কী করব ভাই, তোমাদের গোমড়া মুখ দেখে ইদানীং বড্ড ভয় হত। সাহেব মেমদের দেশ থেকে এসেছ, পেটে কত বিদ্যে, আমরা তো কোন অন্ধকারে পড়ে থাকা জীব। তাই সমানে সমানে কথা কওয়ার চেষ্টা করিনি।
ঠাকরোন, আজ আর বিদ্যে-বুদ্ধি-চাকরি আমার কোনও গয়না নয়। মনে হয় ওসব দিয়ে কিছু হয় না।
বল কী গো! কিছু হয় না মানে! তোমার কি কিছু হয়নি! কত নামডাক, কত দায়িত্বের কাজ, যখন তখন বিলেত আমেরিকা চলে যাচ্ছ! তবু বলছ কিছু হয় না? আর কী হবে?
সেটাই তো ভাবছি।
তোমার সব বিদঘুটে কথা! তোমার দাদাও সেদিন বলছিল, অমলটার কী হয়েছে কে জানে, মুখে কখনও হাসি নেই। তুমি আজকাল সত্যিই হাসোনা, কেন বল তো!
আজ তো বেশ হাসিখুশিই আছি ঠাকরোন, তাই না?
তা বাপু, সত্যি কথা, বহুকাল পর আজ তোমাকে একটু হাসিখুশি দেখছি। শ্বশুরমশাইয়ের বিছানার তাহলে গুণ আছে।
অমল আস্তে আস্তে গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, কথাটা খুব ভুল বলনি তুমি কাল নিশি-পাওয়ার মতো মাঝরাতে বেরিয়ে পাগলের মতো কোথায় কোথায় ঘুরেছি কে জানে! ফিরে এসে হঠাৎ বাবার কাশির আওয়াজ শুনে জানলাটার কাছে এসে দাঁড়ালাম। বাবার সঙ্গে বহুকাল সম্পর্কই তো নেই। জন্মদাতা বাপ, তার যে আর কোনও প্রয়োজন আছে জীবনে তাই তো ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু কাল রাতে হঠাৎ ইচ্ছে হল, আচ্ছা, বাবা কী করছে একটু দেখি।
কেন হঠাৎ ইচ্ছেটা হল?
কোনও কারণ নেই। এমনই হঠাৎ ইচ্ছে হল। বাবা জেগেই ছিল। আমাকে ঘরে ডেকে এনে বসাল। কীসব কথাবার্তা হল তা ভাল মনে নেই। তারপর বাবা নিজেই বলল, আমার বিছানায় শুয়ে থাক। আর সেই কথাটা শুনেই আমার এমন লোভ হল যে আপত্তি না করে সোজা এসে শুয়ে পড়লাম। কী বলব তোমাকে, শুতে না শুতেই ঘুম। বহুকাল এমন নিশ্চিন্তে বাচ্চাছেলের মতো ঘুমোইনি।
বউদি একটু হেসে বলল, হ্যাঁ, খুব ঘুমিয়েছ বাপু। তিন-চারবার ডাকতে হয়েছে ঘুম থেকে তুলতে।
বিছানাটা মোটেই ভাল নয়। তোশক পাতলা, লেপটাও পুরনো বলে ওম নেই, শক্ত বালিশ, তবু আশ্চর্য ঘুম হয়েছে কিন্তু। বিছানার গুণই হবে, কী বল!
শোনো বাপু, তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর ওই আলাদা শোওয়াটা মোটেই ভাল দেখাচ্ছে না। আজ থেকে দুজনে একসঙ্গে শোও।
তাতেই সমস্যার সমাধান হবে?
সমস্যা আবার কীসের? স্বামী-স্ত্রীর মন কষাকষি হয়ই, আবার মিটেও যায়। শুয়েই দেখো না। অনেক সময়ে শরীর কাছাকাছি হলে মনও কাছাকাছি হয়।
তোমাকে আজ বিছানায় পেয়েছে দেখছি। কিন্তু মোনার আর আমার মধ্যে সমস্যাটার সমাধান শুধু বিছানা দিয়ে যে হওয়ার নয় ঠাকরোন। মাঝখান দিয়ে নদী বইছে।
শুধু হেঁয়ালি কথা!
