সাত আট মাস এভাবেই গেল। একদিন এসে মহিমের বাবাকে বললেন, আপনার পরামর্শই মেনে নিচ্ছি। বিয়ে করব। একজন ঘটক ঠিক করে দিন তো।
মহিমের বাবা সর্বানন্দ ঘটককে খবর দিলেন।
সর্বানন্দ ঘটক মহিমদের বাড়িতে এসেই দেখা করলেন সুধীরের সঙ্গে। বললেন, বয়েসটা তো একটু ঢলেছে, গরিবগুর্বো ঘরের মেয়ে হলে চলবে তো!
চলবে। হাতে আছে?
তা থাকবে না কেন? এদেশে ভিখিরিরও বিয়ে হয়।
তাহলে দেখুন।
সুন্দরী হবে না, তবে কাজের মেয়ে হবে।
সুধীর তাতেও রাজি।
সর্বানন্দ যে সুধীরের জন্য পাত্রী দেখছেন তা চেষ্টা করেও গোপন রাখা যায়নি। একদিন ঘোষ বাড়িতে তুমুল হই-হল্লা হয়ে গেল। সুধীর ঘোষকে প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করারই জোগাড় করে ফেলল ভাইপোরা। ভাই আর ভাইয়ের বউয়েরাও চেঁচামেচি কিছু কম করল না। বুড়ো বয়সে বিয়ে ভীমরতি ইত্যাদি বলে গাঁয়েও একটা জনমত তৈরি করে ফেলল তারা। গাঁয়ের মোড়ল মাতব্বররাও রুখে দাঁড়াল সুধীরের বিরুদ্ধে। গাঁয়ের ছেলে হলেও সুধীর বিদেশে ছিলেন, সুতরাং তাঁর দিকে জনমত কম।
মহিমের বাবা বললেন, কী রে, কী করবি এখন?
তাই ভাবছি। দেশে ফিরে যে কী ভুলই করেছি।
মহিমের বাবা বললেন, ভুলটা তোর অন্য জায়গায়। এতকাল বিদেশে পড়ে থেকেছিস বলে দেশ আর আত্মীয়স্বজন সবই তোর পর হয়ে গেছে। প্রবাসী থাকা সেই কারণেই ভাল নয়। ১৪৮
আবার ফিরে যেতে ইচ্ছেও হচ্ছে না। এখন আমার আর বিলেতে থাকতে ইচ্ছে হয় না।
তাহলে কলকাতা বা নিদেন বর্ধমানে গিয়ে থাক। বড় শহরে গাঁয়ের কূটকচালি নেই, আত্মীয়রাও নাগাল পাবে না।
সুধীর ঘোষ থম হয়ে বসে রইলেন। অনেকক্ষণ বাদে বললেন, ওদের কেউই আমার আপন হল না কেন বলুন তো! একই বংশ এক পরিবার, বাবা মাও এক। তবে গণ্ডগোলটা কোথায়?
সংসার মানেই গণ্ডগোল।
তাই দেখছি।
আরও দেখবি।
অঙ্কবিদ সুধীর শেষ জীবনের অঙ্ক মেলাতে হিমসিম খাচ্ছিলেন। সাহেবদের দেশে একা থেকে একটা জীবন কাটিয়ে এসে যে তাফালের মধ্যে পড়েছেন তা সামলে ওঠার কায়দাই তাঁর জানা ছিল না। গাঁয়ের বিজ্ঞ-বিচক্ষণ কিছু মানুষ উভয় পক্ষের মধ্যে একটা সন্ধি স্থাপনের জন্য মিটিং বসাল। সুধীর ঘোষের ভাইরা সেই মিটিং-এ পরিষ্কার বলল, সুধীর সংসারের জন্য এতকাল কিছুই করেননি, এখন উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। এ বাড়িতে থাকতে হলে তাঁকে মাথা নিচু করেই থাকতে হবে।
বাইরের লোক এসে যে সুধীর ঘোষের সমস্যা মেটাতে পারবে না সেটা মহিমের বাবা ভালই জানতেন। তিনি বললেন, ওরে, ওভাবে হবে না। তোর এখন তফাত হওয়া দরকার।
