না তো! ভোর কাকে বলে আমি তা জানিই না।
ভোরবেলার মতো এত সুন্দর সময় আর নেই। এ সময়ে ভগবানের সব জানালা দরজা খোলা থাকে। তুমি কেন ভোরে ওঠো না?
আজকাল ঘুম সহজে আসতে চায় না। কখনও মদ খেয়ে বা ওষুধ খেয়ে ঘুমোই। সেই ঘুম খুব বিচ্ছিরি। শরীরটা তখন আমার থাকে না। জড়বস্তুর মতো হয়ে যায়।
কিশোরী মেয়েটি জলে প্রায় স্থির ছবির মতো নৌকোটার দিকে চেয়ে রইল। বলল, তুমি যাবে?
কোথায় যাবো?
ওদের সঙ্গে?
ওরা কোথায় যাচ্ছে?
বড় গাঙে মাছ ধরতে।
যাবো।
পর মুহূর্তেই সে দেখল সেই আশ্চর্য নৌকায় সে লণ্ঠনের ধারে বসে আছে। বাবা আছে, দাদা আছে, কিশোরী মেয়েটিও বসে আছে ঠিক তার উলটো দিকে। আর নিতাই জেলে ছইয়ের ওপর থেকে জলে জাল ফেলতে গিয়েও দোনোমোনো করছে।
বাবা হাঁক দিল, ওরে নিতাই, জাল ফেলছিস না কেন?
জলে বড্ড বেশি মাছ বাবু। বিজবিজ করছে মাছ। রুই-কাতলা-মৃগেল কালবোশ। জাল টেনে তুলতে পারব কি?
দুর বোকা! মাছ ধরতেই তো আসা।
না বাবু। এত মাছ তুললে নৌকো ডুবে যাবে।
মেয়েটি জলের দিকে চেয়ে ছিল। হঠাৎ মুখ তুলে তার দিকে ফিরে বলল, জলে মাছ আছে, ক্ষেতে ধান আছে, চারদিকে কোথাও কোনও অভাব নেই।
অমলের মনটা বড্ড ভাল হয়ে গেল চারদিককার সম্পন্নতার কথা শুনে।
হঠাৎ বাবা বলল, এঃ চারটে টেক্কাই তোর হাতে। কল দে।
অমল দেখল তার হাতে তাস। তারা চারজন লণ্ঠনের আলোয় ব্রিজ খেলছে। নিজের হাতের তাস ভাল দেখতে পাচ্ছিল না সে। কেমন যেন হিজিবিজি তাস। দুটো জোকারের মুখও দেখতে পাচ্ছে সে। কোথায় চারটে টেক্কা?
এতক্ষণ দেখতে পায়নি। ছইয়ের ভিতরে মা রান্না করছিল। ডাক দিয়ে বলল, খোকা, কাঁকড়ার ঝোল হয়ে গেছে। খাবি আয়। ভাত বাড়ছি।
আমার কি খিদে পেয়েছে মা?
হ্যাঁ পেয়েছে। ছেলের খিদে মা ঠিক টের পায়।
তারপর আরও কী কী হল যেন। কী হল তা আর মনে নেই। স্বপ্নটা যেন জঙ্গলের মধ্যে কাঠুরেদের পায়ে-হাঁটা পথের মতো হঠাৎ হারিয়ে গেল।
দ্বিতীয় স্বপ্নটাও কিছু খারাপ নয়। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ একটা পার্টি দিচ্ছেন। বিশাল বড় একটা জায়গা–অনেকটা রোমান কলোশিয়ামের মতো। সেখানে হাজার হাজার মোম জ্বলছে আর অনেক লোক বাজনার তালে তালে হাততালি দিচ্ছে। রানি আসবেন বলে অপেক্ষা করছে সবাই। অনেক সাহেব মেমের সঙ্গে বিস্তর বাঙালিকেও দেখতে পাচ্ছে সে। অনেকে ধুতি পাঞ্জাবি পরা।
পাশে দাঁড়ানো এক সাহেব হঠাৎ তাকে পরিষ্কার বাংলায় বলল, আমার নাম স্টিফেন স্নাইডার। আমি একজন কমোডর। আপনি কে বলুন তো?
আমি অমল রায়। একজন ইঞ্জিনিয়ার।
আরে! আপনিই তো আজ রানির কাছ থেকে নাইটহুড পাবেন। আপনি তো বিখ্যাত লোক!
