চশমাটা সবাই দেখত। হ্যাঁ রে, ভূত চশমা পরে কেন?
ধীরেন কাষ্ঠ হেসে ফেলে বলে, তা কে বলবে বলুন! তবে কথাটা ভাবার মতো, ভূতের আবার চশমা লাগে কীসে? তা হঠাৎ সুধীর ঘোষের কথা উঠছে কেন? কিছু দেখেছেন-টেখেছেন নাকি?
না। হঠাৎ মনে পড়ে গেল। আজকাল আলটপকা অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে যায়, যেগুলো মনে পড়ার কথাই নয়। একেবারে বিস্মরণ হয়ে যাওয়া কথাও পট করে কেন যে মনে পড়ে! তখন মনে হয় এসব বোধ হয় এ-জন্মের ঘটনাই নয়, আর জন্মে ঘটেছিল। কাল রাতে হঠাৎ সুধীর ঘোষের মুখখানা ভেসে উঠল চোখে। সেই থেকে ভাবছি।
আমিও খুব ভাবি। একাবোকা থাকলে, অন্ধকার ঘরে কি নিরালা রাস্তায় হঠাৎ সেই মিদ্দারের পো যেন কাছাকাছি চলে আসে। যেন ছোঁক ছোঁক করে, গা খুঁকে শুঁকে পিছু পিছু আসতে থাকে। তার বউটাও যেন ঘুরঘুর করে আশেপাশে। আর তখন সেই বর্ষার রাতটা যেন চোখের সামনে একেবারে জলজিয়ন্ত হয়ে ওঠে। যত বুড়ো হচ্ছি তত যেন মনস্তাপ বাড়ছে।
নাতনি বিন্তি একখানা থালার ওপর দু কাপ চা নিয়ে এল, সঙ্গে শস্তার টোস্ট বিস্কুট। আড়চোখে মহিম দেখল, ধীরেনের জন্য সেই ময়লা হাতলভাঙা কাপেই চা দিয়েছে, ওই কাপটায় বাড়ির কাজের মেয়েটা চা খায়। মনটা খারাপ লাগল। শত হলেও ধীরেন তো আর ওটোলোক ছোটলোক নয়। তাকে এত তাচ্ছিল্য করলে মহিমেরও যেন খানিকটা সম্মানহানি হয়। কিন্তু কাকে কী বলবে মহিম? আর বললেই বা শুনছে কে?
ধীরেনের অবশ্য তাপউত্তাপ নেই। ভারী আহ্লাদের সঙ্গেই সে যত্ন করে মুড়মুড় শব্দে বিস্কুট চিবোয়, সুভুত সুড়ুত করে আরামে চা খায়। নিজের বরাদ্দের দুখানা বিস্কুটের একখানা এগিয়ে দেয় মহিম, রোজকার মতোই বলে, নে, খা।
রোজকার মতোই ধীরেন লাজুক গলায় বলে, না, না, থাক। আপনি খান।
রোজের মতোই মহিম বলে, ওরে, আমার যে দাঁতের জোর নেই সেটা কি ভুলে যাস?
ধীরেন এক গাল হেসে বলে, ঠাকুরের দয়ায় আমার দাঁতগুলো এখনও আছে। কোনও গণ্ডগোল নেই দাঁতে। গণ্ডগোল হল, দাঁতের কাজ কমে গেছে।
কেন রে?
বুঝলেন না? চিবোনোর জিনিসই তো জোটে না। মাংস-টাংসর কথা তো ভুলতেই বসেছি, মাছের কাঁটা কি মুড়ো সেসবও তো আর চোখে দেখি না।
মহিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনটা ভাল নেই। ছেলেটা এখনও তার বিছানায় অসাড়ে ঘুমোচ্ছে।
.
২০.