সুধীর থম মেরে বসে থাকেন। রা কাড়েন না। হয়তো তাঁর একটা ভুল ধারণা ছিল যে, আত্মীয়তাই আসলে সম্পর্ক। কিন্তু সম্পর্ক যে একটা আলাদা জিনিস, সেটা যে রচনা করতে হয় এ ব্যাপারটা তাঁর জানা ছিল না। এই নবোদিত জ্ঞান তাঁকে ঠিক করে না তুলে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিল। অনেকক্ষণ বাদে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ওরা তো আমাকে চায় না, আমার পয়সাকড়িই চায়। ভাবছি টাকাপয়সাগুলো ওদের দিয়েই দেবো, তাতে যদি মন পাওয়া যায়।
মহিমের বাবা বলেছিলেন, সেটা আর একটা আহাম্মকি হবে।
কিছুদিন পর দেখা যেতে লাগল, বিলেত ফেরত সুধীর ঘোষ একা একা গাঁয়ের পথে পথে ঘুরছেন আর আপনমনে বিড়বিড় করছেন। চোখে গোল রোন্ডগোন্ডের ফ্রেমের চশমার ভিতর দিয়ে অস্থির চোখে চারদিকে তাকান। যথারীতি গাঁয়ের ছেলেরা তাঁর পিছুতে লাগল, ঢিল পাটকেল মারতে লাগল, তাঁকে নিয়ে ছড়া বাঁধতে শুরু করল। পাগলামির প্রথম লক্ষণ দেখা দিলেই এসব প্রতিক্রিয়া হয়েই থাকে। মানুষের ভিতরে করুণা ও নিষ্ঠুরতা দু রকমের বীজই উপ্ত থাকে।
মহিমের বাবা দুঃখ করে বলতেন, এত বড় অঙ্কের মাথা ভূ-ভারতে বিরল। কিন্তু অত প্রতিভাই বোধহয় ওর কাল হল। সাহেবদের দেশে তবু বুঝবার মানুষ ছিল, গাঁয়ে-গঞ্জে ওর দামই বুঝল না কেউ।
ধীরে ধীরে সুধীর ঘোষ রাস্তার পাগলই হয়ে যেতে লাগলেন। চেঁচামেচি করতেন না, কাউকে উলটে তেড়েও যেতেন না। শুধু বিড়বিড় করতেন আর চারদিকে ভিতু চোখে তাকাতেন। বাড়ির লোকেরা তখনও দুবেলা খাবার-টাবার দিত। শোনা যায়, পাগলামির প্রথম দিকেই বর্ধমানের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের টাকাপয়সা তিনি ভাইদের মধ্যে বাঁটোয়ারা করে দেন। সেইজন্যই বোধহয় ভদ্রতাবশে ভরণপোষণটা বন্ধ করা হয়নি।
ঠান্ডার ধাত ছিল। সুতরাং বিলেত থেকে ফেরার বছর দুয়েকের মাথায় সুধীর ঘোষকে শীতকালে একদিন এক মাঠের ধারে গাছতলায় ভোরবেলা পড়ে থাকতে দেখা গেল। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে, বুকে প্রবল শ্লেষ্মার শব্দ।
দিন দুই বাদে বর্ধমানের হাসপাতালে সুধীর ঘোষ মারা যান।
লোকটা গাঁ থেকেই মুছেই গেলেন এক রকম। তাঁকে মনে রাখার তেমন কোনও কারণ ছিল না। মহিমের বাবা শুধু মাঝে মাঝে বলতেন, পণ্ডিত মানুষ যে এরকম আঁকাড়া বোকা হয় তা এই প্রথম দেখলুম। ঘটনাটা প্রথম ঘটল একদিন নিশুত রাতে। মহিমের বাবা রাতে পেচ্ছাপ করতে উঠে দক্ষিণের জানালার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট দেখতে পান জানালার ওপাশে এক জোড়া গোল গোল চশমার ফ্রেম চিক চিক করছে।
কে রে, কে ওখানে? বলে চেঁচিয়ে উঠলেন।
তখন গাঁয়ে এত লোকবসতি ছিল না। বাড়ির লোকজন উঠে বাতি-টাতি জ্বেলে দেখল, কেউ নেই। জানালার ওপাশে দুর্ভেদ্য কাঁটা গাছের জঙ্গল বলে সেখানে কারও যাওয়ার কথাও নয়।
