মা যদি ফোর্স করে তাহলে কিন্তু আমিও ফোর্স করব।
ঝগড়া করবি?
যদি করতে হয়, করব।
অমল একটু তটস্থ হল। ঝগড়া তার পরিবারে মাঝে মাঝে হয়, তবে বেশি দূর গড়ায় না। ঝগড়ার চেয়েও ভয়াবহ হল শীতল নীরবতা! দিনের পর দিন কেউ কারও সঙ্গে কথা কয় না। খুব সামান্য প্রয়োজনীয় দু-একটা কথা বলেই ঝাঁপ ফেলে দিয়ে যে যার নিজের মনের মধ্যে ঢুকে যায়। কোনও আবেগ, উচ্ছলতা নেই তাদের। অবসরে বসে কথাবার্তা কয়ে সময়যাপনও করে না তারা।
একটা শ্বাস ফেলে অমল বলল, দেখা যাক।
মা কেন চলে যেতে চাইছে জানো?
কেন?
আজ পারুল মার সঙ্গে দেখা করতে আসবে।
২১-২৫. পাপীদের স্বীকারোক্তি
২১.
পাদরি পাপীদের স্বীকারোক্তি গ্রহণ করছেন। স্বীকারোক্তি করার জন্য পাপীরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। পাদরির কাজটাও সোজা। পাপীর মুখ তাঁকে দেখতে হয় না। পর্দার ওপাশ থেকে শুধু পাপীর কণ্ঠস্বর শোনা যায়। ফাদারের কাজ হল ঈশ্বরের নামে পাপীকে ক্ষমা করে দেওয়া। পাদরি একের পর এক পাপীকে ক্ষমা করে যাচ্ছেন। তার মধ্যেই একজনের স্বীকারোক্তি শুনতে শুনতে পাদরি হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন, ইউ ডিড হোয়াট? সেই চিৎকার শুনে লাইন দিয়ে দাঁড়ানো অন্য পাপীরা দুদ্দাড় করে দৌড়ে পালিয়ে গেল। তাদের ভয়, না জানি তাদের পাপও কত ভয়ংকর যা শুনে পাদরিও ভিরমি খায়।
মানুষের সব পাপকে একমাত্র ভগবানই বুঝি ক্ষমা করতে পারেন। তাও ভগবান বলে যদি সত্যিই কেউ থেকে থাকে। ভগবান থাক বা না থাক সব মানুষই একজন ক্ষমাশীলকেই খুঁজে বেড়ায়। পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে যে মেরে ফেলেছে তাকে কোন মানুষ ক্ষমা করতে পারে? সেই নরকগামী লোকটা হয়তো একদিন অন্তর্দহনে এক শ্বেতশুভ্র সর্বপাপহারী ক্ষমাশীলকেই খোঁজে। পাক বা না পাক, খোঁজে। পুণ্যবানদের বরং ভগবানকে তেমন প্রয়োজন নেই, পাপীরই প্রয়োজন বেশি।
যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায়, ভালমন্দ মিলায়ে সকলি। এই ভালমন্দ মিলিয়ে আখাম্বা লোকটাকে পক্ষপাতশূন্য চোখে কে দেখতে পারে? ভগবান? ভগবান তা হলে কি ইট, কাঠ, পাথরের মতোই অনুভূতিহীন কেউ? তা হলে তাকে দিয়ে কী লাভ মানুষের?
