আমার বুকের ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে।
এখন আর কী করবি! যা হওয়ার হয়ে গেছে।
সরস্বতীর চোখ ফের ছলছল করে উঠল। বলল, আমি ওকে ভয় পেতাম ঠিকই, কিন্তু দেখলাম ও কিছু খারাপ মানুষ তো নয়।
কী করে বুঝলি?
চুপচাপ মার খেয়ে গেল। প্রতিবাদ করেনি।
এখন কি তোর একটু অনুশোচনা হচ্ছে?
ভীষণ। সবসময়ে মনটা খারাপ লাগছে আর কান্না পাচ্ছে।
ক্ষমা চাইবি ওর কাছে?
ইচ্ছে তো করে। কিন্তু ওরা নিশ্চয়ই এখন আমাকে ভাল চোখে দেখবে না।
তা ঠিক। তাহলে?
তুই একটা কাজ করবি পান্না? আমার হয়ে ওর কাছে যাবি?
গিয়ে?
বলিস আমি ঠিক এরকমটা চাইনি। আমি অত নিষ্ঠুর মেয়ে নই।
বলে কী হবে?
অন্তত জানুক যে, সব দোষ আমার নয়।
তোরই দোষ সরস্বতী। তুই অত ভয় পেতে গেলি কেন? আর কেনই বা বাড়িতে নালিশ করলি? আড়াল থেকে তোকে দেখত। ভাল লাগে বলেই দেখত। সেটা কি খুব বড় অপরাধ?
আর বলিস না। আমার ফের কান্না পাচ্ছে।
পরদিন স্কুলে এসে গোপনে একটা মুখ আঁটা খাম পান্নার হাতে দিয়ে সরস্বতী বলল, তুই এ চিঠিটা ওকে দিস।
কী লিখেছিস চিঠিতে?
যা লেখার লিখেছি।
আমাকে খুলে বল।
লিখেছি আমি ক্ষমা চাই।
আর কিছু?
সরস্বতী মৃদু লাজুক হাসি হেসে বলল, লিখেছি ও যা চায় তাই হবে।
অমলেন্দু কী চায় তা জানিস?
জানব না কেন? আমাকে চায়।
সে তো ঠিক। কিন্তু এখনও চায় কি? এত মারধর অপমানের পরও?
খুব দৃঢ় গলায় সরস্বতী বলেছিল, এখনও চায়।
কী করে বুঝলি?
আমার মন বলছে।
ঠিক আছে, ও যদি তোকে বিয়ে করতে চায়, করবি?
হ্যাঁ। চিঠিতে সে কথাই তো লিখেছি।
তুই তো একদম পালটি খেয়ে গেছিস দেখছি।
হ্যাঁ। ওর জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।
কিন্তু মনে রাখিস, ওরা বামুন, আর তোরা কায়েত।
তাতে কী?
বিয়ে করতে চাইলে দু পক্ষেরই আপত্তি হবে।
আমি মাকে রাজি করাব। আর আমার বাবা তো নাস্তিক।
চিঠিটা নিয়ে পান্না সত্যিই গিয়েছিল। ছেলেটার সঙ্গে একান্তে একটু কথা বলারও ইচ্ছে ছিল তার। এরকম লাগামছাড়া প্রেম সে বড় একটা দেখেনি।
গিয়ে দেখে সামনের ঘরে সুটকেস বিছানা বাঁধা ছাঁদা হচ্ছে সন্ধেবেলা। শান্তনু ঘোষাল তাকে দেখে বললেন, লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছি না মা। আমার দুর্ভাগ্য। কী যে সব হল?
পান্না বলল, তেমন কিছু তো হয়নি। ওরা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।
না মা, ওরা ঠিক কাজই করেছে। উপযুক্ত হয়েছে।
শান্তনু ঘোষাল বলতে বলতে কেঁদেই ফেললেন। অপমানটা বড্ড লেগেছিল ভদ্রলোকের।
অমলেন্দু পাশের ঘরেই শুয়ে ছিল। কপালে, গালে স্টিকার, মাথায় ব্যান্ডেজ। ঘরে ওর মা আর এক পিসি ছিলেন। তাই একান্তে কথা বলার সুযোগ হল না। তাকে দেখে অমলেন্দু এমন লজ্জা আর সংকোচ বোধ করতে লাগল যে, চোখ তুলে তাকাতেই পারল না।
পান্না বলল, ওরকম লজ্জা পাওয়ার মতো কিছু হয়নি আপনার। যারা এ কাজ করেছে তারাও অনুতপ্ত। হয়তো ক্ষমা চাইতে আসবে।
অমলেন্দু মুখ ঢাকা দিয়েছিল দু হাতে।
ওর মা বলল, প্রাণটা যে বেঁচেছে সে-ই ঢের। গাঁয়ে এসে থাকার সাধ ঘুচেছে মা।
চিঠিটা অনেকবারের চেষ্টায় ওর হাতে গুঁজে দিয়ে চলে এসেছিল সে।
পরদিন সরস্বতী উন্মাদিনীর মতো তাকে ধরল, দিয়েছিলি চিঠি?
