মহিমের হঠাৎ মনে হল, অমল তাকে উদ্দেশ করে নয়, সম্পূর্ণ বে-খেয়ালে আপন মনেই কথা বলে যাচ্ছে। ও কি একা কথা বলে? ও কি সুধীর ঘোষের পুনর্জন্ম?
মহিম নড়েচড়ে বসে। মন থেকে অলক্ষুণে চিন্তাটাকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করতে করতে বলে, সব কিছুরই পরিণতি আছে। ধ্বংস হয়, আবার জন্মায়। শাস্ত্রে ওকে কল্পান্ত বলে।
অমল কথাটা কানে তুলল না। শুনতেই পেল না বোধ হয়। তেমনই বিভোর হয়ে বলতে লাগল, একটা হাহাকার শুনতে পাচ্ছিলাম। যেন চারদিকে হায় হায় শব্দ। বিষাদ-সিন্ধুতে যেমন ছিল।
ওসব ভাবতে নেই।
আমি যেন চারদিকে কুলক্ষণ দেখতে পাচ্ছি।
তুই বিজ্ঞানের ছাত্র, বিজ্ঞান আমাদের কাণ্ডজ্ঞান আর বাস্তববুদ্ধিই তো দেয়। মনটাকে দুর্বল হতে দিস কেন, নির্মোহ বিজ্ঞানের চোখে দুনিয়াটাকে বিচার কর। দেখবি মনটা সহজ হয়ে গেছে।
অমল একথাটাও যেন শুনতে পেল না। শুধু আপনমনে বলল, এত ভ্যাকুয়াম, এত ফাঁকা, এত অর্থহীন কেন যে লাগছে!
মহিম বলল, আয়, এখানেই শুয়ে পড়।
একথাটা শুনতে পেল অমল। বলল, শুয়ে পড়ব।
হ্যাঁ, শুয়ে পড়।
এটা তো আপনার বিছানা।
তাতে কী? তুই শো।
আপনি কোথায় শোবেন?
আমি আর শোব না। ঘুম যেটুকু হওয়ার হয়ে গেছে। রাত সোয়া তিনটে বাজে এখন। আমি তো ভোর চারটেয় উঠে পড়ি।
অমল হঠাৎ লোভাতুর চোখে চেয়ে বলল, শোব?
হ্যাঁ। বলছি তো, শুয়ে থাক।
অমল চটিজোড়া ছেড়ে হামাগুড়ি দিয়ে মশারির তলায় ঢুকে গায়ে লেপটা টেনে বাচ্চা ছেলের মতো শুয়ে পড়ল। এবং প্রায় দু মিনিটের মাথায় ঘুমিয়ে পড়ল। ছেলের নাকের ডাক শুনতে পেল মহিম।
মদটা কি একটু বেশি মাত্রায় খেয়ে ফেলেছে আজ? তাই হবে বোধহয়। যদিও কথাগুলো ঠিক মাতালের মতো বলছিল না। কিন্তু মদের একটা ঘোর আছে বোধহয়।
মহিম একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। দূরে দূরে ছিল বেশ ছিল। দুশ্চিন্তা করতে হত না। কিন্তু এই যে আজ রাতে কাছে এল, এত কথা বেরোল পেট থেকে এইতেই মনটা খচ খচ করে। আবার এই বুড়ো বয়সে নতুন নতুন দুশ্চিন্তা এসে মাথায় চাপে।
ভোর হল। তারপর বেলাও গড়িয়ে গেল অনেকটা। মহিম পুজোপাঠ সেরে রোদের উঠোনে চেয়ার পেতে বসে সকালটাকে পেকে উঠতে দেখল। মনটা ভাল নেই। ছেলেটা কষ্ট পাচ্ছে।
আজকাল প্রায় প্রতিদিনই সকালে ধীরেন এসে হানা দেয়। বাড়িতে তার আদর নেই। অভাবের সংসার। সকালে চা-টুকু অবধি জুটতে চায় না। তাই একটু চায়ের লোভে এতটা পথ ঠেঙিয়ে আসে। আজও এল।
এ-বাড়ির কেউ ধীরেনকে পছন্দ করে না। একে তার জামাকাপড় নোংরা। তায় সকলের ধারণা ধীরেন লোভী, হ্যাংলা। মাঝে মাঝে ধারকর্জ চায়, শোধ দিতে পারে না বলে বদনামও আছে তার। তবে ধীরেন পাঁচ-দশ টাকার বেশি ধার চায় না কখনও। তাই দিতে গায়ে লাগে না বড় একটা।
