এখানে কটা ভূত আছে বলো তো!
তা আছে বাপু। সুধীর ঘোষ, ফটিক কাঞ্জিলাল, ইলাবতী, সোমেশ্বর আরও কতজনা।
বাপ রে! এত ভূত! গাঁয়ে তো তা হলে ভূতের মচ্ছব পড়ে গেছে।
ঠাট্টা কোরো না তো, ভাল লাগে না। ভূত-প্রেত নিয়ে ইয়ার্কি নয়।
খুব হাসল অমল। তারপর বলল, বাইরের ভূত নয় গো ঠাকরোন, এ ভূত আমার মাথার মধ্যে ভর করেছে।
হ্যাঁ ঠাকুরপো, তুমি নাকি রাত-বিরেতে বেরিয়ে যাও!
হ্যাঁ তো৷ ঘুম না এলে বেরিয়ে পড়ি।
ধন্যি তোমার সাহস!
গাঁ-দেশে কি রাত-বিরেতে লোকে বেরোয় না?
তা বেরোয়। ঠাকুর-দেবতার নাম করতে করতে বেরোয়। তুমি তো বাপু আবার নাস্তিক। নাস্তিক— হওয়া মোটেই ভাল নয়, জানো?
নাস্তিক হলে কী হয় ঠাকরোন?
নাস্তিকরা যেন কেমনধারা হয় বাপু!
কেমনধারা হয় ঠাকরোন?
বড্ড রুখো-শুখো, কাট কাট কথা কয়, কাউকে মান্যিগন্যি করে না।
আমিও কি ওরকম ঠাকরোন?
বলতে ভয় পাই, তুমিও আছ একটু ওরকম।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। ছেলেবেলায় ভগবানে ভারী ভক্তি ছিল তার, ভয়ও ছিল। সরস্বতী পুজোয় অঞ্জলি দিত কত নিষ্ঠার সঙ্গে। পরে দেখল, যারা সরস্বতীর নামও জানে না সেইসব সাহেবরা বিদ্যাবত্তায় অনেক এগিয়ে আছে। তখন সরস্বতীর ওপর ভরসা উবে গেল।
আমি ঠিক নাস্তিক নই ঠাকরোন। ভগবানকে বিশ্বাস করার চেষ্টা কিছু কম করিনি। কিন্তু দুনিয়ার কোথাও ভগবানের টিকির ডগাটিরও চিহ্ন খুঁজে পাই না যে! তবু নাস্তিকও হতে পারিনি পুরোপুরি। মনে অনেক সংস্কার গেড়ে বসে আছে।
বউদি বড় বড় চোখ করে শুনছিল। গাঁয়ের মেয়ে, গাঁয়ের বউ। লেখাপড়া তেমন নয়। একটু ভালমানুষ গোছেরই ছিল একসময়ে। এখন সংসারের জাঁতাকলে পড়ে কেমন হয়েছে কে জানে! বলল, হ্যাঁ ঠাকুরপো, সোহাগও কিন্তু বড্ড ডাকাবুকো। একদিন মাঝরাতে বেরিয়ে গিয়েছিল, ঠিক তোমার মতো।
চমকে অমল বলে, কোথায় গিয়েছিল?
তা কী জানি! যখন ফিরল তখনও ভোর হয়নি। আমি তো ভয়ে সারা। ভাবলুম, হাওয়া বাতাস লেগেছে বুঝি!
অমল মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ, ও একটু খেয়ালি।
বেশি খেয়ালখুশি ভাল নয় বাপু। দিনকাল খারাপ পড়েছে। এ-গাঁয়ে আগে কোনও উৎপাত ছিল না। আজকাল ফচকে ছোঁড়াদের আড্ডা হয়েছে শুনতে পাই।
অমল নির্বিকারভাবে বলে, হ্যাঁ, তা জানি। সোহাগের ওপর ওদের নজর পড়েছে। চাটুজ্যেবাড়ির বিজু রুখে না দাঁড়ালে একটা ভালমন্দ কিছু হয়ে যেতে পারত।
অমল খানিকটা শুনেছে। গা করেনি। এরকম তো হতেই পারে। দুনিয়ায় মেয়েরা যত এগোবে ততই পুরুষের প্রতিরোধ বাড়বে, আর তা নানা বিকৃত পথ ধরে প্রকাশ পাবে। এ রকমই হওয়ার কথা।
অমল বলল, শুনেছি।
মেয়েকে একটু সামলে রেখো ঠাকুরপো, অত আলগা দিও না। কখন কোন সর্বনাশ ঘটে তার ঠিক কি!
