উনি আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন তোমার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়েছে কিনা।
কে জিজ্ঞেস করছিল?
শ্বশুরমশাই। কী লজ্জার কথা বলো তো!
লজ্জা! লজ্জার কী আছে? তুমি কি ওদের পরোয়া কর?
করি না। কিন্তু তুমি ওঁর ঘরে গিয়ে শেলটার নিলে কেন?
ব্যাপারটা ওরকম নয়।
কীরকম?
আমার ভাষার জোর কম, এক্সপ্রেশনও হয় না। ভাবছি তোমাকে বোঝাতে পারব কিনা। এসব অদ্ভুত কথা বুঝতে গেলে তোমাকেও অনেকটা এগিয়ে আসতে হবে। তার চেয়ে থাক। ধরে নাও আমাকে একটা পাগলামিতে পেয়ে বসেছিল।
পাগলামি তোমাকে যে পেয়ে বসছে তা বুঝতে পারছি। মাঝরাতে তুমি কোথায় গিয়েছিলে? টু এনি গার্ল ফ্রেন্ড? পারুল নয় তো! শুনেছি ওর হাজব্যান্ড চল গেছে।
ভারী অবাক হয়ে চেয়ে থাকে অমল। পারুল! মোনা কি এখনও পারুলের সঙ্গে তাকে সন্দেহ করে? তার ধারণা ছিল পারুল সম্পর্কে মোনার কোনও সন্দেহ নেই। পারুল যে একজন দেবী তা মোনা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু আজ সকালে এ কী শুনছে সে?
ব্যথাতুর মুখে অমল বলল, তাই কি হয়! ওরকম ভাবতে নেই।
বাধ্য হয়ে ভাবছি। তুমিই ভাবিয়ে তুলছ।
মাথা নেড়ে ম্যান্তামারা অমল শুধু দিশাহারার মতো বলল, ভাবতে নেই, ওরকম ভাবতে নেই।
তাহলে কী ভাবব তা তুমিই বলে দাও।
বেরিয়ে পড়েছিলাম। অনেকটা হটলাম। ফিরে এলাম। বাবা ডেকে বলল, আমার বিছানায় শুয়ে থাক। আমিও বাচ্চা ছেলের মতো গিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঠিক এইরকম ঘটেছিল।
আমার আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না। আজই কলকাতায় যেতে চাই।
আজই? এখনও কয়েকদিন ছুটি আছে।
ছুটি থাকলেই কি এখানে পড়ে থাকতে হবে নাকি? আমার আর এখানে ভাল লাগছেনা। আমি যাব।
কলকাতায় গেলেই কি সব সমাধান হয়ে যাবে!
না, তা হবে না। তোমার সঙ্গে আমার আর রি-কনসিলিয়েশন হওয়ার নয়, জানি। কিন্তু আমার আর এ জায়গাটা ভাল লাগছে না। সোহাগকে নিয়েও প্রবলেম হচ্ছে।
ঠিক আছে।
আমি গোছগাছ করছি কিন্তু।
করো।
মোনা চলে যাওয়ার পর রোদে ভরা বিছানাটায় চুপ করে বসে রইল অমল। না, গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় যেতে হচ্ছে বলে তার কোনও প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। ম্যান্তামারা অমলের এখন আর তেমন কোনও পছন্দ-অপছন্দ নেই। সবই সমান বলে মনে হয়।
জানালা দিয়ে রোদ আসছে, ঠান্ডা হাড়কাঁপানো হাওয়াও আসছে। শরীর কেঁপে যাচ্ছে শীতে। তবু গায়ে কোনও চাপা দিল না সে। জানালা দিয়ে বাবার ঘরের পিছন দিককার বাগানটার দিকে চেয়ে রইল সে। বাগানে হলুদের বন্যা বইছে, গাঁদা ফুল ফুটে আছে মেলা। একটা বারোমেসে শিউলি গাছও রয়েছে বেড়ার কাছ ঘেঁষে। শরতে গাছ ভরে ফুল ফুটত, অন্য সময়ে কম হলেও সারা বছরই দু-চারটে করে ফুল হত। পুরনো গাছটা মরে গেছে। তার বীজ বা কলম করে আবার গাছ বানানো হয়েছে। খুব মন দিয়ে গাছটাকে দেখছিল সে। ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে গাছ, তলায় বিছিয়ে আছে সাদা কার্পেটের মতো।
বাবা!