একটু হেঁয়ালি যে থেকেই যাচ্ছে।
হ্যাঁ গো ঠাকুরপো, চাটুজ্যে বাড়ির মেয়েটার কথা কি তুমি এখনও ভুলতে পারনি?
অমল একটু চুপ করে থেকে বলল, মোনারও ধারণা আমি মনে মনে পারুলের কথাই ভাবি। কিন্তু পারুল কোনও বাধা নয়, পারুল কোনও কারণ নয়।
তোমার আর মোনার মধ্যে তো ঝগড়াও হয় না কখনও। শুধু মিলমিশের একটু অভাব।
ঝগড়া হলে তো বুঝতাম ভাবও আছে। কিন্তু ওই যে বললাম, মাঝখানে নদী বইছে।
আবার হেঁয়ালি! এখন ওঠো, ঘরে যাও। মোনা হয়তো রাগ করে আছে।
ও সবসময়ই রাগ করে থাকে।
আর এক কাপ চা খাবে?
দেবে?
কেন দেব না? ওপরে যাও, পাঠিয়ে দিচ্ছি।
অমল উঠল। হাই তুলল, আড়মোড়া ভাঙল।
ধীরে ধীরে দোতলায় উঠে এল অমল। সামনেই প্রথম ঘরটা মোনার। দরজায় মোটা পর্দা ঝুলছে। সন্তর্পণে ঘরটা পেরিয়ে পাশের ঘরে ঢুকল অমল।
ঢুকেই থমকে গেল। ঘরে মোনা দাঁড়িয়ে।
তুমি কি বাড়ির লোকের কাছে এটাই প্রমাণ করতে চাও যে, তোমার আর আমার সম্পর্ক ভাল নয়?
অমল অবাক হয়ে বলে, সেটা কীসে প্রমাণ হল?
শুনলাম তুমি মাঝরাতে শ্বশুরমশাইয়ের ঘরে গিয়ে তাকে তুলে দিয়ে তার বিছানায় শুয়েছিলে?
হ্যাঁ। অনেকটা তাই।
তোমার কি কাল রাতে খুব নেশা হয়েছিল?
খুব বেশি নয়। কেন, কী হয়েছে?
লোকে কী ভাবল সেটা ভেবে দেখেছ?
কথাটা ম্যান্তামায়া না ম্যাদামারা? যা-ই হোক, কথাটার মানে আগে বুঝতে পারত না অমল। আজকাল একটু একটু পারে। ম্যান্তামারা মানে বোধ হয় ঠান্ডা মেরে যাওয়া ফ্রিজ বা ফ্রিজিড হয়ে যাওয়া মানুষ, যার কোনও ব্যাপারেই তেমন কোনও তীব্র বা মৃদু প্রতিক্রিয়াও হয় না। যেমন গাছ বা ইট কাঠ। সকালের তেরছা তীব্র রোদের মস্ত চৌখুপি বিছানা জুড়ে এবং বিছানা ছাড়িয়ে ঘরের মেঝে অবধি এসে পড়েছে। ঝলমল করছে ঘর। তার আলোয় মধ্যবয়সি, প্রায় যুবতী এবং অসম্ভব ফর্সা মোনালিসাকে খুব তীব্র দেখাচ্ছে। কাটা কাটা মুখ-চোখের মোনাকে সুন্দরীই বলতে হবে। যদিও লাবণ্য জিনিসটার অভাব আছে। সে যাই হোক, মোনা এক তীব্র রূপের নারী এবং এখন তার চোখে অপমান এবং তজ্জনিত রাগ ঝলসাচ্ছে। অমলের এক ব্রিটিশ বন্ধু ড্যান তাকে প্রায়ই বলত কিস হার, এ কিস সলভস এভরিথিং। মুষ্টিযোগটা বহুবার প্রয়োগ করে দেখেছে অমল। কখনও কাজ হয়েছে, কখনও হয়নি। প্রেমহীন চুম্বনের বোধহয় কোনও বার্তা নেই।
এখন অবশ্য চুমু খাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। নিজের ভিতরে ভিজে, স্যাঁতা ম্যান্তামারা ভাবটা এমন পাথর হয়ে আছে যে মনে হয়, এত উদ্যোগ নেওয়ার কোনও মানেই হয় না। চুম্বনও যেন শ্রম। কঠোর শ্রম।