আকাশে পাখি ফিরিছে গাহি, মরণ নাহি, মরণ নাহি। এই ধ্রুবপদ মাথার ভিতরে বিনবিন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে সর্বাঙ্গে। খুব মৃদু, শীতল, গুনগুন সুর। জুড়িয়ে যাচ্ছে শরীর, জুড়িয়ে যাচ্ছে মন। এ যেন গান নয়, মায়ের আঙুল। জ্বরে তপ্ত কপালে ঠান্ডা হাত। বড় ভরসা, বড় আশা, বড় সান্ত্বনা। মরণ নাহি, মরণ নাহি।
পাখি ডাকছে। তাদের প্রবল ডাকাডাকি আর ডানার চঞ্চল শব্দে কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে বাতাস। আলো ফুটছে ক্রমে। ঘরে পাঁশুটে একটু ময়লা রং। তার মধ্যেই হঠাৎ জানালার ফাঁক দিয়ে তপ্ত লোহার রডের মতো লাল একটা রেখা এসে পড়ল মশারির গায়ে।
লেপের ওমের ভিতর থেকে মুখ বের করে এইসব নৈমিত্তিক দৃশ্য ও শব্দ ঘুমচোখেই সে লক্ষ করে ফের চোখ বোজে। মনে হয়, বহুকাল পরে একটা সুপ্রভাত এল বুঝি। এত সুন্দর ভোর বহুকাল দেখেনি সে।
এ-ঘরে চড়াই পাখির বাসা হয়েছে। বন্ধ ঘরে তাদের পুরীষ ও গায়ের বোঁটকা গন্ধ। জানালার সামান্য ফাঁক দিয়ে তাদের প্রবল যাতায়াতের শব্দ ও পরস্পরের ডাকাডাকিতে একটুও বিরক্ত হচ্ছিল সে। কত জীবন, কত রকমের জীবন চারদিকে! পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ, জীবজন্তু, সরীসৃপ। আকাশে পাখি ফিরিছে গাহি, মরণ নাহি, মরণ নাহি…।
কোথায় কবে শুনেছিল এই লাইন? মনেও ছিল না তো! হঠাৎ কোন গভীর অবচেতনা থেকে উঠে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার দেহ-প্রকোষ্ঠে! মরণ নাহি, মরণ নাহি। এ কি মধুর মিথ্যা! নাকি সত্যিই এ জীবন মৃত্যুহীন?
মৃত্যুহীন কি জীবন হয়? কখনও নয়, কখনও নয়।
আধোঘুমে সে অনুভব করে মাথার নীচে অচেনা বালিশ। নিচু, চ্যাপটা, শক্ত। বালিশের ওপরেশস্তা খসখসে টার্কিস তোয়ালে থেকে তিলতেলের মৃদু গন্ধ আসছে। পাতলা তোশকের জন্য পিঠে ফুটছে তক্তপোশের তক্তা। লেপটার তেমন ওম নেই। পুরনো তুলো জায়গায় জায়গায় দলা পাকিয়ে ফাঁকফোকর তৈরি হয়েছে। তবু এই বিছানায় মধ্যরাত থেকে অঘোরে ঘুমিয়েছে সে। বাচ্চা ছেলের মতো। স্বপ্নও দেখেছে। একটাও দুঃস্বপ্ন নয়। অথচ দুঃস্বপ্ন ছাড়া খুব কম রাতই কাটে তার। ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে ভয়ে, আতঙ্কে উঠে বসে সে। বুক ধড়ফড় করে, জিব শুকিয়ে যায়। মৃত্যুর স্বপ্ন যেন বিজবিজ করে তার অস্বস্তিকর ঘুমের মধ্যে।
অনেক দিন বাদে এই অচেনা বিছানায় শুয়ে একটা-দুটো ভাল স্বপ্ন দেখেছে সে।
দেখল, খুব ভোরবেলা সে একটা সাঁকোর ওপর রেলিং-এ ভর দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। নীচে কুয়াশায় আবছা এক নদী। একখানা নৌকো খুব ধীর দোলে চলে যাচ্ছে। নৌকোয় একখানা হলুদ লণ্ঠন জ্বলছে। লণ্ঠন ঘিরে মুড়িসুড়ি দেওয়া কয়েকজন মানুষ। ধীরে ধীরে নৌকোটা কুয়াশার আবছায়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। সবটাই যেন একখানা ওয়াশ-এর ছবি। বাস্তব পরাবাস্তবে মেশামেশি। খুব রোমান্টিক।
তার পাশে দাঁড়ানো একটি মেয়ে। ঘোমটায় ঢাকা মুখ। কিশোরীর ফিনফিনে চিকন গলায় নরম স্বরে সে বলে, তুমি খুব ভোরে ওঠো বুঝি?
