনি একজন গডেস।
খুব করুণ গলায় পারুল বলে, আচ্ছা, দেখুন তো কী কাণ্ড! ও আমাকেও ও কথা বলেছে, শুনে যে আমার কী লজ্জা হয়েছে বলার নয়। আমাকে ওসব ভাবে কেন ও?
মোনা হেসে বলে, ভাবার কারণ আছে বলেই ভাবে।
কারণ! কী কারণ থাকতে পারে?
আপনার মধ্যে একটা অদ্ভুত গ্রেসফুলনেস আছে। এতদিন কেবল আপনার ছবি দেখেছি আর কথা শুনেছি, আজ মুখোমুখি দেখে আমারও যেন মনে হচ্ছে আপনার মধ্যে ডিভাইন কিছু আছে।
যাঃ, আপনিও এসব বলছেন!
আমার ছেলেও বলে।
কী লজ্জার কথা বলুন তো। আমি তো একেবারে সাধারণ একটা মেয়ে।
তাহলে বোধহয় আমাদেরই চোখের ভুল।
জ্যোতিপ্রকাশ চুপ করে ছিল। এবার তার গুরুগম্ভীর গলায় বলল, দেবী হলে কিন্তু এদেশে খুব কদর হয়। দেবী বলে সেই যে গল্পটা
আহা, ওসব তো গল্প।
সিঁড়িতে দুদ্দাড় পায়ের শব্দ তুলে উঠে এল সোহাগ।
হাই! পারুল পিসি!
এই দুষ্টু মেয়ে আমি আবার পিসি হলুম কবে?
.
২২.
আগে পাড়াপ্রতিবেশীরা ভাবত বাঙালবাড়িতে বুঝি ঝগড়া লেগেছে। ঝগড়া দেখতে চলেও আসত কেউ কেউ। আজকাল সবাই জেনে গেছে, হাঁকডাক আর চেঁচামেচি হল বাঙালের স্বভাব। ভাল কথাটাও উঁচু গলায় না বললে তার সুখ হয় না। বিষয়ী কথাই হোক, আদুরে কথাই হোক পাঁচবাড়ি জানান দেওয়া চাই। হাঁকডাক শুনলেই পাড়া-প্রতিবেশীরা নিজেদের মধ্যে কওয়াকওয়ি করে, ওই বাঙাল এয়েছে, কদিন এখন ভূত-প্রেতও তফাত থাকবে।
ধীরেন কাষ্ঠ কিন্তু খুশিই হয়। বাসন্তীকে একবার বলেছিল, যারা চেঁচিয়ে কথা কয় তাদের মনে ময়লা নেই। তারা সরল মানুষ।
জিজিবুড়ি বলে, ও হচ্ছে মাগী নাচানো গলা। খোঁজ নিয়ে দেখগে, আলকাপ না বউ মাস্টারের দলে যাত্রা থিয়েটার করে বেড়াত। ও কী গলা বাবা, বাঘের অবধি পিলে চমকে যায়। জন্মের পর মা মাগী বোধহয় তেঁতুলগোলা গিলিয়ে দিয়েছিল।
কথাটা ঠিক যে, হাঁকডাকে বাঙাল খুব দড়। সকালবেলা রসিক বাঙাল তার বাজখাঁই গলায় হাঁকডাক করতে করতেই দোতলা থেকে নামছিল, কই রে, হারু কই গেলি? মরইন্যাটা কইরে? আরে তুমি কই গ্যালা…?
বাঙালের বাঁ কোলে হাম্মি, ডান হাতে এক গোছা ভাঁজ করা রুটি। সকাল আটটা সাড়ে আটটায় বাঙাল রোজ কাককে রুটি খাওয়ায়। বাঁধা নিয়ম।
উঠোনের কোণে রান্নাঘর থেকে বাসন্তী হাসিমুখে বেরিয়ে এল।
কী বলছ?
বেহানবেলায় পাকঘরে ঢুইক্যা করটা কী?
জলখাবার করছি তো।
পোলাপানগুলি কই?
একটা তো তোমার কোলে। মরণ পড়তে বসেছে, আর সুমন এখনও ঘুমোচ্ছে। তাই কও।
আসলে এই ডাকখোঁজ করাটা বাঙালের স্বভাব। আপনজনরা কে কোথায় কী করছে সে খবরটা সবসময়ে চায়। বড্ড মায়া লোকটার। যা করবে তা সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে করবে। জন না হলে যেন বাঙালের এক মুহূর্ত চলে না।
কাউয়া খাওয়াইতে যাইতাছি। আইবা নাকি?
উনুনে যে তরকারি হচ্ছে। পুড়ে যাবে।
আইচ্ছা মাইয়্যালোক, রান্ধন বান্ধন লইয়াই থাক গিয়া।
দুড়দাড় করে উঠোন পেরিয়ে গেল লোকটা। বাসন্তী হাসিমুখে চেয়ে রইল। বড় ছেলেমানুষ তার এই মানুষটা। মানুষটার আধখানামাত্র সে পেয়েছে। তাইতেই ভরে গেছে বাসন্তীর। পুরোটা যদি পেত! না, থাক। ওসব ভাবতে নেই।
উঠোনের পুব-দক্ষিণ কোণে গোয়ালঘরের পিছনে সবজিবাগান ঘেঁষে একটা ফর্সা জায়গা আছে। সেখানে রাজ্যের কাক বাঙালের জন্য ওত পেতে থাকে। বাঙাল রুটির টুকরো ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেয় আর কাকগুলো নানা কায়দায় শূন্যে পাক খেয়ে খেয়ে এরোপ্লেনের মতো গোঁত্তা মেরে শূন্য থেকেই লুফে নেয় ঠোঁটে। দৃশ্যটা খুব উপভোগ করে বাঙাল। খুব হাসে, খা, খা, ভাল কইরা খা।
বাপের কোল-সই হয়ে হাম্মিও দৃশ্যটা খুব মন দিয়ে দেখে আর নানা শব্দ করে চেঁচায়। দুই শিশুর কাণ্ড।
রান্নাঘরে গা-ঢাকা দিয়ে জিজিবুড়ি বসা। রোজ সকালেই এ সময়ে একবারটি আসে সে। লুকিয়ে বসে এক কাপ দুধ-চা খেয়ে যায়। বাসন্তী মায়া করে তাকে ওটুকু দেয়।
চাপা গলায় জিজিবুড়ি বলে, ওই চললেন কাককে ভোজ খাওয়াতে। ওই করে করেই ঘটিবাটি সব চাঁটি হবে বলে রাখছি বাপু। শেষে কৌপীনসম্বল। বলি কাকের মতো নিঘিন্নে জীব আছে? সারাদিন অখাদ্য সব জিনিস খেয়ে বেড়ায়, পচা-ঘচা বাসি-ত্যাতা কোনটায় অরুচি দেখেছিস? কেলেকুষ্টি, ছিষ্টিছাড়া কাককে কেউ নেমন্তন্ন করে পয়সার জিনিস খাওয়ায় আহাম্মক ছাড়া? আড়াইশো তিনশো আটা জলে গেল। কত দাম হয় হিসেব করেছিস কখনও?
