ব্যক্তিগত ব্যাপারে বেশি প্রশ্ন করাটা আজকাল কেউ বিশেষ পছন্দ করে না। তাতে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়ে যায়।
অমল অবশ্য উদাস মুখে চেয়ে থেকে বলল, নানারকম চিন্তা করে করে এরকম হয় মাঝে মাঝে।
এর পরের স্বাভাবিক প্রশ্ন হতে পারত এই চিন্তা কীসের বা কেন এত চিন্তা করিস গোছের কিছু। মহিম প্রশ্নটা করতে গিয়েও সতর্ক হল। নিজের এই মেধাবী ও উজ্জ্বল ছেলেটির মনোজগৎ তো তার মতো সাদামাটা নয় নিশ্চয়ই! ওর মনের খবর তার মতো গেঁয়ো লোক কীভাবে বুঝতে পারবে? বয়সে। ছোট হলেও অমল যে অনেক উঁচু থাকের মানুষ।
মহিম বলল, মানুষের মন সর্বদাই কিছু না কিছু ভাবে। চিন্তা ছাড়া এক মুহূর্ত কাটে না কারও।
আমি একটু বসি বাবা?
শশব্যস্তে মহিম বলে, বোস না, বোস। ওই কাঠের চেয়ারটায় বসবি নাকি বিছানায় লেপ চাপা দিয়ে?
না না, চেয়ারই ভাল।
অমল বসল। বসার ভঙ্গিতেই বোঝা গেল, খুব ক্লান্ত।
মৃদু একটা অ্যালকোহলের গন্ধ পাচ্ছিল মহিম। দরজাটা বন্ধ করে দিতেই গন্ধটা একটু প্রকট হল। অমল যে একটু আধটু মদ-টদ খায় তা মহিম জানে। খেতেই পারে। আজকাল মদ খাওয়াটাই তো রেওয়াজ। চিন্তার কথা হল মদ খেয়ে ঘুম আসবার কথা, কিন্তু অমলের ঘুম আসছে না।
মহিম বিছানায় অমলের মুখোমুখি বসে ওর দিকে একটু চেয়ে থাকে। ছেলে সিলিং-এর দিকে মুখ করে বসে আছে। চোখ বোজা।
আমি আপনার ঘুম ভাঙাইনি তো!
না। আমি রাতে বার দুই উঠি। এখন উঠতেই যাচ্ছিলাম। আগে টানা ঘুম হত, আজকাল হয় না।
আপনার কত বয়স হল?
আশির কাছাকাছি।
চোখ খুলে সামান্য বিস্ময়ের সঙ্গে অমল বলে, এত!
মহিম সামান্য হাসে, তা হবে না? বয়স কি বসে থাকে!
আমার ধারণা ছিল আপনি সত্তরের কাছাকাছি বোধ হয়।
সত্তর কবে পেরিয়ে এসেছি।
আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করছি না তো!
বিলিতি ভদ্রতা। মহিম মাথা নেড়ে বলে, না, ডিস্টার্বের কী আছে? বললাম না, ঘুম এমনিতেই কমে গেছে।
আজ রাতে যখন ঘুম আসছিল না তখন বেরিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আজ একা একা ঘুরতে ঘুরতে আমার একটু ভয়-ভয় করছিল।
ভয়! ভয় তো হতেই পারে। তোরা শহরে থাকিস, সেখানে এত সুনসান হয়ে যায় না। গাঁ নির্জন জায়গা। তার ওপর কুকুর-টুকুর আছে, তাড়া করে।
না, ওসব ভয় নয়।
তবে?
কী জানি, কেবলই মনে হচ্ছিল চারদিক থেকে যেন একটা হাহাকার শুনতে পাচ্ছি।
হাহাকার!
হ্যাঁ, ঠিক বোঝানো যাবে না। এ সেন্স অফ লস। গ্রেট লস।
বহু টাকা মাইনের চাকরি, মাথায় বিদ্যে গিজগিজ করছে, তবে ভয় পায় কেন ছেলেটা? কীসের হাহাকার! ওর তো বগলে চাঁদ!
মহিম গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, তোর মনটা কি খারাপ?
হ্যাঁ, খুব খারাপ।
কেন রে, মন খারাপের কী হল?
