নইলে কী সেটা ভাবতেও ভয় করে অমলের। কিছু না ভেবেই সে শুধু আত্মরক্ষার জন্য বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই তো। ওর কি যাওয়ার ইচ্ছে নেই?
না, ইচ্ছে নেই। এই ধ্যাধধেরে গোবিন্দপুরে কী মধু পেয়েছে কে জানে। বেশি জেদ করলে কিন্তু আমি চুলের মুঠি ধরে নিয়ে যাব।
শঙ্কিত অমল বলে, থাক, থাক আমি দেখছি।
কিন্তু অমল জানে তার দেখার কিছু নেই। দুই জনের মাঝখানে তার ভূমিকা রেফারিরও নয়। কাউকেই সে কিছু বোঝাতে পারে না। তবু সে উঠল। উঠতে উঠতে মিনমিন করে বলল, কী যেন একটা বলছিল তখন।
কী বলছিল?
বোধহয় শরীর খারাপের কথা।
ওসব ন্যাকামি। আমি আর কিছুতেই এখানে থাকব না।
সে তো ঠিকই। কিন্তু
কিন্তু আবার কী? কীসের কিন্তু?
ও যেন বলছিল, কয়েকদিন ও এখানে এদের সকলের সঙ্গে থাকতে পারবে। আমি আপত্তি করিনি।
যেন অসম্ভব এক প্রস্তাব। শুনে চোখ বড় বড় করে মোনা বলে, একা থাকবে? এখানে?
সেরকমই বলছিল যেন। তুমিও সে কথা মেনে নিলে? খুব ভদ্রভাবে বহিরাগত মানুষের মতো সে জিজ্ঞেস করে, সেটা কি উচিত হবে না?
না, হবে না। তোমার মেয়ে এখানে এসে যা-খুশি করছে। পড়াশুনো নেই ওর? যোগ ক্লাস নেই? ড্যান্সিং লেসন নেই? গান নেই? এখানে এসে তো সব চুলোয় গেছে।
কিন্তু ওঁর হাঁপানির ভাবটা নেই, লক্ষ করেছ? ঘন ঘন সর্দিও হচ্ছে না।
সেজন্যই এখানে চিরকাল থাকতে হবে নাকি?
তা বলছি না। ও বলছিল কয়েকটা দিন যদি–
একদিন দুদিন করে প্রায় মাসখানেক হতে চলল। যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়। তোমারও আক্কেল নেই দেখছি। এখানে গ্যাঁট হয়ে বসে আছ, অথচ তোমার অফিস খোলা। কী ব্যাপার বলো তো?
আক্রমণটা কোন দিক থেকে আসবে তা আঁচ করে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করে সে বলল, কয়েকদিন ছুটি নিয়েছি। ছুটি অনেক জমে গেছে। কতকাল ছুটি নিইনি বলল তো!
ছুটি নিয়ে থাকলে আমরা অন্য কোথাও যেতে পারি। এখানে বসে থেকে সময় নষ্ট করার মানেই হয় না।
সঙ্গে সঙ্গে একমত হয়ে অমল বলে, সেও হয়।
তোমার এখানে বসে থাকার মতলবটা যে আমি জানি না তা তো নয়। তোমার পুরনো প্রেম নতুন করে উথলে উঠছে। ইউ হ্যাভ টু লিভ দিস প্লেস।
একটু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে অমল। কত দূরে সরে গেছে পারুল। এত দুর এক নক্ষত্র যার আলো এসে পৃথিবীতে পৌঁছয় না। ও কি পারুলকে হিংসে করছে? ও কি সন্দেহ করে এখনও তার আর পারুলের মধ্যে সম্পর্ক হতে পারে? অসম্ভব সব ব্যাপার ঘটছে যে! শীতল, কঠিন মোনার মধ্যে এখনও কি দখলদার জেগে আছে একজন? সেই দখলদার কি তার পুরুষের ওপর সম্পূর্ণ অধিকার চায়? কী করে তা সম্ভব?
অমল শুধু বলল, তা হয় না।
কী হয় না?