আর কেউ পছন্দ না করুক, ধীরেন এলে মহিম খুশি হয়। তোক যেমনই হোক, পুরনো মানুষ তো! কত কালের চেনা। খানিকটা বন্ধুর মতোই ছিল এক সময়ে। আবার ঠিক বন্ধুও নয়। আজ্ঞাবাহী ছিল খুব। ফাইফরমাশ খেটে দিত হাসিমুখে। এখন বুড়ো হয়েছে, কিন্তু সেই বশংবদ ভাবটা যায়নি।
আজ সকালের ফর্সা আলোয় কালো ধীরেনকে দেখে মহিম অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশি খুশির গলায় বলল, আয় ধীরেন, বোস।
ধীরেন কষ্টে সসংকোচে মোড়াটা টেনে নিয়ে বসল। মুখে গ্যালগ্যালে হাসি। গায়ে একটা উলোঝুলো পুরনো ঢলঢলে পুলওভার। মাথায় বাঁদুরে টুপি। পরনে ধুতি। বহুরূপীর মতোই দেখাচ্ছে।
পুরনো দিনের কথাই হয় বেশির ভাগ।
হ্যাঁ রে ধীরেন, তোর সুধীর ঘোষের কথা মনে আছে?
খুব। সেই ম্যাথেমেটিশিয়ান তো!
হ্যাঁ।
ওরকম মাথাওলা লোক আর এ-গাঁয়ে হয়নি।
তার কথা সব মনে আছে?
থাকবে না? যত বুড়ো হচ্ছি পুরনো দিনের কথা ততই ফুটে উঠছে। আশ্চর্য ব্যাপার।
তুই কখনও সুধীর ঘোষের ভূতকে দেখেছিস?
খুব দেখেছি।
মহিম হাসল, কোথায় দেখেছিস?
উফ সে কথা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়।
বটে!
পাশের গাঁয়ে সেবার যাত্রাপালা এসেছিল নদের নিমাই। কী একটা নামকরা দল এসেছিল। পালা শেষ হতে হতে রাত দুটো। তিনজনে মিলে ফিরছিলাম। সুনসান রাত্তির। সঙ্গের দুজন কুমোরপাড়ার কাছে এসে অন্য দিকে চলে গেল। আমি একা।
হ্যাঁ, তোর যাত্রার খুব নেশা ছিল বটে।
এখনও আছে। হলেই যাই।
তারপর বল।
চৌধুরীদের পুকুরের ধার বরাবর রাস্তা দিয়ে আসছি। ওদিকটায় তখন খুব জঙ্গল ছিল। ফলসা গাছের বন ছিল। মনে আছে?
তা থাকবে না! খুব মনে আছে।
সে জায়গায় দিনমানেও তখন লোক চলাচল ছিল না। আপনমনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে আসছিলাম। হঠাৎ সামনে রশিখানেক তফাতে দেখলুম একটা লোক নিচু হয়ে কী যেন কুড়োচ্ছে।
কুড়োচ্ছে?
হ্যাঁ। সেরকমই ভঙ্গি। তা আমি একটু এগিয়ে গিয়ে বললুম, কে ওখানে? কেউ জবাব দিল না। তখন বললুম, কিছু হারিয়ে থাকলে তো আর এই অন্ধকারে খুঁজে পাবেন না মশাই। এখন বাড়ি যান, কাল সকালে খুঁজবেন এসে। তখন লোকটা হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকাল।
অন্ধকারে দেখলি কী করে?
খুব জ্যোৎস্না ছিল তখন। ফটফটে পরিষ্কার দুধ-জ্যোৎস্না। স্পষ্টই দেখলুম। সুধীর ঘোষ দাঁড়িয়ে। চোখে গোল চশমা। আমার দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল। শরীর এমন ঠান্ডা মেরে গেল ভয়ে যে নড়তে-চড়তে পারি না, গলার স্বর ফুটছে না। হার্টফেল যে হইনি সেই ঢের। তবে বেশিক্ষণ নয়, যেমন হঠাৎ দেখা গিয়েছিল তেমনই হঠাৎ মিলিয়ে গেল বাতাসে। রাম নাম করতে করতে আর ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরে আসি।