অত ভয় পাও কেন ঠাকরোন? এখনকার মেয়েরা তোমাদের মতো নয়। তারা ঘর ছেড়ে বেরোতে শুরু করেছে সবে। একটু আধটু ওরকম ঘটনা এখন ঘটবেই। তারপর সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আমার মেয়েকে আমি স্বাধীনতা দিয়েই দিয়েছি। দুনিয়াটার ওপর ওর কতখানি অধিকার তা ও নিজেই বুঝে নেবে।
বড় বড় চোখে কথাগুলো শুনল বউদি। তারপর বলল, তোমাদের বড় সাহস ভাই। আমি কিন্তু পারতাম না।
না ঠাকরোন, তুমি পারোনি, পারবেও না। তোমার সময় কেটে গেছে। কিন্তু ভয় নিয়ে বেঁচে থাকাটা একটা অভিশাপ। তোমাদের জীবনটা নানা ভয়-ভীতি নিয়েই কেটে যাবে। কিন্তু পরের জেনারেশনের মেয়েরা ভয় নিয়ে বাঁচতে চাইছে না যে!
কী জানি বাপু, অত কথা তো বুঝতে পারি না। মেয়েদেরই যে বিপদ বেশি।
বিপদে না পড়লে কি বিপদ কাটে?
বউদি কথাটা মানল না বোধহয়। তবে তর্কও করল না। বলল, এখন চা খেয়ে ওপরে যাও। মোনা তোমার খোঁজ করছিল।
আমি যে এ ঘরে আছি তা কি জানে?
জানে। বাবা বলেছে। শুনে মোটেই খুশি হয়নি।
অমল একটু হেসে বলল, আমার বউ সহজে খুশি হয় না।
আচ্ছা ঠাকুরপো, তুমি আলাদা ঘরে শোও কেন? বর-বউ এক বিছানায় শোও না কেন?
সেটা কি নিয়ম?
ও মা! বলে কী রে! সেটা নিয়ম নয়?
না শুলে ক্ষতি কী?
শোনো কথা! বর বউ এক বিছানায় না শুলে কি ভাব-ভালবাসা গাঢ় হয়?
অমল হেসে ফেলে, এক বিছানা ছাড়া ভাব-ভালবাসা হয় না নাকি?
কী জানি বাপু, তোমাদের সব অদ্ভুত কথা! বলি বিছানাটাও তো একটা কাছে-থাকা, তা নয়?
অমল ম্লান হেসে বলল, আমাদের তো সেরকম মনে হয়নি। অনেক সময়ে আমার কাজ থেকে ফিরতে দেরি হত। কখনও কখনও মধ্যরাতে ফিরেছি। তখন কারও ঘুম ভাঙিয়ে ভাব-ভালবাসা করতে গেলে উলটো ফল হতে পারত। তাই আলাদা বিছানায় শোওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। ব্যাপারটা খুব একটা হাইজিনিকও নয় কিন্তু।
কেন, হাইজিনিক নয় কেন?
পরস্পরের শ্বাস দেওয়া নেওয়া কি ভাল। তা ছাড়া কারও কোনও কন্টেজিয়াস ডিজিজ বা খারাপ অভ্যাস থাকতে পারে।
সে আবার কী?
ধরো কেউ ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছোড়ে, কারও হয়তো নাক ডাকে, কিংবা মুখে দুর্গন্ধ বা দাঁত কড়মড় করে…
থাক থাক, আর ফাড়াকাটতে হবে না বাপু। কত কথাই যে জানো! বর-বউয়ের মধ্যে আবার ওসব অসুবিধে কোনও বাধা হয় নাকি! তোমার দাদার তো ভীষণ নাক ডাকে, তাতে তো আমার একটুও অসুবিধা হয় না। বরং একদিন নাকের ডাক না শুনলেই দুশ্চিন্তা হয়।
তুমি নমস্যা ঠাকরোন।
ইয়ার্কি হচ্ছে, না?
বহুকাল পর তোমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছি। বড় ভাল লাগছে। আর একটু বোসো। আজকাল তো তোমার সঙ্গে কথাই হয় না।
