পরদিন মহিমকে তিনি বললেন, হতভাগাটাই এসেছিল।
কে বাবা?
সুধীর। আত্মাটা কষ্ট পাচ্ছে।
এক রাতে তপোধীরের বউ বাচ্চার মুতের কাঁথা পালটাতে উঠে সলতে কমানো লণ্ঠনের মৃদু আলোয় কাঠের বড় আলমারির পাশে বুঝকো আঁধারে হঠাৎ দুখানা গোল চশমা দেখতে পেল। ভয়ে চিৎকার দিয়ে মূৰ্ছা গিয়েছিল সে। দাঁতকপাটি লেগে নীলবর্ণ হয়ে যায় যায় অবস্থা।
এর পর দেখল অধীর ঘোষ। দোতলার ঘর দুখানা সুধীর ঘোষ মারা যাওয়ার পর সেই দখল করেছিল। সেই দোতলার জানালায় একদিন মাঝরাতে রোল্ডগোল্ডের চশমা জোড়া দেখা দিল। ভয় খেয়ে অধীর ঘোষ গয়ায় গিয়ে পিণ্ডদান করে এল।
কিন্তু তাতেও গোল চশমার আবির্ভাব ঠেকানো যায়নি। মাঝেমধ্যেই এ ও সে মাঝরাতে গোল চশমা দেখতে লাগল। এমনকী রাতচরা মানুষের অনেকেই এমনও নাকি দেখেছে যে, সুধীর ঘোষ ফাঁকা রাস্তায় বিড়বিড় করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে। গলা খাঁকারির শব্দ, কাশির আওয়াজ এসবও নাকি শোনা যেত ঘোষ বাড়ির আনাচে কানাচে।
কালক্রমে সবই আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। ভূতপ্রেতরাও পুরনো হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সুধীর ঘোষের প্রেতাত্মাও বিলীন হয়ে গেল।
কত কালের কথা!
বহু বছর পরে তাই হঠাৎ মাঝরাতে পেচ্ছাপ করতে উঠে উঠোনের দিককার ভেজানো জানালার পাল্লাটা খোলা দেখে হ্যারিকেন উসকে মহিম তাকিয়ে দেখে দুখানা গোল ধাতব ফ্রেমের চশমা অন্ধকারে ভেসে আছে।
মহিমের বুকটা ছলাত করে উঠল। আশির কাছাকাছি বয়সে হৃদযন্ত্র এখন তো আর মজবুত নেই। ধড়াস ধড়াস শব্দ হচ্ছিল বুকে, সঙ্গে যেন একটা ক্ষীণ ব্যথাও। মরেই যাবে নাকি সে? আর মৃত্যু সন্নিকট বলেই কি সুধীর ঘোষ এসে হাজির হয়েছে?
কে? কে ওখানে? কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে মহিম।
বাবা! আমি–আমি অমল!
হাঁ করে বাক্যহারা হয়ে কিছুক্ষণ জানালার বাইরে চেয়ে থেকে মহিম বলে, অমল!
হ্যাঁ বাবা।
তুই এত রাতে বাইরে কেন?
একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম।
মহিম ঘড়ি দেখল। জাম্বুবান টেবিল ঘড়িটায় রাত আড়াইটে। এই অশৈলী সময়ে তো কেউ প্রাতভ্রমণে বেরোয় না!
তোর কি ঘুম আসছে না?