উঃ! বলে গভীর অন্যমনস্ক চোখ ফেরাল অমল।
মা বলছে আমরা নাকি আজ কলকাতায় যাচ্ছি।
সোহাগকে যেন কতদিন পর দেখল অমল। মেয়েটা যেন একটু রোগা আর লম্বা হয়ে গেছে। রুখু চুল, পরনে একটা ধূসর নাইটি।
হ্যাঁ।
ডিসিশনটা কার?
তোমার মায়ের।
আমরা কেন যাচ্ছি?
তা তো জানি না। তোমার মা যেতে চাইছেন।
সেখানে তো আমাদের এখন কোনও কাজ নেই। তোমারও তো ছুটি।
হ্যাঁ।
তাহলে?
তুই কি এখানে থাকতে চাস?
আমার তো এখানটাই ভাল লাগছে।
ওঃ। তাহলে সেটা তোর মাকে বলে দেখ।
মা খুব অ্যাডামেন্ট।
অমল জলে-পড়া মুখ করে অসহায়ের মতো বলে, তাহলে?
আমি তাহলে এখানে একাই থাকব। পারমিশন দেবে?
খুব অবাক হয়ে যেন পারমিশন কথাটা জীবনে এই প্রথম শুনছে– এমন মুখ করে অমল বলে, পারমিশন!
হ্যাঁ। তোমাদের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমি আরও কয়েকদিন এখানে থাকতে চাই।
ও! তাতে অসুবিধে কী?
তা তো বুঝতে পারছি না। মা আমাকে নিয়ে যেতে চাইছে।
তাহলে?
তুমি মাকে বলো।
মেয়ের মুখের দিকে খুব নিবিষ্টভাবে চেয়ে থেকে অমল বলে, তোর কি এ-জায়গাটা ভাল লাগছে?
হ্যাঁ। খুব ভাল লাগছে।
তোর মা বলছিল তোর নাকি কীসব প্রবলেম হচ্ছে এখানে।
কোনও প্রবলেম হচ্ছে না তো!
হচ্ছে না?
না।
অ্যান্টিসোশ্যাল ছেলেরা কি ডিস্টার্ব করছিল?
হ্যাঁ। কিন্তু তারা এখন আমার বন্ধু হয়ে গেছে।
বন্ধু?
হ্যাঁ। দাদু, পিসি, জেঠিমা সকলের সঙ্গেই আমার বেশ ভাব। আমার কোনও প্রবলেম হচ্ছে না।
ও। বলে অমল ফের অসহায়ের মতো চেয়ে থাকে। ঘটনার লাগাম তার হাতে নেই। সোহাগ কি তা জানে না? তবু শিখণ্ডীর মতোই তাকে ব্যবহার করতে চাইছে।
তুমি, মা, বুডঢা তোমরা চলে যাও। আমি এখানে বেশ থাকতে পারব কয়েক দিন।
একা থাকবি?
একা! একা কোথায়! বাড়ি ভর্তি এত লোক!
হ্যাঁ, তা তো ঠিকই। কিন্তু ওদের সঙ্গে তো আমাদের ঠিক অ্যাডজাস্টমেন্ট ছিল না।
মার সঙ্গে এখনও নেই। কিন্তু আমার সঙ্গে হয়ে গেছে।
সামান্য কৌতূহল বোধ করে অমল প্রশ্ন করে, তুই কি সকলের সঙ্গে কথা বলিস?
কেন বলব না?
ঘরে-টরে যাস!
হ্যাঁ তো। সকলের ঘরে যাই। কত গল্প হয়।
অমল অবাক হয়ে বলে, খুব আশ্চর্যের কথা।
কেন, অবাক হওয়ার কী আছে?
না, আমি ভেবেছিলাম আমার লোকজনের সঙ্গে চলতে তোদের খুব অসুবিধে হবে।
আমার অসুবিধে হচ্ছে না। তুমি মাকে একটু বুঝিয়ে বলবে?
বলব। তবে হয়তো আমার কথাটার গুরুত্ব হবে না। আমি কাউকে কিছু বুঝিয়ে বলতে পারি না। কেউ বুঝতে চায়ও না।