মনের ওপর তো কারও হাত নেই।
তা তো ঠিকই।
আমার মনটা রোজই একটু একটু করে খারাপ হয়েই যাচ্ছে। কিছুতেই ভালর দিকে যাচ্ছে না।
তোর শরীর কেমন?
শরীরের খবর জানি না। বোধ হয় খারাপ নয়।
শরীর ভাল আছে বলছিস?
বললাম তো, সমস্যাটা শরীরের নয়। মনের।
মহিম চিন্তিত হল। কিন্তু দিশা পেল না। একটু ভেবে বলল, বউমার সঙ্গে কিছু হয়নি তো!
মাছি তাড়ানোর মতো মুখের সামনে হাতের একটা ঝটকা দিয়ে বিরক্তির সঙ্গে অমল বলে, বউমার কথা ছাড়ুন তো। ও কোনও ফ্যাক্টর নয়।
মহিম সতর্ক হল। বেফাঁস কথা বলা চলবে না। একটু ভেবে বলল, মনটা কি গাঁয়ে এসেই খারাপ হল নাকি?
না বাবা। মনটা ইদানীং আমার সবসময়েই খারাপ। সবচেয়ে ভয়ের কথা আমার যে ফোটোগ্রাফিক মেমরি ছিল সেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আজকাল অনেক কিছু ভুলে যাই, যা ভুলবার কথা নয়।
মহিম ঘরের কমজোরি বালবের আলোয় নিজের ছেলেটির দিকে চেয়ে খুব অবাক হয়ে ছেলের মুখশ্রীতে আর গোল চশমায় সুধীর ঘোষের ছায়া দেখতে পাচ্ছিল। সর্বনাশ! সুধীর ঘোষই আবার তার ছেলে হয়ে জন্মায়নি তো!
এক মুহূর্তের বিভ্রম কাটিয়ে উঠল মহিম। কী যে সব ছাতামাথা মনে হয় তার। মাথাটাই ভূতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে বুড়ো বয়সে। নিজেকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মনের দুর্বলতাটা কাটিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা করে সে বলল, তোর টেকনিক্যাল নলেজের মেমারিও কি কমে যাচ্ছে?
মাথা নেড়ে অমল বলে, না, সেসব ঠিক আছে। ভুল হচ্ছে মানুষের মুখ, নাম, ছোটখাটো ঘটনা, ঠিকানা এইসব। কোথাও যেতে যেতে হঠাৎ মাঝপথে মনে হয়, আরে! কোথায় যাচ্ছি আমি! কোথায় যাওয়ার কথা তা মনে পড়তে সময় লাগে।
ওটা বোধ হয় লস অফ মেমারি নয়।
তাহলে কী?
বোধ হয় প্রি-অকুপেশন। একটা কোনও নিবিষ্ট চিন্তা মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে বলে স্মৃতি একটু ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
আপনি কি সাইকোলজি জানেন?
না বাবা, জানি না। তবে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে অভিজ্ঞতা অনেক কিছু শেখায়। তোমরা হয় তো দাম দেবে না তার।
অমল চুপচাপ বসে কিছুক্ষণ ভাবল।
তার পর বলল, কিছু একটা হবে। সামথিং ইজ রং উইথ মি।
নিজেকে নিয়ে অত ভাবিস না। অন্যদের নিয়ে ভাব।
অমল বোধ হয় কথাটা শুনতে পেল না। ঘরের একটা অনির্দেশ্য জায়গায়, একটু ওপর দিকে অন্যমনস্ক চোখে চেয়ে থেকে বলল, মাথাটা গরম লাগছিল বলে রাত দেড়টায় বেরিয়ে পড়েছিলাম। চেনা গ্রাম, চেনা রাস্তা, তবু কিছুক্ষণ হাঁটার পরই মনে হতে লাগল, জায়গাটা আমি একদম চিনতে পারছি না। কোথায় এলাম, কোথায় যাচ্ছি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তার পর হঠাৎ মনে হল আকাশ থেকে গুঁড়ো গুঁড়ো কী যেন ঝরে পড়ছে চারদিকে। খুব সূক্ষ্ম, পাউডারের চেয়েও মিহি গুঁড়ো। ভয় হচ্ছিল, গ্রহ নক্ষত্র সব কিছুর আয়ু ফুরিয়ে গেছে, সব গুঁড়ো গুড়ো হয়ে পড়ে যাচ্ছে। এত ভয় পেলাম যে, দৌড়োত শুরু করলাম।
