মণিরাম জ্যাঠা রুগি দেখতে আসতেন ঠিক ডাক্তারের মতো নয়। অনেকটা আত্মীয়ের মতো। বসে রাজ্যের গল্প ফেঁদে বলতেন। একসময়ে সত্যাগ্রহ করেছেন, জেল খেটেছেন, গান্ধীবাবার কাজ করেছেন–সেসব কথা, বাজারদর, গাঁয়ের পলিটিক্স, তাবিচকবচ, রান্নাবান্না, এমনকী ভূত-প্রেত নিয়েও কথা কইতেন, যার মধ্যে ডাক্তারির নামগন্ধও থাকত না। বেশ ভালই লাগত জ্যাঠাকে। কিন্তু ডাক্তারির রকমটা ছিল বড্ড সেকেলে। জ্বর হয়েছে তো কী? মণিরাম ডাক্তার কিছুতেই চট করে জ্বর কমানোর ওষুধ দেবেন না। তাঁর বক্তব্য, ওরে বাবা, জ্বর যখন শরীরের দখল নিয়েছে তখন তারও একটা মেয়াদ আছে। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাকে বার করতে গেলে শরীরে তার দাঁত নখের দাগ থেকে যায়। হুড়োহুড়ি করার কিছু নেই। জ্বর ঠিক সময়মতো ছেড়ে যাবে। যাতে খুব জট না পাকায় ডাক্তারের কাজ হচ্ছে তাই দেখা।
মণিরাম দাস্ত বা বমিও চট করে বন্ধ করার পক্ষপাতী ছিলেন না। পেনিসিলিন পারতপক্ষে দিতেন না। এমনকী পান্নার বাবার যখন টাইফয়েড হয়েছিল তখনও টাইফয়েডের নির্দিষ্ট ওষুধ না দিয়ে বাহান্ন দিন ভুগিয়েছিলেন বাবাকে। আর বাবাও মণিরামের অন্ধ ভক্ত ছিলেন বলে অন্য ডাক্তার ডাকেননি। বার্লি গিলেছিলেন, রোগা হয়ে মুরগির ছানার মতো চেহারা হয়েছিল, এত দুর্বল যে হাঁটাচলা করতে দিন পনেরো সময় লেগেছিল।
এটা নিশ্চিত যে মণিরামের যুগ আর নেই। মণিরাম জ্যাঠার সঙ্গে অনল বাগচীর অনেক তফাত।
অনল বাগচী! কী অদ্ভুত নাম! নামটা গুনগুন করছে মনের মধ্যে। মানুষটার নয়, নামটারই প্রেমে পড়ে গেল নাকি সে? নাকের কাছে হাতটি ফেলে সে শ্বসের তাপ দেখছিল গরম নয় তো!
তার একটু গন্ধ-বায়ু আছে এ কথা ঠিক। যেখানে কেউ কোনও দুর্গন্ধ পায় না সেখানেও দুর্গন্ধ আবিষ্কার করার আশ্চর্য প্রতিভা আছে তার। গেলবার পিকনিকে যে নোকটা মাংস পরিবেশন করছিল তার জামায় আঁশটে গন্ধ পেয়ে ওয়াক তুলে মরে। মানুষের গায়ের গন্ধ, মুখের গন্ধ, হাসপাতালের গন্ধ, লোহার গন্ধ, বিড়ির গন্ধ, জামাকাপড়ে বাসি গন্ধকত গন্ধই যে সারাদিন তাকে তাড়া করে তার ঠিকঠিকানা নেই।
এ-বাড়ির রেওয়াজ হল, জ্বর হলে ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজা বন্ধ। সর্ষের তেল আর নুন দিয়ে মাজতে হবে। মাকে কে যে এই নিয়ম শিখিয়েছে কে জানে বাবা! তেল নুন দিয়ে মাজলে দাঁত একটুও পরিষ্কার হয় না, বরং কাঁচা সর্ষের তেল আর নুনে দাঁত ঝিনঝিন করে। নিজের মুখ থেকে যেন বাসি গন্ধ পাচ্ছিল পান্না। আর গা থেকেও বোঁটকা গন্ধ। অপছন্দের গন্ধ সে একদম সইতে পারে না। সে শরীরে ট্যালকম পাউডার ছড়াল। মুখে লবঙ্গ ফেলে চিবোল খানিকক্ষণ। তবু খিতখিত করে তার। কিছু করার নেই বলে উঠে বাসি জামাকাপড় ছেড়ে কাঁচা শাড়ি পরল। চুল আঁচড়াল। কপালে একটা টিপ সেঁটে নিল। তারপর একখানা গল্পের বই নিয়ে বসল বিছানায়। বিরহের গল্প তার ভীষণ প্রিয়। বিরহের মতো জিনিস আছে! পড়লে চোখে জল আসবে, বুক ভার হয়ে উঠবে, মরে যেতে ইচ্ছে করবে–তবে না গল্প!