লোকটার মাথায় টাক, বেশ লম্বা, মুখে অমায়িক হাসি।
অমলের একবার মনে হল, ঠিক এরকম পার্টিতে কাউকে নাইটহুড দেওয়া হয় না। আবার মনে হল, কী জানি বাবা, হতেও পারে। নিয়মকানুন হয়তো বদলে গেছে।
অমল বলল, আচ্ছা, নাইটহুড নেওয়ার সময় কি হাঁটু গেড়ে বসতে হয়?
না না, ওসব নিয়ম আর নেই। তবে রানির গালে চুমু খেতে কোনও বাধা নেই।
নিয়মগুলো আমার ভাল জানা নেই।
লোকটা দুঃখ করে বলল, পুরনো আদবকায়দা উঠে যাচ্ছে। ওসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। নাইটহুড পেলে আপনার খুব বড় একটা প্রোমোশন হবে।
অমল খুশি হলে বলল, ধন্যবাদ।
এ আর এমন কী! আপনি তো এর পর নোবেল প্রাইজও পাবেন!
সে কী?
হ্যাঁ। আমার কাছে গোপন খবর আছে। শর্ট লিস্টে নাম উঠেছে।
অমল খুবই খুশি হল। নিজের সম্পর্কে তার ধারণা কখনও এতটা উঁচু ছিল না।
সমবেত তীব্র করতালির শব্দে অমল চমকে উঠে দেখল, একটা চমৎকার সাদা সিঁড়ি দিয়ে রানি নেমে আসছেন।
ওইখানেই স্বপ্নটা পাশ ফিরল। হারিয়ে গেল। যেমন হাটেবাজারে বাবার হাত-ছুট হয়ে বাচ্চা ছেলে মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়। ছেলে ফেরত পাওয়া যায় বটে, কিন্তু হারানো স্বপ্নকে ফের ধরা খুব মুশকিল। সে যেন ঝিলের ওপর দিয়ে উড়ে-যাওয়া কাটা ঘুড়ি। তাকে কি ধরা যায়! কতবার ঝিলের ধারে দাঁড়িয়ে হতাশ চোখে বেহাত ঘুড়ির দিকে চেয়ে থেকেছে অমল।
বাবার বিছানায় পাতলা তোশক, ওমহীন লেপের মধ্যে শুয়েও আজ বেলা পর্যন্ত খুব ঘুমোল সে।
তুমি কি এখনও ঘুমোচ্ছ?
চোখ চেয়ে অমল দেখে, বাইরে রোদের ঝাঁঝ বেড়েছে। ঘর আলোয় আলোময়। বউদি সামনে দাঁড়ানো। হাতে চায়ের কাপ।
এবার ওঠো। বেলা হয়েছে। চা এনেছি।
এই বউদির সঙ্গে তার এক সময়ে খুব খুনসুটির সম্পর্ক ছিল। ঠাট্টা, রঙ্গ রসিকতা খুব হত। আজকাল সবাই নিরাপদ দূরে সরে গেছে। তার অনেক বিদ্যে, অনেক বড় চাকরি, গাম্ভীর্য এইসব কিছুকে সবাই ভয় পায়।
অমল উঠে বসে এক গাল হেসে বলল, ঠাকরোন যে! বাব্বাঃ!
কত কাল পরে ঠাকরোন বলে ডাকলে বলো তো! ডাকটা মনে ছিল তা হলে!
খুব ছিল। বোসো, ওই চেয়ারটায় গ্যাঁট হয়ে বোসো, কথা কই।
চায়ের কাপটা তার হাতে দিয়ে দ্রুত দক্ষ হাতে মশারিটা চালি করে তুলে দিয়ে বউদি বলে, দু দণ্ড যে বসব তার কি উপায় আছে। কিন্তু কী ব্যাপার বলো তো ঠাকুরপো, তুমি বাবার বিছানায় এসে শুয়ে আছ যে!
অমল চায়ে চুমুক দিয়ে একটু লাজুক হেসে বলে, সে একটা কাণ্ড!
কী কাণ্ড?
কাল রাতে আমাকে বোধহয় ভূতে পেয়েছিল।
বড় বড় চোখ করে বউদি বলে, ওমা! বলো কী গো! কোন ভূতটা ধরেছিল তোমাকে?