হ্যাঁ। কিন্তু ওরা তো শুনলুম মধ্যপ্রদেশে যাচ্ছে।
সে কী! কেন?
ওরা আর এখানে থাকবে না।
যাঃ, হতেই পারে না। থাকবে না কেন?
ওঁরা খুব অপমানিত বোধ করছে। ভয়ও পাচ্ছে।
থম ধরে রইল সরস্বতী। তারপর পান্নার আঁচল চেপে ধরে পাগলের মতো বলতে লাগল, কেন চলে যাবে? কেন চলে যাবে?
পান্না মৃদু স্বরে বলল, অত উত্তেজিত হচ্ছিস কেন? চিঠিটা তো পেয়েছে। ও যদি সত্যিই তোকে চায় তাহলে ঠিক জবাব দেবে।
সেই জবাবের জন্য দুবছর অপেক্ষা করে আছে সরস্বতী। জবাব আসেনি। হয়তো সরস্বতী ওর ঠিকানায় আরও চিঠি পাঠিয়েছে। কে জানে! কিন্তু জবাব আসেনি।
সরস্বতীকে দেখে আজ সকালটায় তার ভারী ভাল লাগল। বিয়ে হল না, কেউ কাউকে পেল না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে টানটা রয়ে গেল। বিরহই ভাল। পান্না উঠে তার প্রেমপত্রের ঝাঁপি নামিয়ে বসল আজ। লেপের তলায় লুকিয়ে পড়তে লাগল।
.
১৯.
সুধীর ঘোষের ভূতকে আগে প্রায়ই দেখা যেত এখানে সেখানে। আজকাল আর বিশেষ কেউ দেখে বলে শোনা যায় না। আগেকার লোকেরাও আর নেই। বিজলি বাতি এসে গেছে, গাঁয়ে বসতিও কিছু বেড়েছে, ভূতের এখন জায়গার টান পড়েছে।
সুধীর ঘোষ অল্প বয়সেই দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। তাঁর ছিল অঙ্কে ভাল মাথা। নানা দেশে ঘুরে অবশেষে বিলেতে একটা ইস্কুলে মাস্টারির চাকরিতে থিতু হন। শোনা যায়, সেখানে মাস্টারমশাইদের এখানকার মতো দুর্দশার জীবন নয়। সুধীর ঘোষ ভালই ছিলেন। মোটা মাইনে, বাড়ি, গাড়ি সবই হয়েছিল। কিন্তু অঙ্ক কষতে কষতে আর বিয়ে করার ফুরসত হল না। হঠাৎ একদিন দেখলেন, বেশ বুড়ো হয়ে গেছেন। বিলেতের শীত তেমন সহ্য হচ্ছে না। বার দুই নিউমোনিয়ায় ভুগে উঠলেন। বিলেতের ডাক্তাররা বলল, ট্রপিক্যাল কান্ট্রিতে তিনি ভাল থাকবেন। প্রস্তাবটা পছন্দই হল সুধীর ঘোষের। দেশের সঙ্গে বছর পঁয়ত্রিশ সম্পর্ক নেই। অঙ্কে আচ্ছন্ন মাথায় হঠাৎ দেশ-গাঁয়ের চিত্র সব ভেসে ওঠায় মনটা হু-হু করতে লাগল। আপনজন বলতে ভাই, ভাইপো-ভাইঝিরা সব আছে। তারাও চিঠি লিখল দেশে ফিরে আসতে।
অবশেষে সুধীর ঘোষ বিলেতের পাট চুকিয়ে দেশে ফেরার জাহাজ ধরলেন। মনে খুব আশা, শেষ জীবনটা দেশের বাড়িতে নিশ্চিন্তে থাকবেন।
