বিস্তর বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে একদিন সুধীর ঘোষ দেশে ফিরলেন। খুব হইচই হল গ্রামে। বিস্তর লোক এসে দেখা করে গেল। সুধীর ঘোষ যখন বিলেতে যান তখন ভাইপো-ভাইঝিদের বেশির ভাগেরই জন্ম হয়নি। দুটি কি তিনটি যারা ছিল তারা তখন খুব ছোট। তিন ভাইয়ের মধ্যে দাদা অধীরের তিন ছেলে, দুই মেয়ে, দাদার পরে সুধীর, তারপর ভাই রণধীরের দুই ছেলে, ছোটো তপোধীরের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। পৈতৃক বাড়িতে গিজগিজ করছে লোক। সুধীরের থাকার মতো আলাদা ঘর-টর কিছু নেই। অধীর ভরসা দিয়ে বলল, ঘাবড়ানোর কিছু নেই, দোতলাটা তুলে ফেললেই হবে।
কিন্তু দোতলাটা কে তুলবে সে বিষয়ে কেউ কিছু বলল না। দায় সুধীরের। বিলেত থেকে এসেছেন সঙ্গে মোটা টাকা। সুধীরের অবশ্য আপত্তি হল না। সংসারের প্রতি দায়দায়িত্ব কিছু পালন করেননি। মা বাবার তেমন সাহায্যে আসেননি। মাঝে মাঝে কিছু টাকাপয়সা পাঠিয়ে দায় সেরেছেন। সুতরাং নিজের পয়সায় দোতলাটা তুলে ফেললেন। বেশ ভাল করেই করলেন। খাট-টাট কিনলেন, চেয়ার টেবিল দিয়ে সাজালেন।
প্রথম প্রথম আদর যত্নের তেমন অভাব হয়নি। বরং একটু বাড়াবাড়িই হচ্ছিল যেন। সুধীর ঘোষ বেশ খুশি। কিন্তু মাসখানেক যেতে না যেতেই দাদা অধীর হাজারখানেক টাকা ধার নিল। রণধীরেরও ছেলের পরীক্ষার ফি না কী যেন কম পড়ে গেল। তপোধীর একটা ধানজমি কেনার জন্য খুব চাপাচাপি শুরু করে দিল। বউদি আর বউমারা খুব একটা পিছিয়ে রইল না। নানা না-মেটা শখ আহ্লাদের কথা শোনাতে লাগল। অধীরের ছেলে শ্যামল ব্যবসা করার জন্য টাকা চাইতে লাগল। ভাইঝিদের মধ্যে দুজনের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা শুনিয়ে গেল বিয়েতে কাকার কাছ থেকে তারা কোনও উপহার পায়নি।
দু মাসের মাথায় সুধীর বুঝতে পারল, এরা তাকে কামধেনু ঠাউরেছে। যার ফলে যে যা নিচ্ছে তার একটি আধলাও শোধ দিচ্ছে না। বরং বাজার হাট, সংসার খরচের টাকা এক রকম চেয়েই নিচ্ছে। এভাবে চললে যে বিলেত থেকে আনা টাকা বেশিদিন থাকবে না, তা অঙ্কবিদ পরিষ্কার বুঝতে পারলেন।
মহিমের বাবা তখন বেঁচে। উঠোনের উত্তর ধারে সকালে শীতের রোদে সুধীর ঘোষ বাঁদুরে টুপি আর তুষের চাদর জড়িয়ে জাম্বুবান সেজে এসে বসতেন। পায়ে হাঁটু অবধি উলের মোজা। হাতে দস্তানা। ঠান্ডার ভয়ে কাবু।
দুঃখ করে বলতেন, ভাল ভেবে দেশে ফিরলুম, কিন্তু এ যে বড্ড খরচের ধাক্কায় পড়ে যাচ্ছি।
মহিমের বাবা বললেন, তুই একটা আহাম্মক। প্রথম কথা বাড়ি ভাগ বাঁটোয়ারা না করেই পট করে দোতলা তুলে ফেললি। কার ভাগে কী পড়বে তা না জেনেই ওসব করতে আছে! এখন হিস্যা নিয়ে গণ্ডগোল লাগলে মুশকিলে পড়বি। তার ওপর ওরা তোকে যেভাবে দুইয়ে নিচ্ছে তাতে সর্বস্বান্ত হতে দেরি হবে না।
এখন কী করি দাদা, একটা পরামর্শ দিন।
যা গেছে তা তো গেছেই। ও নিয়ে ভাবিস না। যা আছে তা নিয়ে ফের বিলেতে পালিয়ে যা।
তা কি হয়? ও পাট যে চুকিয়ে দিয়ে এসেছি।
ফিরে গেলে কি আর চাকরি-বাকরি জুটবে না তোর?