আজকাল প্রায়ই ঘুম আসে না।
মহিম দরজাটা খুলে দিয়ে বলল, আয়, ভিতরে আয়।
এই ছেলের সঙ্গে মহিমের সম্পর্ক নেই বহুকাল। যখন স্কুলে ভাল রেজাল্ট করে বেরোল, যখন গ্রামে সবাই পঞ্চমুখে সুখ্যাতি শুরু করল তখন থেকেই। মহিম তখন থেকেই তার এই মেধাবী ছেলেটিকে একটু একটু সমীহ করতে আর মৃদু ভয় পেতে শুরু করে। সে নিজে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরিজিতে এম এ হওয়া সত্ত্বেও। আসলে নিজের জ্ঞানগম্যি, ডিগ্রির ওপর তার কোনও ভরসাও ছিল
কখনও, যখন থেকে ছেলেকে ভয় খেতে শুরু করল তখন থেকেই রচিত হল এক অনতিক্রম্য দূরত্ব। অমল বাবাকে বিশেষ গ্রাহ্য করত না। ব্যক্তিত্বহীনদের কপালে সবসময়েই উপেক্ষা জোটে। নিজেদের তারা না পারে জানান দিতে, না পারে তুলে ধরতে। দুর্বলচিত্ত মহিম বাড়ির কারও কাছেই তেমন গুরুত্ব পায়নি কখনও। ১৫০
অমলের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়ল ওর বিয়ের পর। বিদেশে যাওয়ার পর আরও। পরই হয়ে গেল ছেলেটা।
আজকাল যে মাঝে মাঝে আসে বা বউ বাচ্চাদের গায়ে পাঠিয়েছে এটা ভাল লক্ষণ বটে, কিন্তু মহিমের সঙ্গে সম্পর্কটা আর কাছের হয়নি। কখনও হয়তো খেয়াল হলে একটা দায়সারা প্রণাম করে বা খুব আলগা একটা কুশল প্রশ্ন করেই সরে যায়। মহিম এই আলগোছ আত্মীয়তাটা এক রকম মেনেই নিয়েছে। তার কোনও নালিশ নেই, অভিযোগ বা অভিমান নেই। ওরা ভাল থাকলেই ভাল। ব্যক্তিত্ব জিনিসটা সকলের থাকে না, কেউ কেউ ওটা নিয়েই জন্মায়। জন্মগত হলে ব্যক্তিত্ব অর্জন করা সম্ভব নয়, এটা বুঝে গেছে মহিম। গৌরহরি চাটুজ্জেকে দেখে দেখেই ব্যাপারটা সে বুঝেছে। ছেলেপুলেরা যে তার আপন হল না, কাছের হল না এটা তার নিজেরই অযোগ্যতা বলে সে মনে করে। এই বয়সে আর স্রোতের ধারাকে উলটেও দিতে পারে না সে।
পুজোতেই শীত পড়েছিল। দুদিনেই শীত আরও তীব্র হয়েছে। কনকনে উত্তুরে হাওয়ায় হাত-পা জমে যাওয়ার জোগাড়। এই বাঘা শীতেও অমলের গায়ে গরম জামা নেই। গায়ে একটা পাতলা গেঞ্জি, তার ওপর ধুতির খুঁট জড়ানো। পায়ে চটি। সংকোচে সে ঘরে ঢুকে চারদিকে চেয়ে দেখছিল। চাউনিটা অস্থির, তাতে কোনও পর্যবেক্ষণ নেই!
এই শীতে গায়ে গরম জামা দিসনি কেন?
অমল মহিমের মুখের দিকে গভীর অন্যমনস্কতায় চেয়ে থেকে বলে, এমনিই। আমার তেমন শীত করছে না।
অমলের চোখের চশমাজোড়া অবিকল সুধীর ঘোষের চশমার মতো। দুটি নিখুঁত গোলাকার কাঁচ রোল্ডগোল্ডের ফ্রেমে বসানো। বহুকাল বাদে যেন সেই সুধীর ঘোষই ফিরে এসেছে। এরকম গোল ফ্রেমের চশমা কি আজকাল কেউ পরে! কে জানে বাবা, পুরনো সব ফ্যাশন ফিরিয়ে আনাটাই বোধ হয় আজকালকার রেওয়াজ।
এখন বড় হিম পড়ে। ঠান্ডা লেগে যাওয়ার ভয় আছে।
মহিম যথেষ্ট জোর বা শাসনের মতো করে কথাটা বলতে পারে না। এমনকী স্নেহেরও যে একটা জোর থাকে সেটাও তার গলায় এল না। অমল এখন বড় দূরের মানুষ, একজন জেন্টেলম্যান।
ঠান্ডাটাই আমার দরকার ছিল। মাথাটা গরম লাগছিল খুব।
অকূল পাথারে পড়ে যায় মহিম। জিজ্ঞেস করাটা উচিত হবে কি না, জিজ্ঞেস করলে রেগে যাবে কিনা এসব ভেবে দোনোমোনো করে বলেই ফেলল, মাথা গরম লাগছিল কেন?