ভালবাসা না পেলেও চলে যায়, কিন্তু ক্ষমা না পেলে কি মানুষের চলে? এই মধ্যবয়সে আজ সেও এক ক্ষমাশীলকে খুঁজতে শুরু করেছে বুঝি।
সামনেই রণাঙ্গন। এবং যুদ্ধকে সে ভীষণ ভয় পায়। বরাবরই পেত। কোনও যুদ্ধেই আজ অবধি তার জয় হয়নি। লেখাপড়া বা চাকরি কোনওদিনই তার যুদ্ধ ছিল না। মাথা পরিষ্কার ছিল, স্মৃতি ছিল প্রখর, তাই মশামাছি মারার মতো অনায়াসে সে বেড়াগুলো ডিঙিয়ে গেছে। কিন্তু অন্য দিকে বারবার তাকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছে তার জীবন। মোনালিসা, সোহাগ, বুডঢা–তার এইসব আপনজনের সঙ্গে তাকে অবিরল এক অদ্ভুত লড়াই করতে হয়। ধীরে ধীরে সে ওদের ভয় পেতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে মনের ভিতরে সে দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ক্রমে একা হয়ে যাচ্ছে। স্বামী হিসেবে, বাবা হিসেবে কতভাবে যে হেরে যাচ্ছে সে তা ভাবতেও ইচ্ছে হয় না।
কত সামান্য ব্যাপার। আজ তার কলকাতা যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মোন আজই যেতে চায়। এই সামান্য সমস্যা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন ক্রমশই গুরুভার হয়ে উঠতে লাগল। মোনাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার সাহসটা পর্যন্ত পাচ্ছে না সে। ভয় হচ্ছে, বলতে গেলেই মোনা বিস্ফোরিত হবে। প্রচণ্ড রেগে যাবে। কিংবা হয়তো ঠান্ডা চোখে এমনভাবে তাকাবে যে নিজেকে বে-আব্রু এক আহাম্মক বলে মনে হবে তার।
এইসব দুঃখের মূলে আজও পারুল। পারুলই। প্রজাপতির মতোই ছিল পারুল। নিষ্ঠুর, লোভী অমল একদিন সেই প্রজাপতির দুটি ডানা ছিঁড়ে দিয়েছিল। তখন প্রজাপতির শরীর থেকে জন্ম নিল বিষধর সাপ। একটি প্রত্যাখ্যানের ছোবলে মেরে ফেলল তাকে। ক্ষমা করল না। কিছুতেই আর নিজেকে বাঁচিয়ে তুলতে পারল না অমল। নিজের শরীরকে বহন করা যেন মৃতদেহ বহন করে যাওয়ার মতোই একটি একঘেয়ে কাজ। সামান্য একটু ক্ষমার দরকার ছিল তার। পাওয়া গেল না।
তুমি এখনও বসে আছ যে! গোছগাছ করবে না?
মানুষ যখন রেগে যায় তখন তার চেহারাটা যেন হয়ে ওঠে ক্ষুরধার। এখন যেমন, মোনার ফর্সা রং থেকে যেন হঙ্কা বেরিয়ে আসছে। তার উত্তাপ দূর থেকেও টের পাচ্ছে অমল। দুটো চোখ যেন চাবুকের মতো শিস টেনে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে। তীক্ষ্ণ নাকটা যেন বল্লমের মতো উদ্যত। আর সমস্ত শরীর যেন ঝংকার ভোলার জন্য সরোদের তারের মতো টানটান।
ভয় আর একটু মুগ্ধতা নিয়ে চেয়ে থাকে অমল। এই তো তার রণাঙ্গন। ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমাগত যুযুৎসু। তার স্ত্রী। কিন্তু সে অর্জুনের মতোই যুদ্ধবিমুখ। তার জয়স্পৃহা নেই। ক্ষাত্ৰতেজ নেই। বীরত্ব নেই। দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়ানো সে এক হেরো মানুষ।
খুব বিনয়ের সঙ্গে সে বলে, গোছানোর তো কিছু নেই। একটা মাত্র অ্যাটাচি কেস।
তা হলে দেরি না করে তৈরি হয়ে নাও। দুপুরের আগেই বেরিয়ে পড়তে হবে।
যুদ্ধ না করেই সে বশ্যতা স্বীকার করে নেয়, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। দুপুরের এখনও দেরি আছে।
তোমার মেয়ে কিন্তু গোঁজ হয়ে বসে আছে। উঠছেও না, গোছগাছও করছে না। দয়া করে মেয়েকে একটু শাসন করো। নইলে–
