মতলব নেই বললেই হল! সরস্বতী আপনার ভয়ে স্কুলে যেতে পারছে না। ফের যদি এরকম করেন তা হলে কিন্তু আমরা তোক ডাকব।
অমলেন্দু অপমানিত হয়ে চলে গেল।
প্রকাশ্যে আর সে দেখা দিত না বটে, কিন্তু ঘাপটি মারার সুযোগ তো কম নেই। এই ঘটনার পর সে পুরনো শিবমন্দিরের ভাঙা পাঁচিলের আড়াল থেকে একটা ফুটো দিয়ে সরস্বতীকে রোজ দেখত।
আর কেউ টের না পেলেও সরস্বতী ঠিকই টের পেত অমলেন্দুকে। প্রকাশ্যে একরকম ছিল। তাতে গা-ছমছম করত না। কিন্তু অমলেন্দু যখন আড়াল হল তখন উৎকণ্ঠা আর ভয় বেড়ে গেল সরস্বতীর।
বন্ধুরা এবারও অমলেন্দুকে ধরল। তাদের দেখে সে পালাতে যাচ্ছিল। স্কুলের সাহসী মেয়ে বনলতা দৌড়ে গিয়ে তাকে ল্যাঙ মেরে ফেলে দেয়।
অতগুলো মেয়ের মারমুখী ভাব দেখে অমলেন্দু ভয়ে কেঁদেই ফেলেছিল।
আমি তো কিছু দোষ করিনি!
দোষ করেননি মানে! আপনি রোজ গা ঢাকা দিয়ে সরস্বতীকে ফলো করেন। আপনার মতলব খারাপ।
বিশ্বাস করুন, আমার খারাপ মতলব ছিল না।
তবে ওরকম করেন কেন?
কী জানি! ওকে না দেখলে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়।
বাঃ, বেশ তো কথা! দাঁড়ান, আপনার বাড়িতে বলে দেবো।
না না, বলবেন না। আমি আর আসব না।
অমলেন্দু ভয় পেয়ে কদিন সত্যিই আর সরস্বতীর যাতায়াতের পথে আসত না।
দেখতে সরস্বতী বরাবরই ভাল। সুন্দরী না হলেও মিষ্টি লাবণ্য আছে। ঢলঢলে গোলপানা মুখ, বড় টানা চোখ। কিন্তু ভারী ভিতু। কোনও ছেলের সঙ্গে প্রেম করার কথা ভাবতেই পারত না।
পান্না ওকে বলেছিল, ছেলেটা যখন ওরকম হ্যাংলামি করে তখন একটু-আধটু কথা বললেই তো পারিস। কথাটথা বললে আর ওরকম ছোঁকছোঁক করবে না।
কথা! ও বাবা, ভাবতেই বুক ধড়াস ধড়াস করে। আমি পারব না।
তোর বুক ধড়াস ধড়াস করে কেন? তুই তো আর ওর প্রেমে পড়িসনি।
প্রেম! দুর, কী যে বলিস! বুক ধড়াস ধড়াস করে ভয়ে।
অমলেন্দুরা গাঁয়ের পুরনো লোক হলেও ওরা থাকত বাইরে বাইরে। ওর বাবা শান্তনু ঘোষাল মধ্যপ্রদেশে কলিয়ারিতে চাকরি করতেন। রিটায়ার করে গাঁয়ের পৈতৃক বাড়িতে এসে থিতু হয়েছেন। কাজেই অমলেন্দুর তেমন বন্ধুবান্ধব, দল বা ক্লাব নেই যারা তার পেছনে দাঁড়াবে,শ্যামলা রোগা লাজুক ছেলেটিকে খারাপ বলেও মনে হত না পান্নার।
শান্তনু ঘোষালও নিরীহ সজ্জন মানুষ। রিটায়ার করার পর গাঁয়ে ফিরে সকলের সঙ্গে আলাপ সালাপ করে পুরনো সম্পর্ক ঝালিয়ে নিতেন। পান্নাদের বাড়িতেও এসেছেন কয়েকবার। তাঁর মেয়ে বড়, ছেলে ছোট। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে অমলেন্দু অঙ্কে অনার্স নিয়ে বি এসসি পাশ করে বসে আছে। কলিয়ারিতে তার একটা চাকরি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শান্তনু ঘোষাল ছেলেকে মধ্যপ্রদেশে একা ফেলে রাখতে চান না।
পান্না একদিন সরস্বতীকে বলল, হ্যাঁ রে সরস্বতী, অমলেন্দু তত খারাপ ছেলে নয়। তুই ওকে অপছন্দ করিস কেন?