এই উপন্যাসটা তার বহুবার পড়া। বামুনের মেয়ে। পড়তে পড়তে উদাস হয়ে মাঝে মাঝে জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে থাকে পান্না। এত সব বিয়োগান্ত ঘটনা যে, এই সুন্দর ঝকঝকে সকালটা যেন আস্তে আস্তে বিবর্ণ পাঁশুটে হয়ে যেতে থাকে।
সরস্বতী গোবর কুড়াচ্ছে। ময়লা কাপড় পরনে, পিঙ্গল চুল, মুখশ্রীতে কোনও আনন্দ নেই। আজকাল দেখা হলে হাসে একটু, কথা বলতে লজ্জা পায়। সরস্বতী তার সঙ্গে পড়ত। কিন্তু মাথায় পড়া ঢুকত না বলে সিক্স থেকে ফেল করতে শুরু করে। তারপর অনেক পিছিয়ে পড়াই ছেড়ে দিল। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল পান্নার। পৃথিবীতে যে কত ট্র্যাজেডি! সরস্বতীর সঙ্গে এখনও তার তুই তোকারির সম্পর্ক। তবু দুজনের যে কত তফাত!
সরস্বতীর দিকে তাকিয়ে থাকত অমলেন্দু। তাকিয়েই থাকত। শোনা যায় চোখের পলক অবধি পড়ত না। সরস্বতী স্কুলে যাচ্ছে, কদমতলায় ঠিক অমলেন্দু নিষ্ঠার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। দুটি চোখ পেতে। সরস্বতী টিফিনের সময় স্কুলের মাঠে খেলছে বা আলুকাবলি খাচ্ছে, উলটোদিকে ঠিক অমলেন্দু দাঁড়িয়ে আছে স্ট্যাচুর মতো।
না, কখনও কথাটথা বলতে এগিয়ে আসেনি, হাতে চিঠি গুঁজে দেয়নি বা হিন্দি প্রেমের গান গায়নি চেঁচিয়ে। শুধু তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই তেমন করেনি সে।
কিন্তু এতেই ভারী ভয় পেত সরস্বতী। অমলেন্দুকে দেখলেই সে সাদা হয়ে সিঁটিয়ে যেত।
দেখ, দেখ, ছেলেটা আজও দাঁড়িয়ে আছে।
বন্ধুরা বলত, দে না একদিন দু কথা শুনিয়ে।
ও বাবা, সে আমি পারব না, বড্ড ভয় করে।
আহা, ভয়টা কীসের? তুই না পারিস, আমরাই দিচ্ছি শুনিয়ে।
সরস্বতী ভয় খেয়ে বলত, তাতে যদি খেপে গিয়ে আরও কিছু করে?
কী করবে?
কী করবে তা ভেবে পেত না সরস্বতী। মেয়েদের বিরুদ্ধে পুরুষেরা কত কীই তো করতে পারে। অ্যাসিড বালব ছুঁড়ে মারল, কি কলঙ্ক রটাল বা গুণ্ডা লাগিয়ে টেনে নিয়ে গেল। মেয়েরা কি পারে পুরুষদের সঙ্গে?
বন্ধুরা শেষ অবধি একদিন কদমতলায় ঘিরে ধরল অমলেন্দুকে।
এই যে, আপনি রোজ এখানে দাঁড়িয়ে থাকেন কেন বলুন তো! কী মতলব?
অমলেন্দু ভয়ে লজ্জায় অধোবদন হয়ে, শরীর মুচড়ে সপ্রতিভ হয়ে বলল, এমনি দাঁড়িয়ে আছি। মতলব কিছু নেই।