তা জুটবে। কিন্তু বুড়ো হচ্ছি, একা থাকতে কেমন কেমন লাগে। তার ওপর ঠান্ডাটাও সহ্য হচ্ছে না আজকাল।
তার বয়স কত হল? ছাপ্পান্ন সাতান্ন হবে?
সাতান্ন পুরে গেছে।
গাঁদেশে এই বয়সে লোকে বিয়ে-টিয়ে করে। করবি?
ও বাবা! বিয়ে! পাগল নাকি?
তাহলে তোকে রক্ষে করবে কে? তোর তো একটা জন চাই।
মায়ের পেটের ভাইরাই যদি জন না হয় তাহলে অনাত্মীয় একটা মেয়ে এসে কি জন হতে পারবে?
দুনিয়ার নিয়মই যে তাই। বউ যেমনই হোক, তোর স্বার্থ দেখবে। এরা দেখবে না। ভাল করে ভেবে দেখ।
উঠোনের ওই কোণটায় রোজই শীতে জবুথবু সুধীরকাকাকে বসে থাকতে দেখা যেত। মুখখানা বড্ড কাহিল।
একদিন বললেন, আমার ক্যামেরাটা পাচ্ছি না। ভাল জাতের লাইকা ক্যামেরা, অনেক দাম।
চুরি হয়েছে নাকি?
মুখখানা চুন করে সুধীরকাকা বললেন, মদনা কয়েকদিন ধরেই চাইছিল। বন্ধুদের সঙ্গে নাকি কোথায় বেড়াতে যাবে, ছবি-টবি তুলবে। আমি বললাম, এ খুব কমপ্লিকেটেড জিনিস, তুই হ্যান্ডেল করতে পারবি না। তাতে বাবুর মুখ ভার হয়েছিল। কাল রাত থেকেই দেখছি ক্যামেরাটা সুটকেসে নেই।
মহিমের বাবা বললেন, ভাল করে খুঁজেছিস?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুধীর বললেন, খুঁজে লাভ নেই দাদা। এর আগেও কয়েকটা জিনিস গেছে। একটা রোলেক্স হাতঘড়ি ছিল, দিন দশেক আগে সেটা হাপিস হয়। জিলেটের রেজার, অডিকোলোন, সাবান, একটা ভাল সোয়েটার, টুকটাক আরও সব জিনিস হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির লোককে জিজ্ঞেস করলে সবাই আকাশ থেকে পড়ে। দাদা তো কালকেই বলছিল, সত্যিকারের গেছে, নাকি বানিয়ে বলছিস!
মহিমের বাবা বললেন, আরও যাবে। তোর সবই যাবে। এখনও পালানোর সময় আছে। টাকাপয়সা কেমন গেছে?
ওটা বর্ধমানের ব্যাঙ্কে আছে। নগদ সামান্যই ঘরে থাকে।
বিলেতে যদি নাও যাস অন্তত আলাদা বাড়ি করে থাক। তাতেও খানিকটা রক্ষে পাবি।
কাঁচুমাচু হয়ে সুধীরকাকা বলেন, একা থাকব বলে কি দেশে ফিরে এলুম দাদা?
কী করবি? বাঁচতে তো হবে!
আর একটু ভেবে দেখি।
একটু শক্ত হওয়ার চেষ্টা কর।
কিন্তু সুধীর ঘোষ লড়াইটা হেরে যাচ্ছিলেন অন্য কারণে। বাড়ির সবাইকে চোর ছ্যাঁচড় বলে প্রকাশ্যেই গালমন্দ করায় গোটা পরিবারটাই তাঁর বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে গেল। বিলেতের সাহেব বলে সবাই আওয়াজ দিতে শুরু করল। সুধীর ঘোষ একা হয়ে পড়তে লাগলেন।