ও এরকম কেন? গাঁয়ে আর মেয়ে নেই?
ওর যে তোকে পছন্দ!
না না বাবা, ওসব আমার ভাল লাগে না।
অমলেন্দু এরপর যেটা করেছিল সেটা একটু বাড়াবাড়ি। স্কুলের পথে দিনের বেলা সরস্বতীকে দেখার যে অসুবিধে আছে সেইটে বুঝতে পেরে সে এরপর রাতের দিকে সরস্বতীর বাড়ির আনাচে কানাচে ঘোরা শুরু করে। সুবিধে হল, সরস্বতীদের বাড়ি একতলা। চারদিকে বাগান আর গাছগাছালি আছে। পাগল প্রেমিক সেইসব গাছপালার মধ্যে সাপ-খোপ উপেক্ষা করে ঘাপটি মারতে পাগল।
একদিন পড়ার ঘরের জানালা দিয়ে সন্ধেবেলা সরস্বতী লক্ষ করল, জানালার বাইরে পাতিলেবুর গাছটায় হঠাৎ সরসর শব্দ হল।
কে? কে ওখানে? বলে আর্তনাদ করে উঠতেই কে যেন দুড়দাড় দৌড়ে পালায়। লোকটা যে অমলেন্দু তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না সরস্বতীর। বাড়ির লোককে সে ভয় পেয়ে সব বলে দেয়।
বোকা ছেলেটা ধরা পড়ল পরদিনই। বাড়ির লোক ওত পেতে ছিল। লেবু গাছের আড়ালে ছায়ামূর্তির আবির্ভাব হতেই টর্চ জ্বলল, লাঠিসোঁটা বেরিয়ে এল।
তারপর কী মার! মাথা ফেটে রক্ত পড়ল, ঠোঁট ফুলে গেল, কোমরে চোট হল। উঠোনে দাঁড়িয়ে এই রঙ্গের দৃশ্যটা লোক দেখল। অমলেন্দু মাটিতে পড়ে থর থর করে কাঁপছে। চোখে পশুর মতো বোবা দৃষ্টি।
সেই দৃশ্য দেখতে শান্তনু ঘোষালকে টেনে আনা হল। ভদ্রলোক ছেলের দশা দেখে কেঁপেকেঁপে অস্থির।
অমলেন্দুর বিরুদ্ধে যে সব নালিশ করা হল তার কোনও জবাব দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না শান্তনু ঘোষাল। তিনি শুধু হাতজোড় করে সকলের কাছে ক্ষমা চাইতে লাগলেন। অমলেন্দুর মুখ থেকে কোনও কথাই বেরোয়নি।
ঘটনার দিন দুই বাদেই ছেলেকে নিয়ে শান্তনু ঘোষাল মধ্যপ্রদেশে চলে গেলেন। ফিরলেন প্রায় মাসখানেক পর। নিজের ছেড়ে আসা কলিয়ারিতে ধরে করে অমলেন্দুকে চাকরিতে ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছেন তিনি। ছেলে মুখে চুনকালি মাখিয়েছে বলে গাঁয়েও আর থাকলেন না ভদ্রলোক। শ্বশুরবাড়ি শ্রীরামপুরে বাড়ি কিনে চলে গেলেন।
অমলেন্দু যেদিন মার খায় তার পরদিনও স্কুলে সরস্বতীর সঙ্গে দেখা হল পান্নার। সরস্বতীর মুখচোখ ফুলে আছে কান্নায়। পান্নাকে বলল, জানিস পান্না, আমি কিন্তু সবাইকে বলেছিলাম ওকে মারধর না করতে।
তবে মারল কেন?
বাড়ির লোক সবাই খুব রেগে গিয়েছিল, কেউ কথা শুনল না।
পান্না খুব দুঃখের সঙ্গে বলল, ভালবাসা জিনিসটা খুব সেনসিটিভ, দু-চারটে ধমক বা অপমান করলেই যথেষ্ট হত। কেন যে তোর বাড়ির লোকেরা বাড়াবাড়ি করল!
