আচ্ছা লোক বাপু, তুমি তো আর ফিসফিস করে ডাকছ না! আমার ঘরে থাকলে তো শুনতেই পেত!
শুনেও হয়তো জবাব দিচ্ছে না।
তা হলে আমি আর কী করব বলো! তুমি এসে ঘরে তল্লাশ নিয়ে যাও।
সেটাই নেওয়া উচিত। মেয়েটা তো দিনরাত তোমার ঘরেই পড়ে থাকে। দিনরাত গুজগুজ, ফুসফুস।
উঠোনে সন্ধ্যার কয়েকজন গাহেক এসে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাগে জিনিস বুঝে নিচ্ছে। তারপর সাইকেলে বিলি করতে বেরোবে। তারা কাজ থামিয়ে হাঁ করে ঘটনাটা বুঝবার চেষ্টা করছে।
সন্ধ্যা হেঁকে বলল, ঘরে যাও তো বউদি, আর লোক হাসিও না। তোমার মেয়ে তার পিসির ঘরেই আসে, ডাইনিবুড়ির কাছে নয়। তোমার যদি পছন্দ না হয় তা হলে নিজের মেয়েকে নিজেই সামলে রাখতে শেখো। পাঁচজনের সঙ্গে ঝগড়া করার দরকার কী? সোহাগ তো সকলের ঘরেই যায়, শুধু আমাকে বলছ কেন?
তুমিই ওর মাথাটা খাচ্ছ বলে বলছি।
কী করে খেলাম বলো তো! কী করেছি ওর আমি?
তা আমি জানি না। আগে ও এত অবাধ্য ছিল না, আজকাল হয়েছে। আজকাল মুখে মুখে কথাও বলছে। পাড়াগাঁর মতো ঝগড়ুটে স্বভাব তো ওর আগে ছিল না!
পাড়াগাঁর লোকেরা না হয় বাংলা ভাষায় ঝগড়া করে, আর তোমরা করো ইংরিজিতে, এটুকু ছাড়া আর কোনও তফাত আছে? লেখাপড়া জেনে, বিলেত ঘুরে এসে কি সাপের পাঁচ পা দেখেছ নাকি যে, যাকে-তাকে যা খুশি তাই বলবে!
অমল এই রণাঙ্গনে ঢুকতে চায় না। তার কোনও ভূমিকাও নেই, দর্শক ও শ্রোতা হওয়া ছাড়া। কিন্তু আজকাল চেঁচামেচি শুনলে তার মাথা ঝিমঝিম করে, হাত পা কাঁপে, নার্ভাস লাগে।
সে বারান্দার দরজাটা খুলে আর্তস্বরে বলল, প্লিজ! প্লিজ মোনা, ঘরে চলে এসো।
মোনা তার ক্ষুরধার এবং রক্তাভ মুখ ফিরিয়ে গর্জন করল, চুপ করো! আমার ব্যাপার আমাকে বুঝতে দাও। শি হ্যাজ গন ইনটু হাইডিং।
আহা, তা কেন? হয়তো টয়লেটে গেছে, কিংবা…।
না, টয়লেট আমি দেখেছি। এ বাড়িতেই কারও ঘরে লুকিয়ে আছে।
কী করে বুঝলে? হয়তো কিছু কিনতে-টিনতে গেছে।
না, কোথাও যায়নি। আমি জানি। বুডঢা আশেপাশে দেখে এসেছে।
অমলকে দেখে সন্ধ্যা মুখ তুলে বলল, দেখেছ মেজদা, বউদি কীসব বলছে! সোহাগ আমার ঘরে আসে সে কি আমার দোষ? আমি নাকি আমার নিজের ভাইঝিকে কানমন্তর দিয়ে নষ্ট করছি।
সে রেফারি নয়, আম্পায়ার নয়, বিচারক নয়। সে অসহায় দুর্বল গলায় শুধু বলল, মোনা, প্লিজ…
সন্ধ্যাকে চেনে অমল। দুঃখী মেয়ে, খেটে খায়। এই বোনটার কথা মনেও থাকে না অমলের। এর স্বামী পরিত্যক্ত জীবনে কেউ কিছু সাহায্যে আসেনি। তাই ওর ভিতরে বিষ জমেছে মেলাই। এই অহেতুক আক্রমণে ও যদি মুখে সেই বিষ উগড়ে আনে তা হলে মোনা বিধ্বস্ত হয়ে যাবে।
মোনা ধমক দিল, তুমি চুপ করো।
শোনো মোনা, উঠোনে বাইরের লোক রয়েছে, শুনছে।
ইস, ভারী লোক রে! সব তো ছোটলোক ক্যানভাসার। তোমার বোন তো ওদের সঙ্গে মিশে মিশেই ছোটলোক হয়ে গেছে।
নীচের লোকেরা পরস্পর একটু তাকাতাকি করে নিল। তাদের সম্পর্কেই এসব কথা বলা হচ্ছে, বুঝতে পারছে তারা। কিন্তু তারা রা কাড়ল না। ওদের এই অহেতুক অপমানে কান ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে অমলের।
চেঁচামেচি শুনে বাড়িসুদ্ধ লোক বেরিয়ে এসেছে উঠোনে। পাড়া প্রতিবেশীরা উঁকিঝুঁকি মারছে আশপাশ থেকে।
নীচে থেকে বউদি হঠাৎ বলল, সোহাগ তো একটু আগে পেছন দিকের পথটা দিয়ে কোথায় যেন গেল।
মোনা ধমকের গলায় বলল, কোথায় গেল?