ওরকম হয় না মোনা। অঙ্ক মেলে না।
আমি সেসব জানি না। আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই। তুমি ওঠো, তোমার মেয়েকে ঘাড়ে ধরে রাজি করাও। আমরা আজ যাচ্ছি।
মোনার গলা সামান্য উঁচুতে উঠেছিল। দু হাত তুলে অমল বলল, ও কে, ও কে। পিস, পিস।
অমলের মনে হচ্ছিল মোনা যেন টাইগার টাইগার বার্নিং ব্রাইট। গনগন করছে সমস্ত শরীর, মুখ।
মোনা বলল, আমি যাচ্ছি গোছগাছ করতে। সব জিনিস নিয়ে যাওয়া যাবে না। কিছু এখানে থাকবে। পরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কোরো।
মোনা চলে গেল।
অমল উঠল। কোনও উপায় তার জানা নেই। সামনে আর এক রণাঙ্গন। কলকাতার ফ্ল্যাটবাড়ি। সেখানে আপাতশান্ত এক পরিবারের বাস। তারা চারজন। প্রায় কোনও সময়েই কারও সঙ্গে কারও সম্পর্ক রচিত হয় না। একটু রাতের দিকে অমল মদের বোতল খুলে বসে এবং হিসেব না করেই খেয়ে যায়। খেতে খেতে যুক্তিসিদ্ধ চিন্তা ও আচরণের চৌকাঠ ডিঙিয়ে যায়। তারপর কী হয় তা সে জানে না। তবে বুডঢা তাকে একদিন বলেছিল, ড্রিংক করলে তুমি খুব প্যাথেটিক হয়ে যাও। আর কিছু বলেনি। প্যাথেটিক বলতে কী বুঝিয়েছিল তাও ভেবে দেখেনি অমল।
মোনার গলা পাওয়া যাচ্ছে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডাকছে, সোহাগ! সোহাগ! কোথায় গেলে তুমি?
রাগের গলা, চিৎকারের কাছাকাছি।
সোহাগ! সোহাগ!
অমলের গোছানোর মতো কিছু নেই। প্যান্ট শার্ট আর কোটটা পরে নেবে। পাজামা ইত্যাদি সামান্য দু-তিনটে জিনিস গুছিয়ে নিতে পাঁচ-সাত মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়।
একটা কথা ভেবে হঠাৎ সে আজ ভারী অবাক হল। এতকালের মধ্যে তার কখনও গ্রামের বাড়িতে এসে থাকতে ইচ্ছে হয়নি। এখনও যে এখানে থাকতে তার খুব ভাল লাগছে তা নয়। কিন্তু কলকাতায় ফিরে যেতেও তার তেমন ইচ্ছে হচ্ছে না। কিন্তু কেন? তার মনের গভীরে কি এখনও পারুল-লোভী কেউ লুকিয়ে আছে? ওপর-মন দিয়ে সে ভিতর-মনকে ধরতে পারছে না?
অমল বুঝতে পারল না। একটু আগে পারুলকে দূরতম নক্ষত্র বলে মনে হয়েছিল। বাস্তবের পারুল হয়তো তাই। কিন্তু পারুলের একটা মূর্তি কি প্রতিষ্ঠিত আছে ভিতরে স্বর্ণসীতার মতো? সে-ই কি তার সব গণ্ডগোলের মূল?
মোনা এবার চেঁচাচ্ছে, সোহাগ! সোহাগ! এই, তোমরা সোহাগকে কেউ দেখেছ?
নীচে থেকে সন্ধ্যা বিরক্তির গলায় বলে, না, দেখিনি।
তুমি তো উঠোনেই ছিলে, তবু দেখনি?
সন্ধ্যা গলা চড়িয়ে বলে, কী করে দেখব? আমি তো কাজ করছিলাম! উঠোন দিয়ে কত লোক তো যাচ্ছে আসছে।
মোনা চড়া গলায় বলল, তোমার ঘরে গিয়ে বসে আছে কি না দয়া করে দেখ। আমরা আজ কলকাতায় যাচ্ছি, তাড়া আছে।