আমাকে তো বলে যায়নি ভাই। তবে এক ছুটে বেরিয়ে যেতে দেখেছি।
শি ইজ হাইডিং। আপনারা জানেন, কিন্তু বলবেন না।
অমল ঘরে এসে মাথাটা চেপে ধরে বসে পড়ল বিছানায়। তার শরীর দুর্বল লাগছে। মাথা ঘুরছে। এতক্ষণে খোঁয়াড়ি ভাঙছে নাকি তার?
নীচে হঠাৎ মহিমের গলা পাওয়া গেল, কী হল, এত চেঁচামেচি কীসের?
সন্ধ্যা চেঁচিয়ে বলল, সেটা তোমার মেমসাহেব বউমাকে জিজ্ঞেস করো। উনি বিলেত থেকে এসেছেন আমাদের সহবত শেখাতে। ইংরিজি বললেই যদি ভদ্রলোক হত তা হলে তো কথাই ছিল না!
মহিম বলে, কী হয়েছে বউমা, আমাকে বলবে?
সোহাগকে পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ আজ আমরা কলকাতা যাব।
কতক্ষণ ধরে পাওয়া যাচ্ছে না?
চল্লিশ মিনিট হয়ে গেছে।
মহিম শান্ত গলায় বলে, দেখ কাণ্ড! এ হল গাঁ দেশ, কোথায় আর যাবে! হারিয়ে যাওয়ার তো জায়গা নেই এখানে। সকালে তো আমার সঙ্গে বাগানে ঘুরছিল। কোথায় আর যাবে।
তার কোথাও যাওয়ার কথা নয়। তার এখন গোছগাছ করার কথা। ইচ্ছে করেই কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছে।
আচ্ছা আচ্ছা, আমিই না হয় খুঁজে আনছি তাকে। তুমি বরং গোছগাছ শুরু করে দাও গে।
আপনাকে বলে রাখছি, সোহাগকে বুদ্ধি পরামর্শ দেওয়ার অনেক লোক কিন্তু এবাড়িতে আছে।
শুনছ বাবা! ভাল করে শুনে নাও। আমরাই নাকি ওর মেয়েকে পালানোর পরামর্শ দিয়েছি।
আহা, তুই চুপচাপ নিজের কাজ কর না।
চুপ করে থাকতে দিচ্ছে কোথায়? এখন এই সকালবেলায় খদ্দেরদের ভিড়, হিসেবপত্তর করতে হচ্ছে, এ সময়ে চেঁচিয়ে মাথাটাই গরম করে দিল।
বউমা, তুমি ভেবো না। আমি বেরোচ্ছি খুঁজতে।
খুঁজে পান ভাল, নইলে আমি পুলিশ ডাকব।
মহিম ভয় খেয়ে বলে, না, না, অত কিছু করতে হবে না বউমা ছেলেমানুষ, কোথাও গেছে।
সন্ধ্যা চেঁচিয়ে বলে, ডাকতে দাও না বাবা। ডাকুক পুলিশ। আমাদের কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাক। কিন্তু তাতে তোমার মুখে কালিঝুলি কিছু কম পড়বে না। বুঝেছ? ও মেয়েই তোমার সঁতের গোড়া ভাঙবে। পুলিশ ডাকবে। এঃ, মুরোদ কত! পুলিশ যেন ওর বাপের চাকর! পায়ে দাসখত দিয়ে বসে আছে, নাচতে বললেই নাচবে! যাও না যাও, পুলিশ ডেকে আনো। এখানকার পুলিশে না কুলোলে বাপের বাড়ির পুলিশ ডেকে আনো গিয়ে।
